বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। সংস্থাটির সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক) এ চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে এপ্রিলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ। জুলাইয়ে তা কমিয়ে ৩.৫ শতাংশ করা হয়। নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা আরও ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে সংস্থাটি। প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকার এই পূর্বাভাস দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রায় চার দশকের মধ্যে দুর্বল প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে এলে তা প্রায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাসে আগের প্রত্যাশার তুলনায় অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে।

চলতি অর্থবছরের এই পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অতীতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মন্থর হয়েছে। আইএমএফের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৭ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আনুমানিক ৩.৬ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার পূর্বাভাস ১০.৯ শতাংশ
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির হিসাবও বাড়িয়েছে আইএমএফ। এপ্রিলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিল সংস্থাটি। নতুন পূর্বাভাসে তা বাড়িয়ে ১০.৯ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের অনুমানের তুলনায় মূল্যস্ফীতির চাপ অনেক বেশি থাকার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটি।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ায়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের গতি দুর্বল হয়েছে, রপ্তানির সম্প্রসারণে মন্থরতা এসেছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এসব বিষয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাসও হতাশাজনক
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসেও স্বস্তির চিত্র নেই। তবে তাদের হিসাব আইএমএফের তুলনায় কিছুটা বেশি।
| সংস্থা | ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস |
|---|---|
| আইএমএফ | ৩.২ শতাংশ |
| বিশ্বব্যাংক | ৩.৪ শতাংশ |
| এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক | ৪.০ শতাংশ |
বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং সরকারের রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাপে রাখছে। ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা এবং সরকারি বিনিয়োগের সীমিত সক্ষমতাও প্রবৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

অর্থনীতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস এমন সময়ে এসেছে, যখন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কর্মসূচি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সেখানে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। দুর্বল প্রবৃদ্ধি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবারের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা আরও চাপে পড়বে।
আইএমএফের পূর্বাভাস চূড়ান্ত ফল নয়; এটি বর্তমান পরিস্থিতি ও অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি একটি হিসাব। তবে সংস্থাটির ধারাবাহিক পূর্বাভাস সংশোধন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এখন নজর থাকবে প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী প্রবণতা কতটা বদলানো যায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কী অগ্রগতি হয়, তার ওপর।












