গ্রামীণ কল্যাণের কাছে বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকার আয়কর দ্রুত আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটির পাঁচ করবর্ষের আয়কর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে আদালত আগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেছেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে মামলাটিকে ‘নিষ্পত্তি হওয়া একটি বিষয় ঝুলিয়ে রেখে কর ফাঁকির একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা দুটি রিট আবেদন খারিজ করেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে সোমবার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। আদালতের নির্দেশের ফলে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য নির্ধারিত ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের বিষয়টি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
তবে এই বিরোধের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। ২০১৭ সালে কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট, কর আদায়ে স্থগিতাদেশ, ২০২৪ সালে একটি রায় প্রত্যাহার করে নতুন বেঞ্চে পাঠানো এবং পরে নতুন বেঞ্চের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে মামলাটি একাধিক ধাপ অতিক্রম করেছে।
২০১৭ সালে রিট, কর আদায়ে স্থগিতাদেশ
এনবিআরের কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট আবেদন করে গ্রামীণ কল্যাণ। ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য নির্ধারিত করের বিষয়ে এসব আবেদন করা হয়। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারির পাশাপাশি কর দাবির ওপর স্থগিতাদেশ দেন। ফলে কর আদায়ের বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে বিচারাধীন থাকে।
পরে কর পুনর্মূল্যায়নের পর সংশ্লিষ্ট কর কমিশনার পাঁচ করবর্ষের জন্য ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধের দাবি নির্ধারণ করেন। গ্রামীণ কল্যাণ ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনি লড়াই চালিয়ে যায়।
ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলার মোড়
মামলার সময়রেখায় ২০২৪ সালের আগস্ট গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছরের ৪ আগস্ট বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের রিট আবেদন খারিজ করেন। এতে এনবিআরের কর দাবি আদায়ের পথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এর পরদিন, ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এরপর ২৯ আগস্ট ২০২৪ হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ ৪ আগস্টের রায় প্রত্যাহার করে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠান। ওই বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীর। পরে প্রধান বিচারপতি মামলাটি শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চে পাঠান।
নতুন বেঞ্চের রায়, ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের নির্দেশ
২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের রিট-সংক্রান্ত আবেদন খারিজ করে এনবিআরের কর দাবির পক্ষে রায় দেন। এতে পাঁচ করবর্ষের জন্য নির্ধারিত ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে আদালত বলেন, আবেদনকারীদের এসব রিট চালিয়ে যাওয়ার আইনগত ভিত্তি ছিল না। একই সঙ্গে আগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে দ্রুত কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে মামলাটিকে ‘নিষ্পত্তি হওয়া একটি বিষয় ঝুলিয়ে রেখে কর ফাঁকির একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি আদালতের পর্যবেক্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা জরুরি; প্রতিবেদকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তি ঘিরে কর বিরোধ
রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুস সামাদ আজাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল। ওই চুক্তির আওতায় গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণ কল্যাণকে আর্থিক সহায়তা দিত। বিনিময়ে গ্রামীণ কল্যাণের শেয়ারের লভ্যাংশ থেকে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ গ্রামীণ কল্যাণকে দেওয়ার কথা ছিল।
পরে আয়কর কর্তৃপক্ষ গ্রামীণ কল্যাণের কর নথি পুনরায় পর্যালোচনা করে। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ টেলিকম থেকে পাওয়া আয়ের ওপর উৎসে কর কাটা হয়নি বলে পর্যালোচনায় উঠে আসে। এরপর কর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ৬৬৬ কোটি টাকার দাবি নির্ধারণ করা হয়। গ্রামীণ কল্যাণ সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যায়।
গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন ও ফিদা এম কামাল আদালতে প্রতিনিধিত্ব করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর আপিল বিভাগে আপিল করার কথা জানিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ফলে হাইকোর্টের রায়ের পরও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর কর আদায়ের নতুন পর্যায়
গ্রামীণ কল্যাণের কর বিরোধের ইতিহাসে তিনটি পর্যায় স্পষ্ট: ২০১৭ সালে রিটের পর কর দাবিতে স্থগিতাদেশ, ২০২৪ সালের আগস্টে রায় দিয়ে পরে তা প্রত্যাহার এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন বেঞ্চের সিদ্ধান্ত। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত কর দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়ে দ্রুত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
এখন এনবিআরের সামনে রয়েছে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রশ্ন। অন্যদিকে গ্রামীণ কল্যাণ আপিল করলে মামলার পরবর্তী অগ্রগতি উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। দীর্ঘদিনের এই বিরোধে কর প্রশাসন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায়ের বিষয়গুলো আবারও সামনে এসেছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের পাঁচ করবর্ষের ৬৬৬ কোটি টাকার কর বিরোধে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালের স্থগিতাদেশ, ২০২৪ সালে রায় প্রত্যাহার এবং ২০২৬ সালের নতুন রায়ের ধারাবাহিকতায় এখন দ্রুত কর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।












