পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণা সত্ত্বেও রোববার রাজধানী ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বিক্ষোভের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা, ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল।
শ্রমিকদের দাবি, তাঁদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বেতনে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন
রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। শ্রমিক প্রতিনিধি ও পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়।
ঢাকা ও গাজীপুরে সংঘর্ষ, বন্ধ কারখানা
ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন কয়েক হাজার শ্রমিক। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে, রাজধানীর উপকণ্ঠে গাজীপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করেন শত শত শ্রমিক। এতে ওই এলাকার যান চলাচল ব্যাহত হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, বিক্ষোভের কারণে মালিকপক্ষ ২৫ থেকে ৩০টি কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার ঢাকার উপকণ্ঠের অন্যতম বড় পোশাক উৎপাদন কেন্দ্র আশুলিয়ায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের পর কয়েক ডজন কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
রপ্তানি ও অর্থনীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা
দীর্ঘ সময় ধরে কারখানায় অস্থিরতা চলতে থাকলে পোশাক রপ্তানির চালান পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থপ্রাপ্তিতে বিলম্ব হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন শ্রমমন্ত্রী। এতে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক—দুই পক্ষই আর্থিক সমস্যায় পড়তে পারেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। মোট দেশজ উৎপাদনেও শিল্পটির অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ফলে এই শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু শ্রমিক ও কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে নতুন চাপ
পোশাকশিল্পের মালিকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা এমনিতেই চাপে রয়েছেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে ব্যবসা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন না বাড়ালে তাঁদের পক্ষে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারের মজুরি বোর্ড গঠনের পর এখন শ্রমিকদের প্রত্যাশা, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। তবে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা কতটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।












