ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনউয়ে ২৮ বছর বয়সী ক্যাফে মালিক শিবা শর্মার মৃত্যুর ঘটনায় মডেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ শ্রদ্ধা দুবেকে খুঁজছে পুলিশ। এ ঘটনায় শ্রদ্ধা, তাঁর বোন রশ্মি এবং তাঁদের গাড়িচালকের সন্ধান ও গ্রেপ্তারে সহায়তাকারী তথ্যের জন্য প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার রুপি করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর আওধ গ্রিন অ্যাপার্টমেন্টের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে শিবার মৃত্যু হয়। তবে তিনি কীভাবে নিচে পড়ে গেলেন, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে শ্রদ্ধা দুবে এখনো পলাতক। তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান ও পালানোর পথ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশি দল দিল্লি এবং নেপাল সীমান্তের দিকে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় অঞ্চলের উপপুলিশ কমিশনার বিক্রান্ত বীর।
সিসিটিভি ফুটেজ ঘিরে নতুন তদন্ত
মঙ্গলবার সামনে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে শিবাকে ভবনটির চতুর্থ তলা থেকে নিচে পড়ে যেতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ ফুটেজটি পরীক্ষা করছে, যাতে মৃত্যুর আগের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠন করা যায় এবং অ্যাপার্টমেন্টে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
শ্রদ্ধার ঘনিষ্ঠ দুই থেকে তিনজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শিবার সঙ্গে শ্রদ্ধার সম্পর্ক এবং মৃত্যুর আগের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই এর উদ্দেশ্য।
তবে ফুটেজটির সত্যতা, সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং তদন্তে এর প্রমাণমূল্য এখনো যাচাই করা প্রয়োজন। শিবা নিজে লাফ দিয়েছিলেন, দুর্ঘটনাবশত পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল—এসব সম্ভাবনার কোনোটিই এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শরীরে সিগারেটের পোড়া দাগের অভিযোগ
শিবার মা রঞ্জনা শর্মা অভিযোগ করেছেন, মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে মারধর, হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগে শ্রদ্ধা দুবে, শ্রদ্ধার বোন রশ্মি এবং আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেছেন, শিবার শরীরে সিগারেটের পোড়া দাগ ছিল।
এ ঘটনায় হাজরতগঞ্জ থানায় ভারতের ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(১) ধারায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, শিবা ও শ্রদ্ধা প্রায় তিন থেকে চার মাস ধরে বালু আড্ডা এলাকার আওধ গ্রিন অ্যাপার্টমেন্টে একসঙ্গে বসবাস করছিলেন। এজাহারে শিবাকে চতুর্থ তলা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে শিবার শরীরে একাধিক বাহ্যিক আঘাত এবং ফুসফুস, যকৃৎ ও প্লিহায় গুরুতর অভ্যন্তরীণ ক্ষতির কথা উল্লেখ রয়েছে। অতিরিক্ত আঘাতের ফলে সৃষ্ট শক ও রক্তক্ষরণকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আঘাতের বিবরণ একাই মৃত্যুর পরিস্থিতি বা দায়ী ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে না।
শ্রদ্ধার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিতি
উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলির বাসিন্দা শ্রদ্ধা মডেলিং, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও ফ্যাশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচিতি পান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ‘বেস্ট ফেস অব লখনউ’ খেতাব পেয়েছিলেন। ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার। তাঁর অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও রয়েছে। প্রায় সাত বছর আগে প্রকাশিত একটি সংগীত ভিডিওতেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিবার মৃত্যুর পর রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা এবং অপরাধজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তির সঙ্গে শ্রদ্ধার ছবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা কয়েকটি ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
শিবার মা অভিযোগ করেছেন, শ্রদ্ধা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলে তাঁর ছেলেকে ভয় দেখাতেন এবং ফৌজদারি মামলায় ফাঁসানো বা সুনাম নষ্ট করার হুমকি দিতেন। পুলিশ এসব অভিযোগ ও শ্রদ্ধার কথিত যোগাযোগের বিষয় তদন্ত করছে। তবে কারও সঙ্গে ছবি থাকা বা সামাজিক যোগাযোগের সম্পর্ক নিজে থেকেই অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়।
শিবার বিরুদ্ধেও ছিল ফৌজদারি মামলা
শিবা পরিবারের সঙ্গে লখনউয়ের আলিগঞ্জ এলাকায় থাকতেন। ক্যাফের পাশাপাশি তাঁর দুটি রেস্তোরাঁও ছিল। গত ৩০ আগস্ট গোমতীনগরের একটি নাইটক্লাবে গুলির ঘটনার মামলায়ও তাঁর নাম অভিযুক্ত হিসেবে এসেছিল। ওই ঘটনায় পুলিশ তাঁর সন্ধানে ৫০ হাজার রুপি পুরস্কার ঘোষণা করে। পরে বিশেষ টাস্ক ফোর্স পাটনা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
শিবার মৃত্যুর তদন্তে এখন সিসিটিভি ফুটেজ, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্রদ্ধা দুবে ও অন্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এবং মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের ফলেই স্পষ্ট হবে।












