পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্র এখন এক অস্বস্তিকর বৈপরীত্যের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও শাসনব্যবস্থার সংকট সেই অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ফলে বাইরে পাকিস্তানের প্রভাব যত বাড়ছে, ভেতরের বাস্তবতার সঙ্গে তার দূরত্বও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই বৈপরীত্যই পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন অভিজাতদের উদ্বিগ্ন করছে। তারা একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে দেশের ভেতরে দ্রুত স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজছে। এই তাড়না থেকেই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের চিন্তাও সামনে আসতে পারে।
মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের পুরোনো ধারণা
উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজে একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী—রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে এই চিন্তা কখনো ‘উম্মাহ’র ধারণায়, আবার কখনো ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় প্রকাশ পেয়েছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যৌথ নিরাপত্তার ধারণা শুধু তার পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করেনি; দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিচয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।
এই ধারার একটি পুরোনো উদাহরণ বাগদাদ চুক্তি। ১৯৫০-এর দশকে তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরাক, ইরান ও যুক্তরাজ্যকে নিয়ে যে জোট গড়ে উঠেছিল, তা ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির বড় একটি উদ্যোগ। কিন্তু ইরাক ও ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং তুরস্কের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে সেই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে।
তবু সেই সময়ের অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের রাজনৈতিক কল্পনায় এখনো জায়গা করে আছে। তখন দেশটিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং সম্ভাবনাময় অর্থনীতির রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো। আজকের ক্ষমতাকেন্দ্রের একটি অংশ সেই ধরনের আঞ্চলিক অবস্থান পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।
পশ্চিম এশিয়ায় পাকিস্তানের নতুন সক্রিয়তা
গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার পর পাকিস্তানের পশ্চিম এশিয়ামুখী কূটনৈতিক সক্রিয়তা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং সর্বশেষ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি পাকিস্তানের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে।
এসব উদ্যোগ ইসলামাবাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অর্জিত এই অবস্থানের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মিল খুব কম। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল, অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে ক্ষমতাকেন্দ্রের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তাদের বৈদেশিক প্রভাব বাড়ানোর গতি ধরে রাখতে হবে, আবার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে। এই দ্বন্দ্ব থেকেই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কিংবা নতুন প্রদেশ তৈরির মতো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের চিন্তা আসতে পারে।
ভূগোলও পাকিস্তানের উদ্বেগের কারণ
পাকিস্তানের বর্তমান কৌশল বোঝার ক্ষেত্রে ভূগোল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তুরস্কের মতো পাকিস্তানও এমন একটি রাষ্ট্র, যার সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ভৌগোলিক পরিসরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে ভূখণ্ড সম্প্রসারণের বাস্তব সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
এ ধরনের পরিস্থিতি একটি মধ্যম শক্তির মধ্যে বিশেষ ধরনের নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি করে। সামরিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কৌশলগত প্রভাব বাড়ানো তখন প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।
তুরস্ক আঞ্চলিক জোট, বিভিন্ন অংশীদারিত্ব এবং তুর্কি পরিচয়ভিত্তিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক জোরদার করে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের পথ কিছুটা ভিন্ন। প্রতিবেশী ভূখণ্ডে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ‘কৌশলগত গভীরতা’ অর্জনের পুরোনো ধারণা থেকে ইসলামাবাদ ধীরে ধীরে সরে আসছে। পরিবর্তে পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা জোরদারের চেষ্টা করছে।
এর পেছনে ভারতের বাস্তবতাও রয়েছে। পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে অনেক বড় ভূখণ্ড ও সামরিক সক্ষমতার একটি রাষ্ট্র রয়েছে। তাই ইসলামাবাদের জন্য আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব শুধু কূটনৈতিক সাফল্যের বিষয় নয়; এটি বৃহত্তর নিরাপত্তা হিসাবেরও অংশ।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের পার্থক্য
সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ পাকিস্তানের চেয়ে আলাদা। রিয়াদের প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং এমন আঞ্চলিক শক্তির মোকাবিলা করা, যাদের তারা আদর্শিকভাবে প্রতিকূল বা আধিপত্য বিস্তারের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখে। ইরান ও ইসরায়েল এই সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সহাবস্থানের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার দিকে এগোলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। ইয়েমেনেও ইরানের প্রভাব সৌদি নিরাপত্তা চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই বাস্তবতার মধ্যেই পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীর করছে। কিন্তু ইসলামাবাদের এই পদক্ষেপ কেবল পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শেরও একটি পুনর্বিন্যাস জড়িয়ে আছে।
