বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইতালির মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে এখন সরকারি ঋণের জন্য আগের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব দেশের ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। ফলে সরকারের আয়ের বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনিশ্চয়তা সরকারি বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের ধনী দেশগুলো কি নতুন কোনো ঋণসংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? বিনিয়োগকারীরা যদি সরকারি বন্ড কেনা কমিয়ে দেন বা আগের বন্ড বিক্রি করতে শুরু করেন, তাহলে পরিস্থিতি কতটা খারাপ হতে পারে? বিশেষ করে ইউরোপের কয়েকটি দেশের আর্থিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফ্রান্সের মতো বড় অর্থনীতিতে ঋণসংকট দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো ইউরোপের আর্থিক ব্যবস্থাও চাপে পড়তে পারে।
একসময় ব্যাংকারদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত ছিল—কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হতে পারে, কিন্তু একটি দেশ কখনো দেউলিয়া হয় না। ধারণাটি বহুদিন ধরে অনেককে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার একের পর এক দেশ যখন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ধারণার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে সরকারি ঋণসংকটের আশঙ্কাকে আর হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
এখন একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্বের ধনী দেশগুলোকে ঘিরে। এসব দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বড়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রভাবও ব্যাপক। তারপরও ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কিংবা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হলে তারাও বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।
পাঁচ বছরে বদলে গেছে ঋণের হিসাব
মাত্র পাঁচ বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল অনেকটা ভিন্ন। তখন সুদের হার এত কম ছিল যে সরকারগুলোর জন্য ঋণ নেওয়া তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে পড়েছিল। অনেক দেশের নীতিনির্ধারকের কাছে মনে হয়েছিল, কম সুদে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য সরকারি ব্যয় চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে না।
কিন্তু সেই সময়ের পরিস্থিতি আর নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীরা সরকারি বন্ড বিক্রি করতে শুরু করায় বিশ্বের বড় উন্নত অর্থনীতিগুলোকে ঋণ নিতে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুদ দিতে হচ্ছে।
সরকারি বন্ড হলো এমন এক ধরনের ঋণপত্র, যার মাধ্যমে সরকার বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ ধার নেয়। বিনিয়োগকারীরা সরকারকে অর্থ দেন এবং নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী সুদ পান। নির্ধারিত সময় শেষে সরকার মূল অর্থ ফেরত দেয়। কিন্তু বন্ডের বাজারমূল্য কমে গেলে সাধারণত নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বেশি সুদ দিতে হয়। ফলে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে কিংবা পুরোনো ঋণ নবায়ন করতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সমস্যা হলো, বড় উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সরকারি ঋণ ইতিমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। শতাব্দীর শুরুতে এসব দেশের সম্মিলিত সরকারি ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত যা ছিল, বর্তমানে তা প্রায় দ্বিগুণ। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি হলো একটি দেশের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। ঋণ-জিডিপি অনুপাত দিয়ে বোঝা যায়, একটি দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় তার সরকারি ঋণের পরিমাণ কতটা বড়।
ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেশি হলে সরকারকে ঋণ পরিশোধ ও সুদ মেটানোর জন্য বেশি অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়। সুদের হারও যদি বাড়তে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ, সরকারকে শুধু নতুন প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে হয় না; পুরোনো ঋণের সুদ এবং মেয়াদ শেষ হওয়া ঋণও সামলাতে হয়।
সরকারের আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে
বন্ডবাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ার আগেই উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সরকার চলতি বছরে তাদের কর রাজস্বের প্রায় ৮ শতাংশ ঋণের নিট সুদ পরিশোধে ব্যয় করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সুদের হার আরও বাড়লে এই ব্যয়ও বাড়তে পারে।
সরকারের আয়ের একটি বড় অংশ যখন ঋণের সুদ দিতে চলে যায়, তখন অন্য খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমে আসে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের জন্য সরকারকে তখন আরও সতর্ক হতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সমস্যা। অনেক উন্নত দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত তুলনামূলকভাবে কমছে। ফলে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবসরকালীন সুবিধার জন্য সরকারি ব্যয় বাড়ছে। একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে প্রতিরক্ষা খাতেও বেশি অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকারগুলোর সামনে তাই একাধিক চ্যালেঞ্জ। একদিকে জনগণের জন্য বিভিন্ন সেবা চালু রাখতে হবে, অন্যদিকে ঋণের সুদ দিতে হবে এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ও সামলাতে হবে। অথচ অনেক সরকার এখনো ঋণ নেওয়া ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযম দেখাচ্ছে না।
এভাবে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীরা সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করতে পারেন। তখন তাঁরা নতুন সরকারি বন্ড কেনা বন্ধ করতে পারেন, এমনকি আগের বন্ডও বিক্রি করে দিতে পারেন। এর ফলে বন্ডের দাম আরও কমতে পারে এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে।
