উত্তর আয়ারল্যান্ডের অভিনেত্রী লোলা পেটিক্রুর অভিনয়জীবনে এখন একের পর এক বৈচিত্র্যময় চরিত্র যুক্ত হচ্ছে। হুলুর নতুন থ্রিলার ‘ফিউরিয়াস’-এ প্রতিশোধপরায়ণ সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আলোচনায় এসেছেন। তবে এই চরিত্রের আগেও উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ ও রক্তাক্ত ইতিহাস ‘দ্য ট্রাবলস’কে ঘিরে নির্মিত দুটি আলোচিত ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন তিনি।
পেটিক্রুর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাভাবিকতা। চরিত্রের আবেগ, অভিব্যক্তি কিংবা আচরণে কৃত্রিমতা খুব কমই দেখা যায়। ‘ফিউরিয়াস’-এর মতো যৌন-রোমাঞ্চ ও ভৌতিক আবহের গল্পে নারীর ক্ষোভ, প্রতিশোধ এবং ন্যায্যতার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে আনা হলেও কিছু জায়গায় তার চরিত্রের আচরণের বৈপরীত্য সেই স্বাভাবিক অভিনয়ের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করেছে।
তবে ‘সেই নাথিং’ ও ‘ট্রেসপাসেস’ ধারাবাহিকে তার অভিনয়ে এমন দ্বিধা খুব একটা দেখা যায়নি। দুটি সিরিজই পেটিক্রুর নিজের জন্মভূমির ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তিনি পশ্চিম বেলফাস্টে জন্মেছেন ও বেড়ে উঠেছেন। দুটি ধারাবাহিকের গল্পই বেলফাস্ট ও এর আশপাশকে ঘিরে, আর ‘সেই নাথিং’-এর একটি বড় অংশ ও ‘ট্রেসপাসেস’-এর পুরো শুটিং হয়েছে উত্তর আয়ারল্যান্ডে।
দুটি সিরিজের পটভূমিতেই রয়েছে ‘দ্য ট্রাবলস’—১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রায় তিন দশকের বোমা হামলা, সংঘাত ও রক্তপাতের সময়। এই দুই ধারাবাহিকে পেটিক্রু এমন দুই ক্যাথলিক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যাদের জীবন সংঘাতের কারণে গভীরভাবে বদলে যায় এবং নিজেদের কাজ, বিশ্বাস ও আনুগত্য নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
‘সেই নাথিং’-এ পেটিক্রু অভিনয় করেছেন ডোলোরস প্রাইসের চরিত্রে। প্যাট্রিক র্যাডেন কিফের একই নামের নন-ফিকশন বই অবলম্বনে তৈরি নয় পর্বের এই ধারাবাহিকে দেখানো হয়েছে বেলফাস্টের সেই নারীকে, যিনি প্রভিশনাল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিতে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে লন্ডনে গাড়িবোমা হামলায় জড়িত থাকার কারণে তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।
প্রজাতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি প্রাইসের আনুগত্য ছিল দৃঢ়। কিন্তু জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি তার কর্মকাণ্ডের পরিণতি এবং সহকর্মী ও প্রতিবেশীদের মৃত্যুর স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করেন। বিশেষ করে যাদের তথ্যদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, তাদের মৃত্যুর সঙ্গে নিজের ভূমিকা নিয়েও তাকে গভীর দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
পেটিক্রুর ভাষায়, ‘সেই নাথিং’-এর গল্প তার নিজের প্রজন্মের প্রশ্নের সঙ্গেও মিলে যায়। কীভাবে একটি সাম্প্রতিক ও গভীরভাবে আঘাত করা অতীতের ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসা যায়, কীভাবে সেই ইতিহাসের পর মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে—এমন প্রশ্ন তাকে ব্যক্তিগতভাবেও ভাবিয়েছে।
‘ফিউরিয়াস’ ও ‘সেই নাথিং’-এর গল্পের ধরন একেবারেই আলাদা। একটিতে সিরিয়াল কিলার ও প্রতিশোধের গল্প, অন্যটি বাস্তব ইতিহাসভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতের নাটক। কিন্তু পেটিক্রুর অভিনীত দুই চরিত্রের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। দুজনই শারীরিক ও মানসিক আঘাতে গড়ে ওঠা নারী। দুজনই সেই আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় সহিংস পথে এগিয়ে যায়। তাদের মধ্যে রয়েছে রাগ, অবাধ্যতা, আবেগপ্রবণতা এবং যারা তাদের কষ্ট দিয়েছে তাদের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক মনোভাব।

