১২ অক্টোবর, ২০২৬ সকাল দশটা চল্লিশ মিনিটে শুরু হয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের ঢাকার উত্তরার বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। যদিও বাড়ির ভেতর তিনি ও পরিবার-পরিজনের শরীরে কোনো আঘাত লাগেনি। তবে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে ও স্থির ছবিতে যা দেখা গেছে, তা থেকে বোঝা যায়, তার বাড়ির যথেষ্ট ক্ষতি করতে হামলাকারীরা সক্ষম হয়।
বাস্তবে ওই হামলায় জি এম কাদেরের বাড়ির কতটা ক্ষতি হয়েছে, জি এম কাদের অক্ষত আছেন কি না, তা বড় নয়। এই হামলার ভেতর দিয়ে প্রমাণ হলো, মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী ইউনূস দেশের মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তার শাসন মেনে নেওয়ার যে মব ভায়োলেন্স চালু করেছিল, তা এখনও চলছে।

দেশ যে মব ভায়োলেন্স থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি—সে খবর দেশের মিডিয়ায় না এলেও সোশ্যাল ফোরামে নিয়মিত আসে। যেমন, জি এম কাদেরের বাসভবনে হামলা করার আগের দিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা রোটনের মরদেহ প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ঢাকায় এলেও তার জানাজা হতে পারেনি ঢাকায়। মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে তা বন্ধ করা হয়। এর আগের দিন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে অপসারণের চেষ্টা হয়। এই লেখা যখন লিখছি, তখনও তিনি অবরুদ্ধ।
ইউনূস মব ভায়োলেন্স চালু করেছিল তার মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে। কারণ, ধুরন্ধর সুদের ব্যবসায়ী ইউনূস ভালো মতেই জানত, সে এ দেশে মোটেই জনপ্রিয় ব্যক্তি নয়। এমনকি তার সঙ্গে যারা ক্ষমতায় গিয়েছিল এবং যারা তাকে প্রশংসা করে, তারাও সমাজে সুবিধাবাদী হিসেবে চিহ্নিত। যে কারণে ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের পার্ট হিসেবে যেমন আগে থেকেই গণভবন লুট করে দেশে লুট শুরু করে দেওয়ার জন্য আগেই তার মেটিকুলাস ডিজাইনের পার্ট হিসেবে কৌশলী ব্যক্তিকে দিয়ে গণভবনের ভিডিও তৈরি করে। কারণ, ইউনূসের ভাষায় তার এ মেটিকুলাস ডিজাইনটি “অ্যামেজিং”। এ কারণে এর বহু ডালপালা ভবিষ্যতে বের হবে।
ইউনূসের ওই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল যে মোটেই গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল, তার প্রমাণ সে ক্ষমতায় এসে বৈধ ও অবৈধভাবে জঙ্গিদের জেল থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
শুধু তাই নয়, একটি তথাকথিত একদলীয় জোটের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দেশকে ও নির্বাচন-পরবর্তী যে সরকার গঠিত হয়েছে, তাকে মূলত সে একটি সংকটের ভেতর ফেলে দিয়ে গেছে।
ইউনূস ও তার সুবিধাভোগীরা বাস্তবে নির্বাচনের পক্ষেই ছিল না। যে দলটি ক্ষমতায় এসেছে, তারা নির্বাচন করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে দেয়নি। কিন্তু সে দলটি তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে কিন্তু ইউনূসের নির্বাচনী ছক থেকে বের হতে পারেনি। যার ফলে দেশে ওই অর্থে কোনো নির্বাচন হয়নি। এবং দেশি ও বিদেশি যে শক্তি মনে করেছিল, এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে ইউনূসের চক্র থেকে বের করে আনা যাবে—তারা ইউনূসের চক্র ও বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।