বন্ডের সুদ বাড়ার সব কারণ খারাপ নয়
সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়ার পেছনে কিছু ইতিবাচক কারণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বর্তমানে শক্তিশালী বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে বেকারত্বের ভাতা চেয়ে নতুন আবেদনকারীর সংখ্যা কম রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বার্ষিক হিসাবে ৩ শতাংশের বেশি হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিও শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে।
অর্থনীতি ভালো চললে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কারখানা, প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। এতে অর্থের চাহিদা বাড়ে। একই সময়ে সরকারও ঋণ নিতে চায়। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে অর্থ সংগ্রহের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতা সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাত এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করছে। এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বড় বড় তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ করতে হচ্ছে। এসব কেন্দ্র তৈরি ও পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এআই প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে, তখন তারাও সরকারি ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে একই অর্থের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে সুদের হার বাড়ার একটি কারণ হলো বিনিয়োগের চাহিদা বেড়ে যাওয়া। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়া এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ার ফলে ঋণের সুদ বৃদ্ধি সব সময় আর্থিক দুর্বলতার লক্ষণ নয়।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন সুদের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ঋণের পরিমাণও অনেক বেশি থাকে। তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও সরকারকে বেশি সুদ দিতে হয়। ফলে অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সুফল সরকারি ঋণের চাপ কমাতে সব সময় যথেষ্ট হয় না।
মূল্যস্ফীতি ও রাজনীতি বাড়াচ্ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
বন্ডের সুদের হার বাড়ার পেছনে আরও কিছু উদ্বেগজনক কারণ রয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা লেগেছে। এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যায়। এসব অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামে প্রভাব ফেলতে পারে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে। এতে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—দুই পক্ষের ঋণ নেওয়ার খরচই বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করছে। বিভিন্ন দেশে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির প্রভাবে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, কিছু সরকার হয়তো কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সহজ পথ হিসেবে মূল্যস্ফীতিকে বাড়তে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে দ্রুত ঋণের বোঝা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি সুদের হার না কমানোর জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সমালোচনা করেছেন।
মূল্যস্ফীতি বাড়লে সরকারের পুরোনো ঋণের প্রকৃত মূল্য কমে যেতে পারে। কারণ, সময়ের সঙ্গে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মূল্যস্ফীতি বাড়ানো ঋণ সমস্যার নিরাপদ সমাধান। মূল্যস্ফীতি বেশি হলে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে অর্থের মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আরও বেশি সুদ দাবি করতে পারেন। এতে নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ আবার বেড়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সেও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ দেখা যাচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলেছেন। এ ধরনের বক্তব্যকে ঘিরে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হিসাব করেন। তাঁরা শুধু বর্তমান সুদের হার বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখেন না; ভবিষ্যতে সরকার ঋণ কীভাবে পরিচালনা করবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনা করেন। এসব বিষয়ে আস্থা কমে গেলে সরকারকে ঋণ নিতে আরও বেশি সুদ দিতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র: অর্থনীতি শক্তিশালী, কিন্তু ঋণের চাপও বড়
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক বিনিয়োগের কারণে নতুন গতি পাচ্ছে। এআই প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ, তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেশটির অর্থনীতিকে সহায়তা করছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি সরকারি ঋণের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করতে পারছে না।
কারণ, অর্থনীতি শক্তিশালী হলে বেসরকারি খাতে অর্থের চাহিদা বাড়ে। এআই প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যখন বিনিয়োগ বাড়ায়, তখন পুঁজিবাজারে অর্থের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়। এর ফলে সরকারি ঋণের সুদের হারও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের বার্ষিক বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, সরকার এক বছরে যত অর্থ ব্যয় করছে, তার তুলনায় রাজস্ব ও অন্যান্য আয় কম হওয়ায় ঘাটতি পূরণ করতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই মাত্রার ঘাটতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন ঋণের সুদের হার বাড়ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেনে ডলারের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে মার্কিন সম্পদের চাহিদা অনেক সময় শক্তিশালী থাকে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বন্ডের সুদের হার বাড়ার পাশাপাশি ডলারের মূল্যও বেড়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, ঋণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের অবস্থান এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে।
