দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে যারা এসেছিলেন, তাদের সবার মধ্যে যে পারস্পরিক শতভাগ বন্ধুত্ব আছে, এ কথা বলা যায় না। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো রাষ্ট্রের শতভাগ বন্ধুত্ব কখনো হয় না। কিছু সমস্যা ও বন্ধুত্ব—এই নিয়েই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাস্তবে রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব বলতে বোঝায় প্রয়োজনীয়তা।
ব্রিকসে যে দেশগুলো এসেছিল, তাদের প্রত্যেকের কাছেই বাংলাদেশের কমবেশি প্রয়োজনীয়তা আছে। যেমন চীনের কাছে বাংলাদেশের এ মুহূর্তে অনেক বেশি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি এনজিওর সম্মেলনকে উপলক্ষে করে দীর্ঘ ট্রেনযাত্রার মধ্যে দিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এলেও চীন প্রতিশ্রুতি ছাড়া কাগজে-কলমে এখনও কোনো অর্থ সহায়তা দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে চীনের সঙ্গে বারবার দেনদরবার করা দরকার বাংলাদেশের। যেহেতু অর্থের অভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে আটকে রাখতে হয়েছে, এ নিয়ে দেশে ও বিদেশে লুকানোর কিছু নেই। আবার চীনের প্রেসিডেন্টের, এমনকি তাদের ঊর্ধ্বতনদের সাক্ষাৎ পাওয়া বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বল ও সত্যি অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল নয়—এমন সরকারের প্রধান বা সরকারের ঊর্ধ্বতনদের জন্য মোটেই সহজ বিষয় নয়।

তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ব্রিকসে গেলেই যে চীনের প্রেসিডেন্টের দেখা পেতেন, তাঁর সঙ্গে বৈঠকের সময় মিলত—এটা বলা যায় না। কারণ, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০-তে যেখানে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ারের পাশে এসে হাঁটু গেড়ে সন্তানের মতো ভঙ্গিতে সম্মানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেই সুপরিচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চলার পথে একটি সেলফি তোলা ও কিছু কথা বলা ছাড়া অন্য কোনো সময় মেলেনি।
তবে শেখ হাসিনার পক্ষের অন্যদের সঙ্গে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আসা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথা হয়েছিল—তার প্রমাণ বাংলাদেশের মানুষ দ্রুতই পায়। কারণ, তার কয়েকদিন পরেই শেখ হাসিনা ওয়াশিংটন গিয়ে জ্যাক সুলিভানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
ব্রিকসে শির শিডিউল যেভাবে দেখা গেছে, তাতে হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য আলাদা সেলফি তোলার সম্ভাবনা কম ছিল। তবে চীনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিবর্গ কথা বলার একটা সুযোগ পেতেন।
তারেক রহমানকে হরতালের দিনে ক্রিকেট খেলতে দেখেছি। তবে তিনি কেমন গান করেন, তা জানি না। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম কিশোর কুমারের গান দিয়ে আসর মাতিয়েছেন ব্রিকসে। তাই আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে গানে গলা মেলানোর সুযোগ হতো, হয়তো একটা বৈঠকও হতে পারত। তাছাড়া এই তো মাত্র কিছুদিন আগে আনোয়ার ইব্রাহিম মজা করে তারেক রহমানকে তাঁর ‘জাদুকর বন্ধু’ বলেছেন, নিজ মাটিতে যখন তিনি তাঁকে পেয়েছিলেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকটি অনেক জরুরি ছিল। কারণ দেশে যখন প্রতিদিন হাজার হাজার লোক বেকার হচ্ছে, প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারখানা বন্ধ হচ্ছে, সে সময়ে এই দুর্ভাগা বেকারদের কিছু যদি মালয়েশিয়ার পামবাগানে তীব্র গরমেও সংসার চালানোর জন্য একটা কাজ পায়—সেটা তাদের কাছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। এ মুহূর্তে এটুকু লাভ বাংলাদেশের জন্য অনেক বড়।

