সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একসময় সৌদি নেতৃত্ব ইয়েমেনের যুদ্ধকে সীমান্তের ওপারের সংঘাত হিসেবে দেখলেও এখন সেই যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর পড়ছে। ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলায় রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে অন্তত ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে এখন কঠিন এক কৌশলগত সংকট। হুথিদের সামরিকভাবে পরাস্ত করার চেষ্টা অতীতে বিপুল ব্যয় ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, কিন্তু গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারেনি। অন্যদিকে, রাজনৈতিক সমঝোতার পথও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। হুথিরা এখন আগের তুলনায় বেশি সংগঠিত, যুদ্ধ-অভিজ্ঞ এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে সৌদি আরবের তুলনায় সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও হুথিরা এমনভাবে পাল্টা আঘাত হানতে পারছে, যা দেশটির নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
শক্তির অসম লড়াইয়ে সৌদি আরবের দুর্বলতা
ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা ও হুথিদের যুদ্ধকৌশলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সৌদি আরবের হাতে আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা রয়েছে। হুথিদের সেই ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্পদ নেই। তবু তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এমন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে, যেগুলোর নিরাপত্তা সৌদি সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই সংঘাতের মূল সমস্যা এখানেই। সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র রক্ষা করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। অন্যদিকে, হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে বিধ্বস্ত। ফলে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে দুই পক্ষের ঝুঁকি এক নয়। রিয়াদের একটি বড় স্থাপনায় হামলা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে; অন্যদিকে, ইয়েমেনের বহু শহর ইতিমধ্যেই যুদ্ধের কারণে ব্যাপক ক্ষতির শিকার।
হুথিরা এই অসমতাকেই কৌশলগত সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তাদের লক্ষ্য শুধু সামরিক ক্ষতি করা নয়; সৌদি নেতৃত্বকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় ক্রমেই বাড়তে থাকে।
ইয়েমেন যুদ্ধের পুরোনো ব্যর্থতা
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে সংঘাত নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়। পরের বছর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের পরাস্ত করে সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করেন।
কিন্তু দীর্ঘ বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। বরং ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে বেসামরিক মানুষও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২০১৮ সালে একটি স্কুলবাসে সৌদি বিমান হামলায় ৪৪ শিশু ও ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
এত কিছুর পরও হুথিরা উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি কিছু সময়ের জন্য সহিংসতা কমালেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আনতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর আঞ্চলিক যুদ্ধ তীব্র হলে সেই আপেক্ষিক স্থিতিশীলতাও ভেঙে পড়ে।
এই ইতিহাস সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সব সময় রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করে না। প্রতিপক্ষের সংগঠন, স্থানীয় ভিত্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে যুদ্ধ চালালে সংঘাতের ব্যয় বাড়ে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয় না।
অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নিরাপত্তার ছায়া

সৌদি আরবের তেলনির্ভর অর্থনীতিকে ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নিরবচ্ছিন্নতা এবং দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার অনুভূতির ওপর।
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা তাই শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার ঘটনা নয়; এটি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্যও ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আয়োজনের আগে এসব হামলা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি অতিথি, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সৌদি আরবে যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন।
দেশটির কর্তৃপক্ষ হামলার পরও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। একাধিক হামলার পরও বিমানবন্দরটি খোলা রাখা হয়েছিল। তবে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনার পর এর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। একই সময়ে রিয়াদে জ্বালানিমন্ত্রীদের বৈঠকও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। এসব উদ্যোগ সরকারের স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে স্বাভাবিকতা বজায় রাখার চেষ্টা আর বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য এমন পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে ব্যবসা ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ নিজেদের নিরাপদ বোধ করবেন। বারবার বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা সেই আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কি যথেষ্ট?
হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক সহায়তা পাচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা এবং আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের মতো সুবিধাও রয়েছে। হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু গত বছর হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দ্রুত বিজয়ের দাবি করলেও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এনেছিল।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, উন্নত সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও হুথিদের মতো গোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করা কঠিন। সৌদি আরবের জন্য তাই ওয়াশিংটনের আরও বড় সামরিক ভূমিকা কাম্য হলেও সেটিই সংকটের নিশ্চিত সমাধান নয়।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর সংঘাতের গতিপথও সৌদি আরবের বিকল্প নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান এবং তেহরানের মাধ্যমে হুথিদের হামলা বন্ধে সমঝোতা সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। তবে ওয়াশিংটন সৌদি নেতৃত্বের উদ্বেগকে কতটা গুরুত্ব দেবে, তা নিশ্চিত নয়। ফলে রিয়াদ শুধু মার্কিন সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে পারছে না; আবার এককভাবেও সমস্যার সমাধান করা কঠিন হয়ে উঠছে।
সামরিক চাপের আগে, নাকি আলোচনার আগে?
সৌদি সরকারের সামনে এখন একটি জটিল কৌশলগত হিসাব। হুথিরা যত দিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রাখবে, তত দিন রিয়াদ আলোচনায় বসতে অনাগ্রহী থাকতে পারে। অন্যদিকে, হুথিদের সামরিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা দীর্ঘায়িত হলে নতুন প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়বে।
সম্ভবত সৌদি নেতৃত্ব আলোচনার আগে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা কমাতে চাইবে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সামরিক চাপ বাড়ালেই প্রতিপক্ষ আত্মসমর্পণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং হুথিরা নিজেদের টিকে থাকার লড়াই হিসেবে সংঘাতকে উপস্থাপন করে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

এখানে কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। কোনো সমঝোতা টেকসই হতে হলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা-উদ্বেগের পাশাপাশি ইয়েমেনের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও হুথিদের সামরিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; সেই প্রতিশ্রুতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
সৌদি আরবের এই সংকটের সহজ সমাধান নেই। সামরিক শক্তি দিয়ে হুথিদের দমন করা কঠিন, আর রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এর মধ্যে প্রতিটি নতুন হামলা শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করছে না, বরং দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
রিয়াদের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু হুথিদের বিরুদ্ধে আরেক দফা আক্রমণ চালানো নয়; বরং এমন কৌশল নির্ধারণ করা, যা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ব্যয় কমাতে পারে। সামরিক প্রতিরোধ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যথায়, সৌদি আরব অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি যতই বাড়াক, ইয়েমেনের সংঘাত তার নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করতেই থাকবে।