এই চরিত্রগুলোকে শুধু গল্পের প্রয়োজনে তৈরি করা কোনো ‘মুখপাত্র’ হিসেবে মনে হয় না। পেটিক্রুর অভিনয়ে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মসচেতনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিজেদের চরম পরিস্থিতির মধ্যেও তারা কখনো কখনো সেই পরিস্থিতির অদ্ভুত দিকগুলো দেখতে পারে। ‘সেই নাথিং’-এ বয়সী ডোলোরস প্রাইসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাক্সিন পিক।
পেটিক্রুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক কাজ ‘ট্রেসপাসেস’। ব্রিটেনের চ্যানেল ফোরে গত নভেম্বরে প্রচারিত এই সিরিজটি লুইস কেনেডির উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্রে এর সম্প্রচার শুরু হয়েছে গত মাসে পিবিএসে।
এখানে পেটিক্রু অভিনয় করেছেন কুশলা লাভেরির চরিত্রে। ১৯৭৫ সালের উত্তর আয়ারল্যান্ডের এক তরুণ স্কুলশিক্ষিকা কুশলা পরিবারের পানশালায় খণ্ডকালীন কাজও করেন। সেখানে নিয়মিত আসা অতিথিদের মধ্যে ব্রিটিশ সেনারাও রয়েছে।
সেখানেই কুশলার পরিচয় হয় মাইকেল অ্যাগনিউর সঙ্গে। টম কালেন অভিনীত মাইকেল একজন বয়সে বড়, বিবাহিত আইনজীবী। তবে তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক ছিল তার ধর্মীয় পরিচয়—তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট।
মাইকেল ও তার প্রোটেস্ট্যান্ট বন্ধুদের মাধ্যমে কুশলা এমন এক জগতের সঙ্গে পরিচিত হন, যেখানে সংস্কৃতি, স্বস্তিদায়ক দৈনন্দিন জীবন এবং তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় বিভাজন ও মাইকেলের বিবাহিত জীবনের কারণে তাদের সম্পর্ক গোপন রাখতে হয়। ফলে কুশলা একই সঙ্গে দুটি আলাদা জীবন যাপন করতে শুরু করেন।

‘ট্রেসপাসেস’-এ কুশলার ক্যাথলিক পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। স্কুলে ধর্মীয় কর্তৃত্বের কঠোরতা, শিশুদের ওপর পুরোহিত ও প্রশাসকদের চাপ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং পরিবারের ভেতরের সংকট—সব মিলিয়ে তার জীবন ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। তার মা একজন বিষণ্ন ও মদ্যপ নারী, যিনি চরিত্রটির জীবনে একই সঙ্গে কষ্ট ও সাহসের উৎস হয়ে ওঠেন। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন গিলিয়ান অ্যান্ডারসন।
‘ট্রেসপাসেস’ মূলত একটি আবেগঘন যুদ্ধকালীন প্রেমের গল্প হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছে বিভক্ত সমাজে একজন সাধারণ নারীর টানাপোড়েন। কুশলা কোনো যোদ্ধা নন। কিন্তু তার চারপাশের সংঘাত, ধর্মীয় বিভাজন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যার পরিণতি ক্রমেই বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।
এই চরিত্রে পেটিক্রুকে একই সঙ্গে প্রেমের আনন্দ, সম্পর্কের উত্তেজনা এবং নতুন আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ ঘটাতে হয়েছে। আবার স্কুলের একটি ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারের ওপর ধারাবাহিক হামলার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তার হতাশা, ক্ষোভ ও কখনো কখনো আবেগপ্রবণ দৃঢ়তাও তুলে ধরতে হয়েছে।
‘সেই নাথিং’-এর তুলনায় ‘ট্রেসপাসেস’ হয়তো তুলনামূলকভাবে হালকা ও আবেগনির্ভর গল্প। তবু কুশলা চরিত্রে পেটিক্রুর অভিনয় আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ এখানে একজন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কীভাবে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মধ্যে আটকে যায়, সেটিই তার অভিনয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘ফিউরিয়াস’-এর প্রতিশোধপরায়ণ সিরিয়াল কিলার থেকে ‘সেই নাথিং’-এর রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া নারী, আর ‘ট্রেসপাসেস’-এর দ্বিধাগ্রস্ত প্রেমিকা—তিন চরিত্র তিন ধরনের গল্পের। কিন্তু লোলা পেটিক্রুর অভিনয়ে তাদের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্পষ্ট: আঘাত, ক্ষোভ, প্রতিরোধ এবং নিজের জীবনকে নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আর এই কারণেই উত্তর আয়ারল্যান্ডের নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের মধ্যে তার উত্থান এখন বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।












