তুরস্ক সফরের সময় সম্ভাব্য ইরানি হত্যাচেষ্টার আশঙ্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে এয়ার ফোর্স ওয়ানের মূল বিমান থেকে সরিয়ে অন্য একটি সামরিক বিমানে নেওয়া হয়েছিল। তবে এ ঘটনায় তার সঙ্গে ছিলেন ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের কয়েকজন সহযোগী; মন্ত্রিসভার শীর্ষ কোনো কর্মকর্তা তার সঙ্গে সেই গোপন যাত্রায় ছিলেন না।
গত জুলাইয়ে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে ব্রিটেনে যাওয়ার আগে ট্রাম্পকে একটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাকের আড়ালে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ছোট আকারের সি-৩২এ সামরিক বিমানে স্থানান্তর করা হয়। মার্কিন এক কর্মকর্তার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
গোপন অভিযানে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা ড্যান স্ক্যাভিনো, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী সহকারী নাটালি হার্প এবং ওভাল অফিস পরিচালনার পরিচালক ওয়াল্ট নাউটা। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন অপেক্ষাকৃত নিম্নপদস্থ সহযোগী ছিলেন।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা ওই গোপন স্থানান্তরের অংশ ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাবার সরবরাহকারী ট্রাকের আড়ালে বিমান বদল
৮ জুলাইয়ের ওই ঘটনায় ট্রাম্পকে প্রথমে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে সরিয়ে একটি ছোট সামরিক বিমানে নেওয়া হয়। পুরো বিষয়টি এতটাই গোপন রাখা হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফররত সাংবাদিকরাও এর কিছুই জানতে পারেননি।
পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানকে প্রেসিডেন্টের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছিল। এরপর ট্রাম্পকে আড়াল করে খাবার সরবরাহকারী একটি ট্রাকের মাধ্যমে বিমান বদলের ব্যবস্থা করা হয়। পরে তিনি সি-৩২এ বিমানে করে সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের থেকে আলাদা হয়ে ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হন।
ছোট বিমানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ছিলেন। তিনি বাইরের সিঁড়ি দিয়ে বিমানে ওঠেন। এতে তাকে ওই বিমানের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলে মনে হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই ছিলেন ট্রাম্পের সঙ্গে
স্ক্যাভিনো, হার্প ও নাউটা ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। প্রথম মেয়াদ শেষে ট্রাম্প যখন রাজনৈতিক ও আইনি নানা সংকটের মধ্যে ছিলেন, তখন অনেক সাবেক কর্মকর্তা তার কাছ থেকে দূরে সরে গেলেও এই তিনজন তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যান।
স্ক্যাভিনো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনার পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের গুরুত্বপূর্ণ জনবল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও ছিলেন।
নাটালি হার্পকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে ‘মানব প্রিন্টার’ নামে ডাকা হয়। তিনি প্রায় সব সময় ট্রাম্পের সঙ্গে থাকেন এবং ই-মেইল, সংবাদ প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কাগজের কপি সরবরাহ করেন।
ওয়াল্ট নাউটা সাবেক নৌসেনা সদস্য। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেন। মার-এ-লাগোতে গোপন নথি সংরক্ষণসংক্রান্ত বিচার বিভাগের তদন্তেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন।
সাংবাদিকদের বিমানে রেখে যাওয়া হয়
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, যে বিমানে সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা ছিলেন সেটিকে যদি প্রেসিডেন্টের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়ে থাকে, তাহলে তাদের কেন সেই বিমানে রাখা হয়েছিল।
পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকরা ট্রাম্পের গোপন বিমান বদলের বিষয়টি জানতেন না। বরং যাত্রার সময় তাদের জানালা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। পরে তারা ট্রাম্পকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তাদের বিমানটি সম্ভবত বিপজ্জনক ছিল এবং নিরাপত্তার কারণেই এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প আরও বলেন, তার জীবনের ওপর সব সময় হুমকি থাকে এবং ইরানের তালিকায় তিনি ‘নম্বর ওয়ান’ লক্ষ্য।
কংগ্রেসে জবাবদিহির দাবি
গোপন বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্টকে যে বিমানে রাখা হয়নি সেটিতে থাকা সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কর্মীরা নিজেদের অজান্তেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে থাকতে পারেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসকে অবশ্যই ব্রিফ করতে হবে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের জন্য যে বিমানকে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়েছিল, সেখানে থাকা কর্মী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা জানতে চান তিনি।
কেন গোপন রাখা হয়েছিল, স্পষ্ট নয়
হোয়াইট হাউস এখনো জানায়নি, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ঠিক কোন কোন কর্মকর্তা ছিলেন এবং তারা কখন বা কীভাবে প্রেসিডেন্টের বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন।
তুরস্ক যাওয়ার সময় বিমানের যাত্রী তালিকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের মধ্যে হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার, যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং, উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল নিডহ্যাম এবং স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফও ছিলেন।
তবে ফেরার সময় ট্রাম্পকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তাদের সবাই জানতেন কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্য
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, বিমান পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি সিক্রেট সার্ভিসের। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা যে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তা অনুসরণ করেন বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, তিনি বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে থাকেন এবং অনেক হুমকির কথা সাধারণ মানুষ জানেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে অনেক হুমকি থাকে এবং তিনি নিজেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্টদের একজন বলে মনে করেন।
তবে প্রশাসনের এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—প্রেসিডেন্টের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত বিমানে থাকা সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের কেন বিষয়টি জানানো হলো না এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
এই গোপন বিমান বদলের ঘটনায় এখন মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা, প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং ঝুঁকির মধ্যে থাকা অন্য যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
তুরস্কে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার আশঙ্কা কতটা গুরুতর ছিল এবং কোন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্পকে আলাদা বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল—সেই প্রশ্নেরও পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
ট্রাম্পের গোপন বিমান বদলের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তাই শুধু প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নয়, পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তথ্য গোপনের প্রক্রিয়া নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















