স্বাধীনতার পর যে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে দেখা হতো, সেই দেশ এখন মানুষের গড় আয়ুর দিক থেকেও দক্ষিণ এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জন্মকালীন গড় আয়ু দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৯৩ বছর। একই বছরে ভারতের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ২৪ বছর এবং পাকিস্তানের ৬৭ দশমিক ৮০ বছর।
তবে বাংলাদেশের দীর্ঘায়ুর গল্প কেবল একটি সংখ্যার বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে শিশুমৃত্যু কমে যাওয়া, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি, শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের বিস্তার এবং গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অগ্রগতির সঙ্গে এসব সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
৪৬ বছর থেকে ৭৫-এর কাছাকাছি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৪৬ দশমিক ৫ বছর। স্বাধীনতার পরের পাঁচ দশকে তা প্রায় ২৮ বছর বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৭১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গড় আয়ু ৪৬ দশমিক ৫ বছর থেকে বেড়ে ৭২ দশমিক ৬ বছরে পৌঁছায়। একই সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ২২২ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৮-এ নেমে আসে।
এই পরিবর্তন বাংলাদেশের মানব উন্নয়নের অন্যতম বড় সাফল্য। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি চালিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অংশীদারিত্বও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দীর্ঘায়ুর ধারাবাহিক ইতিহাস
বাংলাদেশের গড় আয়ু বৃদ্ধির পথটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে ভাগ করা যায়। বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি উপাত্ত ও বাংলাদেশ বিষয়ক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে চিত্রটি মোটামুটি এমন:
| সময় | বাংলাদেশের গড় আয়ু | পরিবর্তনের তাৎপর্য |
|---|---|---|
| ১৯৬০ | প্রায় ৪৫ বছর | উচ্চ শিশুমৃত্যু ও সংক্রামক রোগের সময় |
| ১৯৭১ | প্রায় ৪৬ দশমিক ৫ বছর | স্বাধীনতার সময়ের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি |
| ১৯৮০ | প্রায় ৫৩ বছর | প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদানের বিস্তার |
| ১৯৯০ | প্রায় ৫৮ বছর | শিশুমৃত্যু ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি |
| ২০০০ | প্রায় ৬৫ বছর | পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান ও সামাজিক উন্নয়নের প্রভাব |
| ২০১০ | প্রায় ৭০ বছর | মাতৃ ও শিশুসেবা এবং শিক্ষায় অগ্রগতি |
| ২০১৯ | ৭২ দশমিক ৬৩ বছর | পাঁচ দশকে বড় ধরনের দীর্ঘায়ু অর্জন |
| ২০২০ | ৭১ দশমিক ৪২ বছর | মহামারির সময় আয়ুতে সাময়িক পতন |
| ২০২১ | ৭১ দশমিক ১০ বছর | করোনার প্রভাব অব্যাহত |
| ২০২২ | ৭৪ দশমিক ২৭ বছর | মহামারির পর দ্রুত পুনরুদ্ধার |
| ২০২৩ | ৭৪ দশমিক ৬৭ বছর | দীর্ঘায়ুর পুনরুদ্ধার অব্যাহত |
| ২০২৪ | ৭৪ দশমিক ৯৩ বছর | বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ উপাত্তে নতুন উচ্চতা |
বিশ্বব্যাংকের বর্তমান উপাত্তে ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই ধারাবাহিক সংখ্যাগুলো পাওয়া যায়। বিভিন্ন সংস্থার পদ্ধতি ও অনুমান ভিন্ন হওয়ায় একই বছরের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক: বেঁচে থাকার প্রথম বড় লড়াই
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ ছিল শিশু ও মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি, ডায়রিয়াসহ সংক্রামক রোগ এবং সীমিত স্বাস্থ্য অবকাঠামো। এই পরিস্থিতিতে টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এবং গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীভিত্তিক কর্মসূচির বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে টিকাদান, ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ভিটামিন ‘এ’ সম্পূরক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্যতা, শিক্ষা এবং নিরাপদ পানির বিস্তারও মানুষের স্বাস্থ্যগত ফলাফল উন্নত করেছে।
১৯৯০-এর দশক: স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সামাজিক পরিবর্তন
