০৯:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
তীব্র লোডশেডিংয়ে রাজশাহীর ১৪ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা, ঘাটতি ২৫ শতাংশ বন্যার সঙ্গে সহাবস্থান, নদীকে বুঝে বাঁচার শিক্ষা আসামের বাংলাদেশে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি এডিবি বিনিয়োগ পাইপলাইন, সংস্কারে জোর বাংলাদেশকে ব্যবহার করে এশিয়ায় ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা আল-কায়েদার পানির নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ গড়বে নতুন প্রজন্ম হত্যার আশঙ্কায় তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের বিমান বদল, গোপনে ছোট সামরিক বিমানে সরানো হয়েছিল প্রেসিডেন্টকে তুরস্কে ইরানি হামলার আশঙ্কা, গোপনে বিমান বদলেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হতেই বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়লেন মির্জা ফখরুল এক সপ্তাহেই দ্বিতীয়বার সোনার দাম বাড়ল, ভরি ছাড়াল ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার প্রধান নৌঘাঁটিতে ইউক্রেনের ভয়াবহ হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজ ও বন্দর অবকাঠামো

কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার প্রধান নৌঘাঁটিতে ইউক্রেনের ভয়াবহ হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজ ও বন্দর অবকাঠামো

কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ রুশ নৌঘাঁটি নভোরোসিস্কে রাতভর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বয়ে চালানো এই অভিযানে রাশিয়ার নৌঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জেটি ও বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর স্যাটেলাইট ছবিতেও বন্দরে থাকা কয়েকটি জাহাজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় এই হামলাকে ‘অনন্য অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার নৌবহরের সর্বশেষ বড় ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত নভোরোসিস্ককে লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।

শত শত ড্রোনে একযোগে হামলা

মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত নভোরোসিস্ক, আনাপা, গেলেনদঝিক এবং ক্রাসনোদার অঞ্চলের তেমরিউক এলাকায় শত শত ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা চালায় বলে জানিয়েছেন ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ।

রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৫০০টির বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে এত বড় সংখ্যক ড্রোন প্রতিহত করার দাবি সত্ত্বেও বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা ও আশপাশের এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কন্দ্রাতিয়েভ জানান, হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আট বছরের একটি শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন। বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ চারটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এলাকায় গিয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরে বড় চাপ

ইউক্রেনের জন্য কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবহরের ওপর হামলা যুদ্ধের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেন নিজস্বভাবে তৈরি ড্রোন ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রুশ যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযানকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে।

এর ফলে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার একসময়কার শক্তিশালী নৌবহরের চলাচল অনেকটাই সীমিত হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপোলে রুশ নৌঘাঁটিতে ধারাবাহিক হামলার পর রাশিয়া তার নৌবহরের বড় একটি অংশ নভোরোসিস্কে সরিয়ে নেয়। ফলে নতুন এই ঘাঁটিটি রুশ নৌবহরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেই ঘাঁটিতেই এবার বড় আকারের হামলা চালিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত শস্য টার্মিনাল

হামলায় নভোরোসিস্ক বন্দরের তিনটি শস্য টার্মিনালের মধ্যে দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রাশিয়ার ব্যবসাবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।

নভোরোসিস্ক শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও জ্বালানি কেন্দ্রও। এখানে রয়েছে গ্রুশোভায়া তেল টার্মিনাল, যা দক্ষিণ রাশিয়ায় জ্বালানি পণ্য পরিবহনের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।

তবে সাম্প্রতিক হামলায় এই তেল টার্মিনাল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

কাজাখ তেল রপ্তানির সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ

নভোরোসিস্কের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ ক্যাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন কাজাখস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ক্যাস্পিয়ান উপকূল থেকে নভোরোসিস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত।

কাজাখস্তানের তিনটি বড় তেলক্ষেত্র থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পাইপলাইনের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। এসব তেলক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোরও বিনিয়োগ রয়েছে।

ফলে নভোরোসিস্কে ইউক্রেনের হামলা শুধু রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

An overnight Ukrainian blitz damages Russia's Black Sea naval stronghold,  Zelenskyy says | Courthouse News Service

নতুন করে রুশ সেনা সমাবেশের আশঙ্কা

এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়া চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও কয়েক লাখ মানুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং কয়েক লাখ নতুন সেনা দ্রুত সমাবেশের উদ্যোগ নিতে পারেন।

তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বা দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা নতুন করে বড় ধরনের সেনা সমাবেশের কোনো ঘোষণা দেননি। বরং রুশ কর্মকর্তারা ইউক্রেনের এমন দাবিকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন।

