তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে একটি বিমান থেকে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নির্দেশেই তিনি আলাদা বিমানে উঠেছিলেন। এর পেছনে তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার হুমকি ছিল বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অ্যান্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাকে অন্য একটি বিমানে যেতে বলেছিলেন। তিনি তাদের নির্দেশ মেনেছেন বলেও জানান।
ট্রাম্প বলেন, নিরাপত্তার দিক থেকে দুই বিমানের মধ্যে বড় কোনো পার্থক্য ছিল না। তবে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা যেহেতু তাকে অন্য বিমানে যেতে বলেছিলেন, তাই তিনি সেটিই করেছেন। তার ভাষায়, তিনি নিরাপত্তা বাহিনী ও সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনেই চলেন।
কীভাবে গোপনে বদলানো হলো বিমান
তুরস্কে অবস্থানের সময় ট্রাম্পের জন্য নেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত গোপন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্পকে প্রথমে সরকারি বিশেষ বিমানে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু পরে বিমানবন্দরের একটি খাবার সরবরাহকারী গাড়ির আড়ালে তাকে গোপনে অন্য একটি ছোট সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর ট্রাম্প ওই ছোট সামরিক বিমানে করে আলাদাভাবে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন। একই সময়ে সরকারি প্রতিনিধিদল, সাংবাদিক এবং বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আগের বিমানেই ছিলেন।
ঘটনাটি এতটাই গোপন রাখা হয়েছিল যে হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকও শুরুতে জানতেন না যে প্রেসিডেন্ট তাদের সঙ্গে একই বিমানে নেই। এমনকি বিমানের সংবাদকক্ষের সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল।
ইরানের হামলার আশঙ্কা
এই গোপন বিমান বদলের পেছনে ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও দেশটির সীমান্ত ইরানের সঙ্গে যুক্ত। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চলায় ট্রাম্পের তুরস্ক সফর ও সেখান থেকে ফেরার সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এই তৎপরতা থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্পকে তুরস্ক থেকে বের করে আনার সময় তার নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের মধ্যে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল।
কেন আগের বিমানেই ফেরেননি ট্রাম্প
তুরস্কে যাওয়ার সময় ট্রাম্প যে নতুন বোয়িং বিমান ব্যবহার করেছিলেন, সেটি কাতারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে আগেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। ট্রাম্পও এর আগে বিমানটির নিরাপত্তা ও সক্ষমতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।
ফেরার সময় তাই তিনি নতুন বিমানটি ব্যবহার না করে আগের সরকারি বিমান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিমান থেকেও তাকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্টকে বহনকারী ছোট সামরিক বিমানটিই সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হতে পারে। ট্রাম্পও মঙ্গলবারের বক্তব্যে বলেন, তার ধারণা ছিল ছোট বিমানটির ওপরই হামলার আশঙ্কা বেশি।

হুমকিকে গুরুত্ব না দেওয়ার ভঙ্গি ট্রাম্পের
নিজের বিরুদ্ধে হামলার আশঙ্কার কথা জানলেও ট্রাম্প বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাননি। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে সবসময়ই নানা ধরনের হুমকি থাকে। তার মতে, যেসব প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ নন, তাদের বিরুদ্ধে এমন হুমকি আসে না।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এর আগেও অন্তত দুটি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। তারপরও তুরস্কের ঘটনাটি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন বলেই দাবি করেছেন।
তার বক্তব্যে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টিকে অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তাকে গোপনে বিমান বদলে সরিয়ে নেওয়ার মতো নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলছে, ওই সময় মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুতর হিসেবে দেখেছিলেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়ার আশঙ্কা
ঘটনাটি শুধু ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেনি, বরং হোয়াইট হাউস ও সাংবাদিকদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
প্রেসিডেন্টের অবস্থান কয়েক ঘণ্টার জন্য সাংবাদিক এবং কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছ থেকেও গোপন রাখা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছতা কতটা থাকা উচিত, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
তুরস্কের সেই সফরের গোপন বিমান বদল তাই শুধু একটি নিরাপত্তা কৌশল নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ইরানের হুমকি এবং হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের টানাপোড়েন—তিনটি বিষয়কেই একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।
Sarakhon Report 

















