অনলাইনে কাউকে শরীরের গঠন, বয়স কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের কোনো পরিবর্তন নিয়ে অপমান করা কতটা অনুচিত—‘বিগ বস ২০’-এর মঞ্চে সেই প্রশ্নই সামনে আনলেন বলিউড তারকা সালমান খান। একই সঙ্গে নারী তারকাদের পেছন থেকে কিংবা শরীরের নির্দিষ্ট অংশকে কেন্দ্র করে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতারও তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।
‘বিগ বস ২০’-এর ‘উইকেন্ড কা ভার’ পর্বে সালমান বিশেষভাবে কথা বলেন অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফকে নিয়ে অনলাইনে হওয়া ট্রলিং প্রসঙ্গে। মুম্বাইয়ে গত সপ্তাহে একটি গণপতি উৎসবে ক্যাটরিনার উপস্থিতির ছবি প্রকাশের পর সন্তান জন্মের পর তার শারীরিক পরিবর্তন ও ওজন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য করা হয়।
ক্যাটরিনার পক্ষ নিয়ে সালমান বলেন, গর্ভধারণের পর একজন নারীর শরীরে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। তাই এ নিয়ে তাকে উপহাস বা ট্রল করার কোনো কারণ নেই।
সালমান বলেন, “কেউ গর্ভবতী হওয়ার পর তাকে কেন ট্রল করবেন? গর্ভধারণের পর সবারই ওজন বাড়ে। যখন সে আবার ছবিতে ফিরবে, তখন সে ফিট হয়ে ফিরবে। সে এখন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়।”

সালমানের এই বক্তব্যের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে তার অবস্থানের প্রশংসা করেন। কেউ কেউ তাকে ‘পুকি’ বলেও অভিহিত করেন। তরুণ প্রজন্মের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষায় এটি সাধারণত স্নেহ বা ভালোবাসা প্রকাশের একটি শব্দ, বিশেষ করে কেউ ইতিবাচক কোনো অবস্থানের পক্ষে দাঁড়ালে তা ব্যবহার করা হয়।
এক ব্যবহারকারী লেখেন, “গ্রিন ফ্ল্যাগের যদি কোনো মুখ থাকত।” আরেকজন মন্তব্য করেন, “এখন সালমান খানকেই আমার গ্রিন ফ্ল্যাগ মনে হচ্ছে।”
বয়স নিয়ে কটাক্ষের জবাব
শুধু ক্যাটরিনা নয়, নিজের বয়স নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা বিদ্রূপের কথা বলেন সালমান। ৬০ বছর বয়সে পৌঁছেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবসময় তাকে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-র সময়কার চেহারায় দেখা সম্ভব নয়।
সালমান বলেন, “অবশ্যই আমার বয়স ৬০ বছর। সবসময় তো ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-র মতো থাকা যায় না। হঠাৎ করে এই বয়সটাই একটা বিষয় হয়ে গেছে। মানুষ বলে, সে বুড়ো হয়ে গেছে। তোমরা আর কী নিয়ে ট্রল করবে? আমি জানি কারা আমাকে ট্রল করে। আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাই না। আমাদের এত ফ্যান ক্লাব আছে, তাতে আমাদের কী আসে যায়? ওদের বলতে দাও।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সালমান মূলত বয়স ও চেহারা নিয়ে তারকাদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপের বিষয়টিও সামনে আনেন। বিনোদন জগতে তারকাদের চেহারা, শরীর ও বয়স নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা প্রায়ই তাদের ব্যক্তিগত জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে সংঘাতে আসে। সালমানের বক্তব্যে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
একপর্যায়ে নিজের সমালোচকদের সরাসরি জবাব দিতে ক্যামেরার সামনে শার্ট ও টুপি খুলে ফেলেন সালমান। মেকআপও মুছে ফেলেন। এরপর নিজের শারীরিক গঠন দেখিয়ে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যে তিনি বিচলিত নন।
