ইউনূসের আমলে দুই-তিন মাস না যেতেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পাঁচ-সাতজন ছেলে কয়েক মিনিটের জন্য কোনো একটা রাস্তায় ঝটিকা মিছিল করত। কখনো কখনো সেখান থেকে দু-একজন গ্রেফতার হতো। তাদের ভেতর আবার দু-একজন “জয় বাংলা” বলতে বলতে পুলিশ ভ্যানে উঠত।
মাত্র কয়েক দিন আগে যে দলটি দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, সেই দলের এই দশা দেখে একজন বিদেশি আমাকে যা প্রশ্ন করে, তা ছিল এমনই—আচ্ছা, এই রাজনৈতিক দলটি তো শেষ হয়ে গেছে। তারপরেও কেন এই পাঁচ-সাতজন ছেলে এমন করে ঝুঁকি নিয়ে জেলে যাচ্ছে, মবের শিকার হচ্ছে?
বিদেশি ভদ্রলোক ধরেই নিয়েছেন দলটি শেষ হয়ে গেছে, তাই সে সম্পর্কে আমি কোনো উত্তর না দিয়ে বলি, এই দলটি জন্ম থেকেই এভাবে মার খায়, আর ইতিহাস গড়ে।
তিনি জানতে চান, কাদের হাতে মার খায়—আবার জন্ম থেকেই কেন মার খায়? আমি বললাম, দেখো, এই দলটি একটি ভূমিজাত রাজনৈতিক দল। মূলত যেমন করে কোনো দেশের মাটিতে ওই ভূগোলের স্বাভাবিক উদ্ভিদগুলো জন্মায়, তারপরে তারা সকলে মিলে একটা বন হয়—তেমনি এই রাজনৈতিক দলটি।
এদের প্রথম দিকের মার খাওয়ার কাহিনী আমি শুনেছি, কমরেড তোয়াহার কাছে। কমরেড তোয়াহাকে তুমি নাও চিনতে পারো, তবে যাদের ওপর আঘাত এসেছিল, তাদের একজন পরবর্তী বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর নাম সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কমরেড তোয়াহার বক্তব্য অনুযায়ী, তারা কয়েকজন মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলে আওয়ামী মুসলিম ছাত্রলীগ গড়েন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম ওই হলের সভাপতি হন। ওই সময়ে তারা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন। তাই তারা হল থেকে বের হলেই, এমনকি রাতের বেলায় পুরোনো ঢাকার মুসলিম লীগের গুন্ডারা হলে এসে তাদের ওপর হামলা করত।
এমন প্রতিটি অধ্যায়ে এমন অনেক মার খাওয়ার ও জেলে যাওয়ার ইতিহাস তাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় আছে।

তখন তিনি জানতে চাইলেন, আমি নিজের চোখে কী এর আগে তাদের এমন খুবই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় মার খেতে, জেলে যেতে বা এমন দু-চারজনের মিছিল করতে দেখেছি?
উত্তরে বলি, এই দলটির সবচেয়ে খারাপ সময়ে এমনই দু-চারজনের দুই-তিন মিনিটের মিছিল আমি দেখেছি।
তিনি আমার পুরো কথা বলতে না দিয়েই বললেন, এই দলটির তো সবচেয়ে খারাপ সময় ১৯৭১ আর এই ২০২৪। তা তুমি কি ১৯৭১-এর কথা বলছ?
আমি তাঁকে বলি, দেখো, এই দলটির সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে। কারণ, অন্যরা বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যাই মনে করুন না কেন, ১৯৭১ সালে এই দলের কর্মীরা কিন্তু মনে করত, পাকিস্তানের কারাগারে থাকলেও তাদের নেতা আছেন। এবং তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। এবং তিনি তাদের মাঝে ফিরে আসবেন। তেমনি ২০২৪-এর পরে এরা যতই ঘরছাড়া হোক, পালিয়ে বেড়াক, জেলে যাক—এরা বিশ্বাস করে, তাদের নেতা শেখ হাসিনা সময়মতো তাদের মাঝে ফিরে আসবেন। এবং শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।
কিন্তু ওই অর্থে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় নেতাদের হত্যা করার পরে তাদের কোনো নেতা ছিল না। তারপরেও দেখেছি, সিনেমার শো শেষ হতেই চার-পাঁচজন হঠাৎ “জয় বাংলা” স্লোগান দিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেছে। আর সেই তিন-চারজন থেকেই দেখা গেছে, ১৯৭৮ সাল আসতেই এই দলের ঘরছাড়া, বাড়িছাড়া, এমনকি বছরের পর বছর যারা সারা রাত সুন্দরবনে কাটিয়েছে, তারা রাজপথে বিশাল মিছিল নিয়ে চলে এলো। আর তাদের সঙ্গে ওই মিছিলে দেখা যেত, খালি পায়ে, লুঙ্গি পরা দরিদ্র মানুষদের। তাদের চোখে আমি একটা অদ্ভুত নেশা দেখেছি এই দলটির প্রতি। সেই নেশার ভাষা আজও আমি বুঝতে পারিনি।

