বাংলাদেশের পরবর্তী কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি (সিপিএস) প্রণয়ন, অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ অগ্রাধিকার এবং সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন (আইজিএনডি) উদ্যোগ নিয়ে পাঁচ দিনের সফর শেষে বাংলাদেশ ছাড়লেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াং। বৃহস্পতিবার সফর শেষ করার আগে তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত, গবেষক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন।
এডিবির পরবর্তী অংশীদারত্ব কৌশল
ইংমিং ইয়াং বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা এখন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, যখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ জোরদার করা এবং অর্থনীতির ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, সফরের আলোচনায় এডিবি ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের দৃঢ়তা আবারও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে কৌশলগত অঙ্গীকারকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামোয় রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে।
সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত আইজিএনডি উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কার, বিনিয়োগ ও প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত করার একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক যোগাযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা।
প্রতি বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ
এডিবি প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দার মে মাসের বাংলাদেশ সফরের পর সরকার ও এডিবি আইজিএনডি উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি এডিবি বিনিয়োগের পাইপলাইন চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে পরবর্তী সিপিএসকে সরকারের মধ্যমেয়াদি সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র করার লক্ষ্য
চট্টগ্রামে আইজিএনডি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের এক সেমিনারে মূল বক্তব্য দেন ইয়াং। তিনি বলেন, সমন্বিত অবকাঠামো, লজিস্টিকস, জ্বালানি, নগর উন্নয়ন ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র, বাজার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী করতে পারে। এর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বাংলাদেশকে পরিবহন, লজিস্টিকস, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন।
সংস্কার ও বিনিয়োগে সমন্বিত উদ্যোগ
সফরকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইয়াং।
বৈঠকগুলোতে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, জলবায়ু সহনশীল বিনিয়োগ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে চট্টগ্রামের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও এডিবির ভবিষ্যৎ কর্মসূচি, যৌথ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং সমন্বিত নীতিগত সংলাপ নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। আইজিএনডিকে উন্নয়ন প্রকল্পের পাইপলাইন সমন্বয় এবং অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ঘাটতি মোকাবিলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
বেসরকারি খাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সংস্কারের অগ্রাধিকার, বাস্তবায়নগত সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা এবং আইজিএনডির আওতায় বেসরকারি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সম্পর্কে মতামত নেওয়া হয়। এসব মতামত এডিবির পরবর্তী সিপিএস এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নির্ধারণে বিবেচনা করা হবে।
চট্টগ্রামে ইয়াং এডিবির সহায়তায় পরিচালিত শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনবিষয়ক দক্ষতা কর্মসূচির কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন। শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ কীভাবে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে, সে বিষয়েও তিনি খোঁজ নেন।
বাংলাদেশের পরবর্তী এডিবি অংশীদারত্ব কৌশল, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনায় এই সফরের আলোচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের পরবর্তী এডিবি অংশীদারত্ব কৌশল, ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ পাইপলাইন ও সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















