কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর দ্রুত বদলে যাওয়া ডিজিটাল বিনোদনের যুগেও চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের পর্দায় বারবার ফিরে আসছে শতবর্ষী সাহিত্যকর্ম। জেন অস্টিনের সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি থেকে প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস, এমিলি ব্রন্টির উদারিং হাইটস, হোমারের দ্য ওডিসি, মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কিংবা জন স্টেইনবেকের ইস্ট অব ইডেন—পুরোনো বই যেন নতুন করে দখল করছে আধুনিক পর্দা।
প্রশ্ন উঠছে, প্রযুক্তির এত বিস্তারের মধ্যেও কেন নির্মাতারা আবার ফিরে যাচ্ছেন বনেট পরা নারী, পুরোনো পোশাকের পুরুষ আর বহু আগের সমাজের গল্পে? এটি কি সৃজনশীলতার সংকট, নাকি পুরোনো সাহিত্যের এমন কিছু শক্তি আছে যা সময় বদলালেও দর্শকের কাছে প্রাসঙ্গিক থেকে যায়?
সাম্প্রতিক সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি তারই একটি উদাহরণ। জর্জিয়া ওকলির পরিচালনায় তৈরি নতুন সংস্করণটি আগের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনা টানছে দর্শকরা। এলিনর ড্যাশউডের চরিত্রে অভিনয় করছেন ডেইজি এডগার-জোন্স এবং তার বোন ম্যারিয়ানের ভূমিকায় রয়েছেন এসমে ক্রিড-মাইলস।
নতুন সংস্করণে গল্পের আবহ আগের তুলনায় আরও গম্ভীর। গ্রামীণ সৌন্দর্যের বদলে দুর্গম পাহাড়ি প্রান্তর, প্রেমের টানাপোড়েনের পাশাপাশি দুই বোনের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরোনো গল্প হলেও নির্মাতারা চেষ্টা করেছেন এমন কিছু তুলে ধরতে, যা বর্তমান সময়ের দর্শকের কাছে নতুন করে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
জেন অস্টিনের লেখার বড় শক্তি ছিল খুব ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষের গভীর আবেগ প্রকাশ করা। একটি চাহনি, ভুল বোঝাবুঝি, না বলা কথা কিংবা মনের গোপন টান—ইতিহাসের বিশাল প্রেক্ষাপটে এগুলো হয়তো সামান্য ঘটনা। কিন্তু অস্টিন সেগুলো এমনভাবে লিখেছেন যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠক ও দর্শক তাতে নিজেদের আবেগ খুঁজে পেয়েছেন।
এই কারণেই প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিসও বারবার পর্দায় ফিরছে। নতুন সংস্করণটি ডিসেম্বর মাসে নেটফ্লিক্সে আসার কথা। একই সময়ে উদারিং হাইটস ও দ্য ওডিসি নতুন করে দর্শকের আগ্রহ তৈরি করেছে। সামনে রয়েছে ইস্ট অব ইডেন, এ টেল অব টু সিটিজ এবং জনি ডেপ অভিনীত নতুন এ ক্রিসমাস ক্যারল।
পুরোনো গল্প কেন এত আকর্ষণীয়?
আধুনিক জীবনের অতিরিক্ত গতি ও প্রযুক্তিনির্ভরতার বিপরীতে পুরোনো সাহিত্য দর্শককে এক ধরনের মানসিক আশ্রয় দেয়। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা প্রতিদিনের ডিজিটাল ব্যস্ততা নেই। আছে প্রেম, অর্থ, পরিবার, ঈর্ষা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও সম্পর্ক—মানুষের চিরন্তন অভিজ্ঞতা।
এই পুরোনো গল্পগুলোর আরেকটি সুবিধা হলো, এগুলো আধুনিক দর্শকের কাছে এক ধরনের ভিন্ন জগতের অনুভূতি তৈরি করে। দ্রুতগতির প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে পুরোনো পোশাক, বাড়িঘর, গ্রামাঞ্চল ও ঐতিহাসিক পরিবেশ অনেকটা রূপকথার মতো মনে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু বিপর্যয় কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এমন সময়ে পরিচিত ও পরীক্ষিত গল্প দর্শকের কাছে স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিষয়টি শুধু নস্টালজিয়ার নয়। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের জন্য পুরোনো সাহিত্যকর্ম বাণিজ্যিকভাবেও তুলনামূলক নিরাপদ। একেবারে নতুন গল্পের সাফল্য সম্পর্কে নির্মাতাদের অনিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু বিখ্যাত বইয়ের আগে থেকেই পাঠক রয়েছে, গল্পের পরিচিতি রয়েছে এবং নতুন সংস্করণ নিয়ে আলোচনার সুযোগও তৈরি হয়।
চলতি বছরে বইভিত্তিক চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকগুলোর বৈশ্বিক চাহিদা গড় নতুন শিরোনামের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হয়েছে বলে শিল্প বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে পুরোনো সাহিত্য এখন শুধু সাংস্কৃতিক সম্পদ নয়, বিনোদন ব্যবসার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
পুরোনো গল্পকে কতটা বদলানো যায়?