১৯৭৫-এর পরে যে কিশোর, তরুণদের রাজপথে দেখেছি, তাদেরকে ১৯৭৩ বা ১৯৭৪ সালে যখন এই দলটি ক্ষমতায় ছিল, তখন ওইভাবে বীরত্বের সঙ্গে পা ফেলতে দেখিনি।
তারপর তাকে সংক্ষেপে বলি, বাস্তবে এই দলটির শক্তিশালী ও সংগ্রামী কর্মীবাহিনী গড়ে ওঠে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা, অর্থাৎ স্বাধিকার আদায়ের কর্মসূচি দিলে, যখন আইয়ুব খান একের পর এক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা শুরু করে। শেখ মুজিবসহ প্রথম সারির সব নেতাদের ফাঁসির আসামি করে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করে—সেই সময়ে সাধারণ তরুণ, কিশোরদের ভেতর থেকে, শ্রমিকদের, কৃষকদের ভেতর থেকে মানুষ এসে দলটির কর্মী হতে শুরু করে। একের পর এক নির্যাতনের মুখে তারা মার খেতে খেতে কেউ মরে যায়, কেউ পোড়খাওয়া কর্মী হয়।
ঠিক তেমনি আবার সংগ্রামী কর্মী ও নেতা হওয়া শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে, যখন আবার অত্যাচার নেমে আসে তাদের ওপর।
তিনি জানতে চান, সে অত্যাচার বলতে কেমন ছিল? তাকে বলি, সেদিন মনে করো একটি সাবডিভিশন শহরের কলেজে সাধারণ ছাত্রদের মধ্য থেকে ভেতরে ভেতরে এদের দলের ছাত্রসংগঠনের একজন নেতা দাঁড়িয়ে গেছে। তার বাবা হয়তো স্টেশনের পাশে ছোট একটা খাবারের দোকান দিয়ে সৎভাবে জীবনযাপন করে। ছেলের অপরাধে বাবার দোকানটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আর ছেলেটিকে জেলে নিয়ে গেছে। দুই বছর বিনা বিচারে জেলে থেকে যখন ছেলেটি ভিন্ন জেলার জেল থেকে বের হয়ে এসেছে, তখন নিজ এলাকার স্টেশনে নামতেই ফুলের মালায় ভরে গেছে তার গলা। শুধু তাই নয়, তার কথাবার্তায় একটা পরিপক্বতার ছাপ।
তাই দেখা যায়, এই দলটি যখন সংকটে পড়ে, যখন তার ওপর অত্যাচার নেমে আসে, তখনই তার প্রকৃত সংগ্রামী কর্মীর জন্ম হয়। যে কারণে এ দেশের ও দলের অনেক হিতাকাঙ্ক্ষী মনে করেন, এই দলটির মাঝে মাঝে সংকটে পড়া উচিত। তখন দেশের এক শ্রেণির মানুষও দলটিকে প্রয়োজনীয় মনে করে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধি হিসেবে। আবার গড়ে ওঠে মাঠে-ঘাটে, জঙ্গলে ও জেলে কাটানো এক ঝাঁক সংগ্রামী কর্মী। অন্যদিকে ক্ষমতায় থাকার সময় উর্বশী নাচানো যে নেতৃত্বশ্রেণিটা গড়ে ওঠে, তারা ঝরে যেতে বাধ্য হয়।
কারণ, অত্যাচার, নির্যাতন, জেল খাটার ভেতর দিয়ে বের হয়ে আসা একেকজন কর্মী তখন এত ভারী হয় যে তাদের পাল্লার এক পাশে দিলে অপর পাশে উর্বশী নাচানো একশটি নেতা দিলেও তাদের এক কণার ওজনের সমান হয় না।

ভদ্রলোক আমার কাছে জানতে চান, তাহলে কি আমি বলতে চাইছি, আগামীতে যখন এই দলটি রাজনীতিতে ফিরতে পারবে, তখন একটি পরিশুদ্ধ রাজনৈতিক দল হিসেবে আসবে।
আমি হেসে বলি, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে সমাজবিজ্ঞান তা বলে না। কারণ, যে আদর্শেরই হোক না কেন, সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক দল দ্রুতই সমাজের সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের কবলে পড়ে যায়। আর তখনই আস্তে আস্তে পেছনে পড়তে থাকে আদর্শবাদী এই কর্মীরা। এ দলের ক্ষেত্রে অতীতেও তাই দেখা গেছে।
তবে তারপরও এ ধরনের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিপর্যয় সব সময়ই আশীর্বাদ। কারণ, লোহার গায়ে দ্রুত মরিচা ধরে, সোনার ভেতর নানানভাবে খাদ ঢোকানো হয়। বিপর্যয়ের আগুনে গলিয়ে কিছুটা খাঁটি লোহা ও খাঁটি সোনা যে মেলে, তার ওপর ভর করে তারা আরও কিছুদিন দেশ ও মানুষের জন্য—সর্বোপরি আপন সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করতে পারে।
একটি দেশের প্রকৃত রাজনৈতিক দল সেটাই, যে তার দেশের আপন ভৌগোলিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়। আর সংস্কৃতি, কালচার বা কৃষ্টি যে নামেই বলা হোক না কেন, একটি জাতির উৎপাদন ও বৃদ্ধি তার আপন সংস্কৃতি বা কৃষ্টির ভেতরই নিহিত থাকে। এর বাইরে গিয়ে ক্ষমতা ভোগ করা যায়, কিন্তু দেশের জন্য ভালো কিছু করা যায় না। সব দেশের ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দেয়।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
সাংবাদিক শফিকুর রহমান: ধাবমান কালের গর্ভে তিনিও চলে গেলেন
বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
একাত্তরে দুর্গা নয়, ইন্দিরা গান্ধী; কারাগারে চিম্ময় ও গাঁয়ের মেয়ে দুর্গা
জিএম কাদেরের বাসা আক্রমণ করার আগে তো আইএমএফের সদর দপ্তর আক্রমণ করতে হয়