রুশ আইনপ্রণেতা আন্দ্রেই গুরুলিওভ বলেছেন, রাশিয়ার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করতেই ইউক্রেন সেনা সমাবেশের গুজব ছড়াচ্ছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া প্রায় তিন লাখ মানুষকে আংশিক সেনা সমাবেশের মাধ্যমে যুদ্ধে নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছিল। পরে মস্কো মূলত তুলনামূলক বেশি বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের ওপর বেশি নির্ভর করে।

তবে ২০২২ সালের সেনা সমাবেশ সংক্রান্ত রুশ প্রেসিডেন্টের সেই আদেশ এখনো বহাল রয়েছে। প্রয়োজন হলে আবারও তা কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বাড়ানোর অভিযোগ

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জেটচালিত ড্রোনের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এসব অস্ত্র ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তুলনামূলকভাবে কঠিন লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত।

অন্যদিকে ইউক্রেনও মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে।

ইউক্রেনেও রুশ হামলায় হতাহত

কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের হামলার পাশাপাশি রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, রাশিয়া রাতের অভিযানে ১৩৮টি দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করেছে। বিভিন্ন স্থানে হামলার কারণে ১৬টি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে বড় ধরনের রুশ ড্রোন হামলায় দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান ওলেক্সান্দর প্রকুদিন।

জাপোরিঝঝিয়া শহরেও হামলায় একটি বিপণিবিতান ধ্বংস হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এ ছাড়া ওদেসা অঞ্চলের চোরনোমোরস্ক বন্দরে জ্বালানি সংরক্ষণ ও সামরিক পণ্য ওঠানামার অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তাদের দাবি, সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি পণ্যবাহী জাহাজ এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য তেল বহনকারী একটি ট্যাংকারও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সেভাস্তোপোলেও ড্রোন হামলা

ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপোলে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত ১১৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ।

রুশ নিয়োগ করা স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান মিখাইল রাজভোজায়েভ জানিয়েছেন, হামলায় ১০টি বহুতল ভবন ও ২৫টি ব্যক্তিগত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষ্ণসাগরের দুই প্রান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, সমুদ্রপথ ও বন্দর অবকাঠামো এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

রুশ তেলবাহী জাহাজ নিয়ে পুতিনের হুঁশিয়ারি

এদিকে ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেলবাহী জাহাজ আটক ও তল্লাশি করায় মস্কো ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বুধবার পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষায়, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা রাশিয়ার তথাকথিত ‘ছায়া বহর’-এর জাহাজ আটক করা হলে তা জলদস্যুতা ও লুটপাটের শামিল।

পুতিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো এমন পদক্ষেপ নিলে রাশিয়াও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।

সব মিলিয়ে নভোরোসিস্কে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলা রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌ সক্ষমতার ওপর নতুন করে বড় চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে দুই পক্ষের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা এবং সম্ভাব্য নতুন সেনা সমাবেশের আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে আরও দীর্ঘ ও তীব্র হওয়ার ঝুঁকিই আপাতত বেশি।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র লোডশেডিংয়ে রাজশাহীর ১৪ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা, ঘাটতি ২৫ শতাংশ

কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার প্রধান নৌঘাঁটিতে ইউক্রেনের ভয়াবহ হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজ ও বন্দর অবকাঠামো

০৭:৫০:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ রুশ নৌঘাঁটি নভোরোসিস্কে রাতভর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বয়ে চালানো এই অভিযানে রাশিয়ার নৌঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জেটি ও বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর স্যাটেলাইট ছবিতেও বন্দরে থাকা কয়েকটি জাহাজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় এই হামলাকে ‘অনন্য অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার নৌবহরের সর্বশেষ বড় ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত নভোরোসিস্ককে লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।

শত শত ড্রোনে একযোগে হামলা

মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত নভোরোসিস্ক, আনাপা, গেলেনদঝিক এবং ক্রাসনোদার অঞ্চলের তেমরিউক এলাকায় শত শত ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা চালায় বলে জানিয়েছেন ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ।

রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৫০০টির বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে এত বড় সংখ্যক ড্রোন প্রতিহত করার দাবি সত্ত্বেও বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা ও আশপাশের এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কন্দ্রাতিয়েভ জানান, হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আট বছরের একটি শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন। বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ চারটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এলাকায় গিয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরে বড় চাপ

ইউক্রেনের জন্য কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবহরের ওপর হামলা যুদ্ধের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেন নিজস্বভাবে তৈরি ড্রোন ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রুশ যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযানকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে।

এর ফলে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার একসময়কার শক্তিশালী নৌবহরের চলাচল অনেকটাই সীমিত হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপোলে রুশ নৌঘাঁটিতে ধারাবাহিক হামলার পর রাশিয়া তার নৌবহরের বড় একটি অংশ নভোরোসিস্কে সরিয়ে নেয়। ফলে নতুন এই ঘাঁটিটি রুশ নৌবহরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সেই ঘাঁটিতেই এবার বড় আকারের হামলা চালিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত শস্য টার্মিনাল