এখানেই তৈরি হয় সবচেয়ে বড় সৃজনশীল চ্যালেঞ্জ। কোনো উপন্যাসকে হুবহু পর্দায় তুলে ধরলে সেটি প্রাণহীন হয়ে যেতে পারে। আবার মূল গল্পকে অতিরিক্ত বদলে ফেললে দর্শকের কাছে সেটি হাস্যকর বা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে।
চলচ্চিত্র নির্মাতাদের তাই মূল গল্পের আত্মাকে ধরে রেখে সময়ের সঙ্গে মানানসই পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
নতুন সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি-তে দুই বোনের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ বর্তমান দর্শকের কাছে নারীর জীবনকে শুধু পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দেখার প্রবণতা আগের মতো গ্রহণযোগ্য নয়।
আবার ইস্ট অব ইডেন-এর নতুন ধারাবাহিক সংস্করণে জন স্টেইনবেকের বিশাল উপন্যাসের পুরো কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৫৫ সালের চলচ্চিত্রে গল্পের একটি অংশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। নতুন সাত পর্বের সংস্করণে পুরো পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রত্যাখ্যান, ভাগ্য ও স্বাধীন ইচ্ছার গল্পকে বিস্তৃত করা হয়েছে।
এতে চীনা-আমেরিকান চরিত্র লি-কে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যাকে আগের চলচ্চিত্রে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ক্যাথির চরিত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। উপন্যাসে তাকে প্রায় সম্পূর্ণ অশুভ চরিত্র হিসেবে দেখা হলেও নতুন সংস্করণে তার অতীতের নির্যাতন ও মানসিক ক্ষতকে সামনে এনে তাকে আরও মানবিক করে দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন নির্মাতারা শুধু পুরোনো গল্প বলছেন না; তারা দেখাচ্ছেন, সময়ের সঙ্গে একই গল্পের অর্থও বদলে যেতে পারে।
পর্দার জনপ্রিয়তা বইয়ের বিক্রিও বাড়াচ্ছে
এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকের সাফল্য সবসময় বইকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে উল্টো বইয়ের বিক্রি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দ্য ওডিসি এর ভালো উদাহরণ। ব্রিটেনে ২০২৬ সালে বইটির বিক্রি আগের তুলনায় ২৬৫ শতাংশ বেড়েছে। ভারতে বেড়েছে ৫৯৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি প্রায় চার গুণ হয়েছে। উদারিং হাইটসও ব্রিটেনের বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষে উঠেছে—প্রকাশের প্রায় ১৮০ বছর পর।
অর্থাৎ একজন দর্শক প্রথমে পর্দায় গল্পটি দেখছেন, তারপর হয়তো কৌতূহল থেকে বইটি হাতে নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। তরুণ পাঠকদের একটি অংশ ভিডিও, আলোচনা ও অনলাইন সংস্কৃতির মাধ্যমে পুরোনো লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে এবং সেখান থেকে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
অনেক পাঠক আবার চলচ্চিত্র মুক্তির আগেই মূল বই পড়ে ফেলছেন। অর্থাৎ পর্দা ও বইয়ের মধ্যে সম্পর্কটি সবসময় প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়; বরং একে অন্যের পাঠক-দর্শক তৈরি করছে।
সাহিত্য কি তাহলে হারিয়ে যাচ্ছে?
সাহিত্য পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার আশঙ্কা অবশ্য বাস্তব। অনেক শিক্ষার্থী পুরো উপন্যাসের বদলে নির্বাচিত অংশ পড়ে। চলচ্চিত্রনির্ভরতার প্রভাবও কখনো কখনো পরীক্ষায় দেখা যায়। রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নিয়ে এক পরীক্ষকের প্রতিবেদনে এমন শিক্ষার্থীর কথা উঠে এসেছিল, যারা নাটকের বদলে চলচ্চিত্র দেখে গল্প সম্পর্কে উত্তর দিতে গিয়ে বন্দুক ও পেট্রল স্টেশনের মতো চলচ্চিত্রের উপাদান উল্লেখ করেছে।
তবু একই সময়ে পুরোনো বইয়ের নতুন পাঠকও তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ সাহিত্য হারিয়ে যাচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
বরং পুরোনো সাহিত্য নতুন মাধ্যমের সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে বেঁচে থাকার পথ খুঁজছে। একেক যুগ একেকভাবে একই গল্পকে ব্যাখ্যা করছে। যেমন পুরোনো কবিরা মৌখিকভাবে পৌরাণিক গল্প নতুন করে বলতেন, তেমনি আজকের চলচ্চিত্র নির্মাতারাও পুরোনো কাহিনিতে নিজেদের সময়ের ছাপ যুক্ত করছেন।
তাই আবার প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস তৈরি হওয়া কিংবা এ টেল অব টু সিটিজ নতুন করে পর্দায় আসাকে শুধু সৃজনশীলতার অভাব হিসেবে দেখা হয়তো ঠিক নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, কিছু গল্পের শক্তি এতটাই দীর্ঘস্থায়ী যে সময় বদলালেও সেগুলো নতুন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
চলচ্চিত্র শিল্প যখন নতুন গল্প তৈরির ঝুঁকি নিতে সংকুচিত হচ্ছে, তখন ক্লাসিক সাহিত্য একই সঙ্গে নির্মাতাকে পরিচিত ভিত্তি এবং দর্শককে পরিচিত আবেগ দিচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেই পর্দার গল্প আবার মানুষকে বইয়ের কাছেও ফিরিয়ে দিতে পারে।
তাই বনেট, পুরোনো বাড়ি আর ঘোড়ার গাড়ির এই ফিরে আসা হয়তো সংস্কৃতির বার্ধক্যের লক্ষণ নয়। বরং পুরোনো গল্পকে নতুন চোখে দেখার মধ্য দিয়েই সাহিত্য ও চলচ্চিত্র—দুই শিল্পই নতুন জীবন পেতে পারে।