তাছাড়া বিদেশিরা কখনোই—তাই সে যত বড় বন্ধু হোক না কেন—অন্য দেশের ভালোর জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। তারা সিদ্ধান্ত নেয় সব সময়ই তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে। যে কারণে সুযোগ পেলেই তারা দুর্বল ও অস্থিতিশীল সরকারের পক্ষে থাকে। যে কারণে পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায়, তৃতীয় বিশ্বে বা ছোট দেশে যখনই কোনো শক্তিশালী নেতা গড়ে ওঠেন এবং তিনি তার দেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পথে নিয়ে যান—তখনই তাকে হত্যা বা উৎখাতের এ ধরনের ষড়যন্ত্রগুলো হয়। তাই পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় কেবলই দেখা যায় তৃতীয় বিশ্বের এবং ছোট দেশগুলোর বড় নেতাদের মৃতদেহ। যাদের দ্বারা ব্যবসায়িক স্বার্থে এই মৃতদেহগুলো তৈরি করা হয়, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ইতিহাস বলবে, ইউনূস তাদের একজন।
তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন ইউনূসের ছক থেকে বের হয়ে আসা। এখানে যে বিদেশিরা সাহায্য করবে, তা নয়। কারণ, বিদেশিরা সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কেউ বোয়িং বিক্রি করছে, কেউ এয়ারবাস বিক্রি করছে আর কেউ চাল, ডাল, তেল-নুন বিক্রি করছে।
যার ফলে বাংলাদেশের ২৬-২৭ অর্থবছরের জিডিপি ৩.২ ভাগ হবে বলে এই লেখা যখন লিখছি, তখনই আইএমএফ জানিয়েছে। মাঝের এক প্রান্তিকে ২.২-তে নেমে গিয়েছিল। আইএমএফ জানাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি আবার ১০-এর ওপরে যাবে।
বাংলাদেশের এই বাস্তবতায় নৈরাজ্যই সবচেয়ে বড় ক্ষতি। বরং এখন প্রয়োজন এই নৈরাজ্য থেকে বের হয়ে আসা। কারণ, দেশটি আমাদের। মানুষ আমাদের। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যখন ৩.২ জিডিপিতে থাকে, তখন ওই দেশে কত মানুষ খাদ্যাভাবে, চিকিৎসার অভাবে থাকে, তা ইউনূস-প্রিয়, ‘দেবতাদের প্রিয়’ সুবিধাবাদীদের কাছে নয়, সরকারকে বলব অন্তত হোসেন জিল্লুর রহমান, এমনকি ইউনূসেরই অর্থ উপদেষ্টা যিনি ছিলেন, ড. সালেহউদ্দিনের কাছ থেকে জেনে নিতে।
দেশের বেশির ভাগ মানুষ ক্ষুধার্ত হলে একটি দেশ ও তার সরকার কখনোই স্থিতিশীল হতে পারে না। আর যতক্ষণ স্থিতিশীল হতে না পারবে, ততক্ষণ এই জিডিপি আরও নিম্নগতির পথেই চলতে থাকবে। তখন দেশে নৈরাজ্য আরও বাড়বে।
ইউনূস বিদেশিদের স্বার্থে ও তার নিজের স্বার্থে দেশকে এই চক্রে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। এখন যারা এই দেশকে ভালোবাসে, এ দেশে বাস করতে চায়—দেশকে লুটে বিদেশে গিয়ে মজা করার পক্ষে নয়—তাদের সকলের দায়িত্ব দেশকে স্থিতিশীল করা।
যদিও কাজটি ইউনূস কঠিন করে দিয়ে গেছে। সে শুধু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করেনি, সামাজিক যে ভদ্রতার কাঠামো হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছিল—তাও ভাঙার চেষ্টা করেছে। বহু তরুণ-তরুণীকে, কিশোর-কিশোরীকে সে নষ্ট হওয়ার একটি পরিবেশ তৈরি করেছে। এমনকি নারীর শালীনতা নষ্টকারীর ভাষা চালু করার মতো অশ্লীল ব্যক্তিকে বাঙালির শুধু নয়, পৃথিবীর সম্পদ নজরুলের সমাধির পাশে স্থান দিয়ে অশ্লীলতাকে এক শ্রেণির অশিক্ষিত তরুণদের কালচার হিসেবে সে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আর বাঙালির সেরা অর্জন মুক্তিযুদ্ধ ও তার নেতা, যার নামেই বাংলাদেশকে এখনও পৃথিবীর বহু মানুষ চেনে। সেই বঙ্গবন্ধু মুজিবকে সে অপমান করতে শিখিয়েছে অভিশাপগ্রস্থ প্রজম্মকে দিয়ে।