![]()
অন্য তারকাদের নিয়েও আপত্তি
সালমান নিজের পাশাপাশি ভাই সোহেল খান ও অভিনেতা বরুণসহ অন্য তারকাদের নিয়ে অনলাইনে উপহাসের বিষয়েও কথা বলেন।
তিনি বলেন, অন্য কাউকে নিয়ে মন্তব্য বা ঠাট্টা করার আগে নিজের দিকে তাকানো উচিত। নিজের শরীর, নিজের পরিবার ও নিজের আচরণ নিয়েও মানুষের ভাবা দরকার।
সালমানের ভাষায়, “আগে নিজের দিকে তাকাও, নিজের শরীরের দিকে তাকাও, তারপর এসব করো। নিজের মা-বাবার দিকে তাকাও, তারপর ট্রল করো। সোহেলের ওপর, বরুণের ওপর মজা করা—এটা ঠিক নয়।”
এরপর তিনি বলেন, তাকে যত ইচ্ছা ট্রল করা যেতে পারে। এমনকি তিনি ছেঁড়া জুতাও পরেন—এসব নিয়েও তার আপত্তি নেই।
তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করার স্বাধীনতা থাকলেও সেটি যেন ব্যক্তিগত অপমান, শরীর নিয়ে কটাক্ষ কিংবা অযাচিত আক্রমণে পরিণত না হয়।
পাপারাজ্জিদের আচরণ নিয়েও ক্ষুব্ধ
অনলাইন ট্রলিংয়ের পাশাপাশি নারী তারকাদের ছবি তোলার ধরন নিয়েও সরাসরি পাপারাজ্জিদের সমালোচনা করেন সালমান।
তার অভিযোগ, অনেক সময় নারী তারকাদের নিতম্ব, পা কিংবা পেছন দিক থেকে ছবি তোলা হয়। পরে এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ করা হয়, যা সংশ্লিষ্ট নারীদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
সালমান বলেন, “পাপারাজ্জিরা নিতম্বের ছবি তোলেন, পায়ের ছবি তোলেন, আর যদি পেছন থেকে ছবি পাওয়ার সুযোগ থাকে, সেটিও নেন। কোনো অভিনেত্রী, কোনো মেয়েই এসব পছন্দ করেন না।”

নিজের ভাতিজির প্রসঙ্গও টানেন তিনি। সালমান বলেন, তার ভাতিজি যখন হাঁটেন, তখন পেছন থেকে তার ছবি তোলা হয় এবং পরে এমন ক্যাপশন দেওয়া হয়—“বলুন তো, এই মেয়েটি কে?”
এ ধরনের ছবি তোলার মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সালমান বলেন, নারীদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলে প্রতিবাদ করা উচিত। তার ভাষায়, “ঘুরে একটা চড় মেরে বলো, ‘নিজের মা-বোনের ছবি নাও।’”
নারীদের শরীরকে কেন্দ্র করে ছবি তোলা এবং সেটিকে বিনোদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাকে সালমান সরাসরি নিন্দা করেন। তার বক্তব্যে বিষয়টি শুধু তারকা-সংস্কৃতির সমস্যা নয়, বরং ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্ন হিসেবেও উঠে আসে।
সালমান-ক্যাটরিনা সম্পর্কের পুরোনো অধ্যায়
সালমান ও ক্যাটরিনা কাইফের সম্পর্ক বলিউডের বহুল আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
২০১১ সালে ‘কসমোপলিটন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যাটরিনা সালমানকে তার প্রথম গুরুতর সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
পরে ক্যাটরিনা ২০২১ সালে অভিনেতা ভিকি কৌশলকে বিয়ে করেন। গত বছরের নভেম্বরে এই দম্পতির প্রথম সন্তান, ছেলে ভিহান, জন্ম নেয়।
বর্তমানে ক্যাটরিনার ব্যক্তিগত জীবনের নতুন অধ্যায় এবং সন্তান জন্মের পর তার স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের বিষয়টি সামনে আসার পর সালমানের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে নারী তারকাদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সীমারেখা ও সম্মানের বিষয়টিও তার বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