ধর্মের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
পাকিস্তানে যে আদর্শিক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা সৌদি আরবের সামাজিক উদারীকরণ কিংবা নাসেরের মিসরের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের সরাসরি অনুকরণ নয়। বরং কয়েকটি ভিন্ন রাজনৈতিক মডেলের বৈশিষ্ট্য একত্র করে একটি নিজস্ব কাঠামো তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ বিন সালমানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ‘মধ্যপন্থী ইসলাম’, আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির মিসরের জাতীয়তাবাদ, সামরিক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় বয়ান এবং তুরস্কের ধর্মীয়-রক্ষণশীল পরিচয়, জাতীয়তাবাদ ও প্রতিরক্ষা শিল্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
এই সম্ভাব্য মডেলের কেন্দ্রে রয়েছে একটি স্পষ্ট ধারণা: ধর্ম থাকবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, আর আন্তঃরাষ্ট্রীয় ইসলামি সংহতির জায়গায় জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে।
ক্ষমতাকেন্দ্র এমন একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে, যার সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী এবং নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকেও রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূমিকা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা, শাসন কাঠামো এবং সাংবিধানিক বন্দোবস্ত কি এই ধরনের রাষ্ট্র নির্মাণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের আচরণ দেখে মনে হয়, তাদের একটি অংশ অন্তত এই ধারণার দিকে ঝুঁকছে।
তালেবান থেকে পাওয়া শিক্ষা
আফগান তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘ সম্পর্কও এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। একসময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচিত তালেবান শেষ পর্যন্ত দেখিয়েছে, ইসলামপন্থী শক্তি সবসময় অন্য রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ অনুসরণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদ, ভূখণ্ডগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের মিল থাকলেও জাতীয় স্বার্থ ভিন্ন হলে রাজনৈতিক পথও ভিন্ন হতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রকে সম্ভবত আরও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চিন্তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয় সংহতির ওপর নির্ভরতার বদলে জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রিত আদর্শিক কাঠামোর ওপর জোর বাড়ানো হচ্ছে।
মধ্যম শক্তির স্বপ্ন ও বড় শক্তির হিসাব
জটিল প্রতিবেশ এবং উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা থাকা মধ্যম শক্তিগুলোর মধ্যে প্রায়ই আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর তাগিদ তৈরি হয়। তারা একই ধরনের স্বার্থ ও সক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে নিজেদের শক্তি বাড়াতে চায়। বড় শক্তিগুলোও অনেক সময় এই প্রবণতাকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে।
মক্কা চুক্তিকে কেন্দ্র করে যে নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি হচ্ছে, তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহও এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। অন্যদিকে চীন ও ইরান পর্যবেক্ষণ করছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা থাকবে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের কৌশল নির্ধারণের সুযোগ খুঁজছে।
শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মধ্যম শক্তিগুলোর এই নিরাপত্তা আকাঙ্ক্ষাকে একাধিকবার কাজে লাগিয়েছিল। বাগদাদ চুক্তি ছিল তার সবচেয়ে সুসংগঠিত উদাহরণ। কিন্তু ইতিহাস এটিও দেখিয়েছে যে কোনো আঞ্চলিক জোটের স্থায়িত্ব শুধু বাইরের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করে না। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থ শেষ পর্যন্ত জোটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্র আজ অতীতের সেই আত্মবিশ্বাসী অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বাড়ানো আর দেশের ভেতরে স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলা এক বিষয় নয়।
পাকিস্তানের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তাই নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব তৈরি করা কিংবা আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, দেশটি এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে কি না, যা তার বৈদেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে টেকসই ভিত্তি দেবে।
বাইরের কৌশলগত সাফল্য অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিকল্প হতে পারে না। বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের গুরুত্ব যত বাড়বে, তার অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে সেই সাফল্যের বৈপরীত্যও তত বেশি দৃশ্যমান হবে। এই বৈপরীত্য দূর করাই শেষ পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতাকেন্দ্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
লেখক: মুহাম্মদ আমির রানা, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের (PIPS) পরিচালক।
মুহাম্মদ আমির রানা 


