শুধু তাই নয়, নিজস্ব অর্থনীতি ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য যে পাকিস্তান ভেঙে এ দেশের মানুষ স্বাধীন হলো—সেই দেশে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার জন্ম-মৃত্যুদিন পালিত হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ স্রষ্টা এখানে নিষিদ্ধ।
এগুলোও ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। এর মূল উদ্দেশ্য যাতে মানুষ বিভক্ত থাকে শুধু নয়, ধীরে ধীরে একটি ছোট পাকিস্তান হয়ে যায় বাংলাদেশ। আর পাকিস্তান কিন্তু বাস্তবে একটি দেশ নয়, পাকিস্তানও একটি চক্র। যা ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের মতো। ধর্ম এবং ধর্মের নামে উগ্রতার জঙ্গিবাদ এক নয়। কিন্তু পাকিস্তানে ধর্মের নামে জঙ্গিবাদকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের মোড়ক দেওয়া হয়। যার প্রতিবাদ সে দেশেও যারা জি এম কাদেরের মতো শিক্ষিত রাজনীতিবিদ আছেন, তারা করেন। আর পাকিস্তান মানেই কিন্তু ওই ভূখণ্ড নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের একটা চক্রান্ত। এই যেমন ইরান-আমেরিকার যুদ্ধে প্রথমে পাকিস্তানকে মাথায় তোলা হয়েছে—কিন্তু এখন কীভাবে সংকটে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এখন পাকিস্তানকে ইরান এবং হুতিদের বিরুদ্ধেই ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তার অর্থনীতি আরও খারাপ হবে। সে সুযোগ বিদেশিরা নেবে। বাংলাদেশে বোয়িং, এয়ারবাস বিক্রি করছে। পাকিস্তানের কাছে বিক্রি করবে উন্নতমানের ফাইটার জেট আর ড্রোন। আর পাকিস্তানকে বাধ্য হয়ে আরও ক্ষুধার্ত মানুষ বাড়িয়ে সেই অর্থ দিয়ে ওগুলো কিনতে হবে।
যারা জিএম কাদেরের বাড়ি আক্রমণ করেছে, তারা অশিক্ষিত, গুন্ডা। তাই তাদের পক্ষে গত কয়েক মাস ধরে দেশের একজন সিনিয়র রাজনীতিক ও রাষ্ট্র এবং সরকার সম্পর্কে অভিজ্ঞ হিসেবে জিএম কাদের যে কথাগুলো বলছেন, তার অর্থ বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই।
জি এম কাদের জিন্নাহর জন্মদিন পালনকে প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে বাস্তবে জাতিকে হুঁশিয়ার করছেন, সরকারকেও বলছেন—ইউনূস দেশকে পাকিস্তানি ওই চক্রে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। এখান থেকে বের হয়ে দেশকে স্থিতিশীল করতে না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ মোটেই ভালো নয়। ঠিক একই কথা কিন্তু আইএমএফ তাদের অর্থনীতির ভাষা দিয়েই বলছে। তাই অপরাধী হিসেবে জিএম কাদেরের বাসা আক্রমণ করার আগে অপরাধী হিসেবে আইএমএফের সদর দপ্তর আক্রমণ করতে হবে।
বাংলাদেশ বাস্তবে সত্যিই এই দুর্ভাগ্যরেখায় অবস্থান করছে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
সাংবাদিক আমীর খসরু: ভালোবাসাই প্রাপ্য, রাজনৈতিক তকমা নয়
মূল্যস্ফীতির ধাক্কা: সবজিওয়ালার পুঁজি থেকে করপোরেট অর্থনীতি
বাংলাদেশ কি নাইজেরিয়ার পথে হাঁটছে
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রি বন্ধে হামলার উপকারিতা