হামলায় নভোরোসিস্ক বন্দরের তিনটি শস্য টার্মিনালের মধ্যে দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রাশিয়ার ব্যবসাবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।

নভোরোসিস্ক শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও জ্বালানি কেন্দ্রও। এখানে রয়েছে গ্রুশোভায়া তেল টার্মিনাল, যা দক্ষিণ রাশিয়ায় জ্বালানি পণ্য পরিবহনের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।

তবে সাম্প্রতিক হামলায় এই তেল টার্মিনাল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

কাজাখ তেল রপ্তানির সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ

নভোরোসিস্কের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ ক্যাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন কাজাখস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ক্যাস্পিয়ান উপকূল থেকে নভোরোসিস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত।

কাজাখস্তানের তিনটি বড় তেলক্ষেত্র থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পাইপলাইনের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। এসব তেলক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোরও বিনিয়োগ রয়েছে।

ফলে নভোরোসিস্কে ইউক্রেনের হামলা শুধু রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

An overnight Ukrainian blitz damages Russia's Black Sea naval stronghold,  Zelenskyy says | Courthouse News Service

নতুন করে রুশ সেনা সমাবেশের আশঙ্কা

এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়া চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও কয়েক লাখ মানুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং কয়েক লাখ নতুন সেনা দ্রুত সমাবেশের উদ্যোগ নিতে পারেন।

তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বা দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা নতুন করে বড় ধরনের সেনা সমাবেশের কোনো ঘোষণা দেননি। বরং রুশ কর্মকর্তারা ইউক্রেনের এমন দাবিকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন।

রুশ আইনপ্রণেতা আন্দ্রেই গুরুলিওভ বলেছেন, রাশিয়ার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করতেই ইউক্রেন সেনা সমাবেশের গুজব ছড়াচ্ছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া প্রায় তিন লাখ মানুষকে আংশিক সেনা সমাবেশের মাধ্যমে যুদ্ধে নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছিল। পরে মস্কো মূলত তুলনামূলক বেশি বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের ওপর বেশি নির্ভর করে।

তবে ২০২২ সালের সেনা সমাবেশ সংক্রান্ত রুশ প্রেসিডেন্টের সেই আদেশ এখনো বহাল রয়েছে। প্রয়োজন হলে আবারও তা কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বাড়ানোর অভিযোগ

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জেটচালিত ড্রোনের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এসব অস্ত্র ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তুলনামূলকভাবে কঠিন লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত।

অন্যদিকে ইউক্রেনও মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে।

ইউক্রেনেও রুশ হামলায় হতাহত

কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের হামলার পাশাপাশি রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, রাশিয়া রাতের অভিযানে ১৩৮টি দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করেছে। বিভিন্ন স্থানে হামলার কারণে ১৬টি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে বড় ধরনের রুশ ড্রোন হামলায় দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান ওলেক্সান্দর প্রকুদিন।

জাপোরিঝঝিয়া শহরেও হামলায় একটি বিপণিবিতান ধ্বংস হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এ ছাড়া ওদেসা অঞ্চলের চোরনোমোরস্ক বন্দরে জ্বালানি সংরক্ষণ ও সামরিক পণ্য ওঠানামার অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তাদের দাবি, সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি পণ্যবাহী জাহাজ এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য তেল বহনকারী একটি ট্যাংকারও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সেভাস্তোপোলেও ড্রোন হামলা

ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপোলে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত ১১৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ।

রুশ নিয়োগ করা স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান মিখাইল রাজভোজায়েভ জানিয়েছেন, হামলায় ১০টি বহুতল ভবন ও ২৫টি ব্যক্তিগত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষ্ণসাগরের দুই প্রান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, সমুদ্রপথ ও বন্দর অবকাঠামো এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

রুশ তেলবাহী জাহাজ নিয়ে পুতিনের হুঁশিয়ারি

এদিকে ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেলবাহী জাহাজ আটক ও তল্লাশি করায় মস্কো ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বুধবার পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষায়, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা রাশিয়ার তথাকথিত ‘ছায়া বহর’-এর জাহাজ আটক করা হলে তা জলদস্যুতা ও লুটপাটের শামিল।

পুতিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো এমন পদক্ষেপ নিলে রাশিয়াও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।

সব মিলিয়ে নভোরোসিস্কে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলা রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌ সক্ষমতার ওপর নতুন করে বড় চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে দুই পক্ষের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা এবং সম্ভাব্য নতুন সেনা সমাবেশের আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে আরও দীর্ঘ ও তীব্র হওয়ার ঝুঁকিই আপাতত বেশি।