১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের দীর্ঘায়ু বৃদ্ধির পেছনে শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাসেবা নয়, সামাজিক পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ বাড়ে, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের হার বাড়ে এবং সন্তান জন্মদানের হার দ্রুত কমতে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে একজন নারীর গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৯টি সন্তান থাকলেও ২০১৯ সালে তা কমে প্রায় ২ দশমিক ০১-এ নেমে আসে। একই সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহারও ১৯৭১ সালের প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ২২২ জন থেকে ২০১৯ সালে প্রায় ৩০ দশমিক ৮-এ নেমে আসে।
অর্থাৎ দীর্ঘায়ু বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ ছিল—মানুষকে বেশি বছর বাঁচানোর পাশাপাশি শৈশবে মৃত্যুর ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা।
২০০০-এর পর: ৭০ বছরের সীমা পেরিয়ে
২০০০ সালের পর বাংলাদেশের গড় আয়ু ৬০-এর ঘর পেরিয়ে ৭০-এর ঘরে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ২০০০ সালে গড় আয়ু ছিল ৬৫ দশমিক ৪ বছর; ২০২১ সালে তা বেড়ে ৭৩ দশমিক ১ বছরে পৌঁছায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একই সঙ্গে সতর্ক করেছে যে এসব হিসাব মডেলভিত্তিক এবং অন্যান্য জাতীয় বা আন্তর্জাতিক হিসাবের সঙ্গে পার্থক্য থাকতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের বর্তমান ধারাবাহিক উপাত্তে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৬৩ বছর এবং ২০২৪ সালে ৭৪ দশমিক ৯৩ বছর।
এই পার্থক্য মূলত তথ্যের বছর, সংশোধিত হিসাব ও পরিসংখ্যানগত পদ্ধতির ভিন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বোঝাতে একই উৎসের ধারাবাহিক উপাত্ত ব্যবহার করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
করোনায় ধাক্কা, এরপর পুনরুদ্ধার
দীর্ঘায়ুর ঊর্ধ্বমুখী ধারায় করোনাভাইরাসের মহামারি সাময়িক ধাক্কা দেয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে অতিরিক্ত মৃত্যু ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপের কারণে আয়ু কমে যায়।
বিশ্বব্যাংকের বর্তমান উপাত্তে বাংলাদেশের গড় আয়ু ২০১৯ সালের ৭২ দশমিক ৬৩ বছর থেকে ২০২০ সালে ৭১ দশমিক ৪২ এবং ২০২১ সালে ৭১ দশমিক ১০ বছরে নেমে আসে। এরপর ২০২২ সালে তা ৭৪ দশমিক ২৭ এবং ২০২৩ সালে ৭৪ দশমিক ৬৭ বছরে উঠে যায়। ২০২৪ সালে তা আরও বেড়ে ৭৪ দশমিক ৯৩ বছরে পৌঁছায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, মহামারির ধাক্কার পর বিশ্বে গড় আয়ু পুনরুদ্ধার হয়েছে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক গড় আয়ু ৭৩ দশমিক ৩ বছরে পৌঁছায়, যা ২০১৯ সালের ৭৩ দশমিক ৪ বছরের কাছাকাছি। তবে সুস্থ আয়ু একই গতিতে পুনরুদ্ধার হয়নি।
দীর্ঘায়ু বেড়েছে, কিন্তু সুস্থ জীবন কি একই হারে বেড়েছে?
এখানেই বাংলাদেশের সামনে নতুন প্রশ্ন।
গড় আয়ু বলতে জন্মের সময় একজন মানুষ গড়ে কত বছর বাঁচতে পারেন, তার একটি পরিসংখ্যানগত প্রত্যাশা বোঝায়। এটি এই নিশ্চয়তা দেয় না যে পুরো সময়টি রোগমুক্ত অবস্থায় কাটবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, সুস্থ আয়ু বা স্বাস্থ্যকর জীবনপ্রত্যাশা হলো একজন মানুষ জন্মের পর গড়ে কত বছর পূর্ণ সুস্থতায় বাঁচতে পারেন।
দীর্ঘায়ুর সঙ্গে অসংক্রামক রোগের বোঝাও বাড়ছে। হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, কিডনি রোগ এবং বয়স্কদের বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক বিশ্লেষণেও অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশেও জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রয়োজনও বাড়ছে।
সামনে চ্যালেঞ্জ ‘আরও বেশি বছর’ নয়, ‘আরও সুস্থ বছর’
বাংলাদেশের দীর্ঘায়ুর ইতিহাস মূলত জনস্বাস্থ্য সাফল্যের ইতিহাস। পাঁচ দশকে গড় আয়ু প্রায় ৪৬ বছর থেকে ৭৫ বছরের কাছাকাছি উঠেছে। একই সময়ে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু ও প্রজনন হার কমেছে; টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটেছে; মেয়েদের শিক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণ বেড়েছে।
কিন্তু দীর্ঘায়ুর পরবর্তী অধ্যায়টি ভিন্ন। এখন লক্ষ্য শুধু মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেওয়া নয়—বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা, মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শারীরিক সক্ষমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কারণ একজন মানুষ ৭৫ বছর বাঁচছেন—এটি একটি সাফল্য। কিন্তু সেই ৭৫ বছরের কতটা তিনি সুস্থ, কর্মক্ষম ও মর্যাদাপূর্ণভাবে কাটাতে পারছেন—আগামী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অগ্রগতির প্রকৃত মানদণ্ড সম্ভবত সেটিই।