তবে এই সুবিধার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের সমস্যা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বাজেট ঘাটতি চলতে থাকলে এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে থাকলে একসময় সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। সরকারি ব্যয় কমানো, রাজস্ব বাড়ানো অথবা ঋণ বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক ঋণসংকটের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম হলেও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক হিসাব নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
জাপান: সুদের হার বাড়লেও ঋণের পরিস্থিতি এখনো সামলানো যাচ্ছে
সরকারি ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা জাপান এখনো তার আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে। দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটেছে।
সুদের হার বাড়ার পরও জাপানের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কয়েকটি দেশের মতো নয়। দেশটিতে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে হিসাব করলে প্রকৃত সুদের হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে সরকারের বাজেট ঘাটতিও সীমিত রয়েছে।
এই দুটি বিষয় জাপানকে কিছুটা সুবিধা দিচ্ছে। অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত কমতে থাকলে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। তবে এ প্রবণতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
এর মধ্যে জাপান সরকার নতুন করে বড় অঙ্কের ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা না করে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ানো হলে ঋণের চাপ আবার বাড়তে পারে। তাই সরকারি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানের আরেকটি বিষয় পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে। দেশটির বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ধরে রেখেছে। বিদেশি বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদে তাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে।
যদি জাপানের বিনিয়োগকারীরা এসব বিদেশি সম্পদ বিক্রি করে অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে শুরু করেন, তাহলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিদেশি বন্ড বিক্রি বাড়লে সেসব বন্ডের দাম কমতে পারে এবং সুদের হার বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব শুধু জাপানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের অর্থায়নের খরচেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে আপাতত জাপানের সরকারি বন্ড থেকে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে সরে যাচ্ছেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
ইউরোপে কেন ঋণসংকটের ঝুঁকি বেশি
উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে ইউরোপে ঋণসংকটের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় পুঁজির চাহিদা বেড়েছে। ফলে ইউরোপের দেশগুলোকেও ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপের অর্থনীতি এআই খাতের সম্প্রসারণ থেকে একই মাত্রায় প্রবৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছে না। তৃতীয়ত, ইউরোপের অনেক দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তাদের অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ পড়ে।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলে ইউরোপের অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। শীতকাল বেশি ঠান্ডা হলে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে। একই সময়ে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে ইউরোপকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে।
জ্বালানির উচ্চমূল্য শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হতে পারে। আবার মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে সুদের হার কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
ইউরোপের সব দেশের পরিস্থিতি অবশ্য এক নয়। জার্মানি, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কয়েকটি দেশ এবং সুইজারল্যান্ডের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত। এসব দেশ বাজেট ও ঋণের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে।
কিন্তু যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইতালির সামনে চ্যালেঞ্জ বেশি। এই দেশগুলোকে একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণের সুদ ও সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হলে তাদের জন্য ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাজ্য: আগের সংকট থেকে শিক্ষা নিলেও ঝুঁকি কাটেনি
যুক্তরাজ্য ২০২২ সালে সরকারি বন্ডবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়েছিল। সে সময় বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়ায় সরকারি ঋণের খরচ বেড়ে যায় এবং দেশটির আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সেই অভিজ্ঞতার পর সরকার আর্থিক নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত এখনো বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সরকারি ব্যয় কমানোর কঠিন সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
সম্প্রতি প্রতিশ্রুতি দেওয়া পেনশন সংস্কার নিয়ে বিতর্ক এই সমস্যার একটি উদাহরণ। পেনশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে, কারণ এর সঙ্গে বহু মানুষের অবসরকালীন আয় ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা জড়িত। কিন্তু পেনশন ও অন্যান্য সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
সরকারকে তাই একদিকে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন হয়ে উঠলে আর্থিক বাজারে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ইতালি: ঋণ স্থিতিশীল, কিন্তু পরিমাণ অনেক বেশি
