থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের উপকণ্ঠে একটি স্কুল ও একটি আবাসিক এলাকায় বন্দুক হামলায় নিহত হয়েছেন মোট ৯ জন। নিহতদের মধ্যে হামলাকারী নিজেও রয়েছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় আরও ২২ জন আহত হয়েছেন।
গত ৭ আগস্ট ননথাবুরি প্রদেশের ব্যাং ক্রুয়াই এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। হামলাকারী ছিল দেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলের ১৪ বছর বয়সী এক ছাত্র। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, সে প্রথমে নিজের দাদা-দাদিকে তাদের বাড়িতে গুলি করে হত্যা করে। এরপর স্কুলে গিয়ে গুলি চালায়।
স্কুলে হামলায় পাঁচ শিক্ষক ও এক ছাত্রী নিহত হন। পরে ওই কিশোর নিজেও আত্মহত্যা করে। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় প্রাণ হারান আটজন নিরীহ মানুষ এবং হামলাকারীসহ মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় নয়।
আতঙ্কে স্কুল, ছুটে পালান শিক্ষার্থী
হামলার সময় স্কুলজুড়ে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য দৌড়ে বেরিয়ে আসে। অভিভাবকরাও সন্তানদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে স্কুলের আশপাশে ছুটে আসেন।
ঘটনার পর বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও জরুরি উদ্ধারকর্মী স্কুল চত্বরে অবস্থান নেন। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে গুলি ও অস্ত্রের বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। স্কুল ভবনের ভেতরে পড়ে থাকা গুলির অংশ, একটি ব্যাগে থাকা গুলির ম্যাগাজিন ও অন্যান্য আলামতও সংগ্রহ করা হয়।
হামলার পর শিক্ষার্থীদের ফেলে যাওয়া জুতা স্কুলের আশপাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব দৃশ্য ঘটনার আকস্মিকতা ও ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে।
ফুলে ফুলে স্মরণ নিহতদের
হামলার পর স্কুলের সামনে নিহত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের স্মরণে ফুল রেখে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন স্বজন, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষ। স্কুল প্রাঙ্গণে নিহতদের স্মরণে একটি বৈদ্যুতিক স্মরণপর্দাও স্থাপন করা হয়।
৯ আগস্ট পর্যন্ত স্কুলের বাইরে মানুষ ফুল রেখে প্রার্থনা করেন। নিহতদের ছবি ও স্মৃতিচিহ্নও সেখানে রাখা হয়। পুরো এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের আবহ।

১২ বছরের নাফাতের শেষ বিদায়
হামলায় নিহত ছাত্রী নাফাত চাইমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় ননথাবুরি প্রদেশের একটি বৌদ্ধ মন্দিরে। মাত্র ১২ বছর বয়সী নাফাত ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
শেষ বিদায়ে তার সহপাঠীরা উপস্থিত ছিল। অনেককে চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। নাফাতের কফিনের সামনে তার ছবি রাখা হয় এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতিতে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। স্বজনেরা একে অপরকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।
নাফাতের বাবা জানান, তিনি কাউকে দোষ দিতে চান না। তার ভাষায়, এই ঘটনা এখন অতীত এবং হামলাকারীর পরিস্থিতি বা মানসিক অবস্থাও তারা জানেন না।
তিনি আরও বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। তবে এমন ঘটনা কেউ প্রত্যাশা করেনি। দোষারোপের পরিবর্তে ভবিষ্যতে কীভাবে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করা যায়, সেদিকেই নজর দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
হামলাকারীর পরিবারেও শোক
হামলাকারী কিশোর এবং তার দাদা-দাদিরও শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কিশোরটির মা উপস্থিত ছিলেন। নিজের সন্তানকে ঘিরে এমন ভয়াবহ ঘটনার পর তার পরিবারও গভীর শোকের মধ্যে রয়েছে।
একই ঘটনায় একদিকে যেমন নিরীহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের হারানোর শোক, অন্যদিকে হামলাকারীর পরিবারেও নেমে এসেছে অসহনীয় বেদনা।
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
থাইল্যান্ডে স্কুলের মতো নিরাপদ বলে বিবেচিত স্থানে এমন ভয়াবহ হামলা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র ১৪ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র কীভাবে পৌঁছাল এবং হামলার আগে তার আচরণ বা পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো সতর্ক সংকেত ছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
নিহতদের স্মরণে স্কুলে ফুল, ছবি ও স্মরণপর্দা স্থাপন করা হলেও স্বজন ও সহপাঠীদের শোক সহজে কাটবে না। বিশেষ করে মাত্র ১২ বছর বয়সী নাফাতসহ নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্মৃতি এখন ওই স্কুলের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