এমনকি সরকারপ্রধানরা বিপদের মধ্যে পড়ে গেলেও দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ পান। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে বিমান দুর্ঘটনার মুখে পড়েন। যার ফলে বিমান আজারবাইজানে জরুরি অবতরণ করে, শেখ হাসিনাকে বিমান থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। আজারবাইজানের সরকারপ্রধান ও কয়েকজন মন্ত্রী তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং এক ঘণ্টারও বেশি সময় তাঁর সঙ্গে বিমানবন্দর লাউঞ্জে কথা হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁদের ওই আলাপের ফলে বাংলাদেশের ওষুধ সে দেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের এ মুহূর্তে রপ্তানি কমছে। বাজার সংকুচিত হচ্ছে। যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য মাঝে মাঝে এ ধরনের একটি পরিস্থিতি আসতেই পারে। রপ্তানি কমছে অর্থ এই নয় যে চিরকাল কমবে। বাজার সংকুচিত হচ্ছে অর্থ এই নয় যে নতুন বাজার পাওয়া যাবে না। যেমন বিপদের ভেতর বসেও শেখ হাসিনা আজারবাইজানে দেশের জন্য ওষুধ রপ্তানির বাজার খুঁজেছিলেন, তেমনি তারেক রহমান ব্রিকসে গেলে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষের কারও সঙ্গে বা তারেক রহমানের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার নেতাদের দেখা হতো। হয়তো উচ্চপর্যায়ে সাইডলাইন বৈঠকও হতে পারত দক্ষিণ আফ্রিকার নেতার সঙ্গে। আর এটা তো ঠিক যে পৃথিবীর অর্থনীতির পরবর্তী গন্তব্য আফ্রিকা। তাই আফ্রিকার যেকোনো একটি বাজারে কোনো একটি নতুন পণ্য প্রবেশ করানো বা কোনো পণ্যের জন্য একটু বেশি বাজার পাওয়ার অর্থ ধীরে ধীরে ওই মহাদেশে বিস্তার ঘটানো।
এমনকি ইরানের নেতাদের সঙ্গে দেখা হওয়া ও কথা হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি ও কূটনীতিতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আজ হয়তো ইরানের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আছে—আগামীকাল যে থাকবে, তা নয়। কাল যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তেহরান সফর করবেন না, এটা মোটেই অসম্ভব কোনো বিষয় নয়। ঠিক একই বিষয় রাশিয়ার ক্ষেত্রেও। আর ইরান ও রাশিয়া দুটি জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। কম দামে হোক আর বেশি দামে হোক, বাংলাদেশকে তো জ্বালানি আমদানি করতেই হবে। ভবিষ্যতে এই দেশগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান কী হবে, তা বর্তমান দেখে স্থির থাকা ঠিক নয়। আর এ সত্য তারেক রহমানেরই সবচেয়ে বেশি বোঝার কথা। কারণ, তাঁর রাজনীতির এই পর্বে তিনি যেভাবে ভারতের সাপোর্ট পেয়েছেন ও পাচ্ছেন, এটা কি তিন বছর আগে তিনি চিন্তা করতে পারতেন?
তাই প্রকৃত রাজনীতি ও কূটনীতির কোনো হিসাব-নিকাশে ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে দাওয়াত পেয়েছিলেন, তা অবহেলা করা হলো-সত্যিই বিষয়টি দুর্বোধ্য ও রহস্যজনক!

একটা ধারণা—তারেক রহমান জামায়াতের বিপরীতে তাঁর ভারতবিরোধী অবস্থান ধরে রাখার জন্য বর্তমানে ভারতবিরোধী এই অবস্থান নিয়েছেন।
বিষয়টি খুব সত্য বলে মনে হয় না। কারণ, কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা সাংবাদিক লিখতে পারেন, তারেক রহমান বাংলাদেশে জামায়াতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন। কিন্তু তারেক রহমান নিজে ভালো জানেন, তাঁকে এখনও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশে অনুপস্থিত শেখ হাসিনার সঙ্গে। এবং এই প্রতিযোগিতায় জামায়াত আগেও যেমন তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল, এখনও তেমনি। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ কেউ মনে করতে পারেন, দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা রাজনীতি করলে সেখানে তারেক রহমানের যেতে অসুবিধা। কিন্তু তারেক রহমান নিজে তো তাঁদের মতো রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ নন। তিনি নিজেও ১৭ বছর লন্ডনে বসে রাজনীতি করেছেন। রাজনীতি ও কূটনীতিতে সবাই ঝড়ের ভেতরই আম কুড়াবেন। কেউই ঝড় থামার জন্য অপেক্ষা করবেন না।
যাই হোক, তারেক রহমান হয়তো নিকট ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারত যাবেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও তাঁর আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আসবেন। এটা তিনি আগেও করতে পারতেন। কিন্তু ব্রিকসের মতো, জি-২০-এর মতো সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের বারবার মেলে না। আর এ ধরনের সম্মেলনে যোগদানে শুধু দেশের ইমেজ বাড়ে না, দেশের অর্থনীতিসহ নানান সুযোগও সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের জন্য সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
তাই যদি ধরেও নেওয়া হয়, তারেক রহমানের ব্রিকসে না যাওয়ার কারণ ছিল জামায়াত ও শেখ হাসিনা—বাস্তব রাজনীতি ও কূটনীতিতে এ যুক্তিগুলো কি সত্যিই মেনে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ? বরং তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তারেক রহমানের অন্য কোনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব আছে। সে হিসাবটি খোঁজাই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে যে কারণেই ব্রিকস বর্জন করা হোক না কেন, এ বর্জনের নিট ফল হলো, এর ফলে তারেক রহমানের নিজস্ব হিসাবে তিনি লাভবান হয়েছেন। কিন্তু সার্বিক বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।
লেখক: বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ ও The present World.
(২৪ সেপ্টম্বের The Financial Daily তে প্রকাশিত লেখার বাংলা অনুবাদ)
স্বদেশ রায় 


