ইতালির সরকারি ঋণ পরিস্থিতি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। দেশটির নিট সরকারি ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১২৯ শতাংশ, যা অত্যন্ত বেশি।
ঋণ স্থিতিশীল থাকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঋণের মোট পরিমাণ অনেক বেশি হলে সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাবও বড় হতে পারে। সরকারকে পুরোনো ঋণ নতুন করে নিতে হলে বেশি সুদ দিতে হয়। ফলে সুদের হার দীর্ঘদিন উঁচু থাকলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
ইতালির জন্য বড় ঝুঁকি হলো, আর্থিক বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে বিনিয়োগকারীরা দেশটির ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তখন তাঁরা ইতালির বন্ড বিক্রি করতে পারেন অথবা নতুন বন্ড কেনার জন্য বেশি সুদ দাবি করতে পারেন।
এতে ঋণ নেওয়ার খরচ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে বাজেট ঘাটতি কমানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দিতে হতে পারে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল ঋণ পরিস্থিতিও বাজারের আস্থা নষ্ট হলে দ্রুত সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক কেন
ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বিশেষভাবে বেশি। দেশটির বাজেট ঘাটতি চলতি বছরে জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি বলতে বোঝায়, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সরকারের ব্যয় তার আয়ের চেয়ে বেশি হওয়া। এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে ঋণ নিতে হয়। ঘাটতি দীর্ঘদিন বেশি থাকলে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। আবার ঋণের সুদের হার বাড়লে আগের ঋণ সামলানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের বর্তমান সুদের হার বিবেচনায় ফ্রান্সের সামনে বড় ধরনের আর্থিক সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দ্য ইকোনমিস্টের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিকে যদি বর্তমান সুদের হারে সব ঋণ নতুন করে নিতে হয়, তাহলে ঋণ-জিডিপি অনুপাত স্থিতিশীল রাখতে জিডিপির ৪ শতাংশেরও বেশি সমপরিমাণ ব্যয় কমানো বা অন্যভাবে আর্থিক সমন্বয় করতে হবে।
এটি একটি বড় অঙ্কের সমন্বয়। সরকারকে এত বড় পরিমাণ ব্যয় কমাতে হলে বিভিন্ন খাতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু ফ্রান্সে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইতিমধ্যে জটিল। দেশটিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে এবং সংসদে বাজেট নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
সরকার যে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তার পরিমাণ প্রয়োজনীয় আর্থিক সমন্বয়ের মাত্র এক-দশমাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ঋণ স্থিতিশীল রাখতে যে মাত্রার পরিবর্তন দরকার বলে হিসাব করা হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সের সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি বন্ডের সুদের হার। সম্প্রতি দেশটিকে ১০ বছর মেয়াদি ঋণ নিতে জার্মানির তুলনায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি সুদ দিতে হয়েছে। ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময়ের পর দুই দেশের সুদের হারের ব্যবধান এত বেশি আর দেখা যায়নি।
জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সকে বেশি সুদ দিতে হওয়ার অর্থ হলো, বিনিয়োগকারীরা ফ্রান্সের ঋণ নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকি দেখছেন। বেশি সুদ দিতে হলে সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়বে। ফলে বাজেট ঘাটতি কমানো আরও কঠিন হতে পারে।
২০২৭ সালের নির্বাচন ঘিরে ফ্রান্সে অর্থনৈতিক বিতর্ক
ফ্রান্সের আর্থিক সংকটের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কও গভীর। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির অর্থনীতি, সরকারি ব্যয় এবং পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।
জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মেরিন লে পেন নির্বাচনের আগে সরকারি ব্যয় ও ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ৬ অক্টোবর তিনি ঘোষণা করেন, ২০৩২ সালের মধ্যে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশ সমপরিমাণ কমাতে চান। একই সঙ্গে ঋণ-জিডিপি অনুপাত অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও তুলে ধরেন।
এই ঘোষণার পর ফ্রান্সের সরকারি বন্ডের সুদের হার সামান্য কমেছিল। তবে শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসে না। তাঁরা দেখতে চান, প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত কি না।
লে পেনের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্নের একটি বড় কারণ হলো অবসরের বয়স কমানোর তাঁর প্রতিশ্রুতি। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে পেনশন দেওয়ার প্রয়োজন হয়। ফলে অবসরের বয়স কমালে সরকারি পেনশন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
ফ্রান্সে পেনশন সরকারি ব্যয়ের অন্যতম বড় খাত। তাই ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অবসরের বয়স কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সরকারের আর্থিক হিসাবের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। একদিকে ব্যয় কমানোর লক্ষ্য, অন্যদিকে ব্যয় বাড়াতে পারে এমন নীতি—এই দুইয়ের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ফ্রান্সের বন্ডবাজারে বড় সংকট হলে কী ঘটতে পারে
ফ্রান্সের সরকারি বন্ডবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়লে দেশটি বড় ঋণসংকটের মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বন্ড বিক্রি করতে শুরু করতে পারেন। নতুন বন্ড কেনার ক্ষেত্রেও তাঁরা আরও বেশি সুদ দাবি করতে পারেন।
বন্ডের দাম কমে গেলে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হয়। ফলে সরকারের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ে। ঋণের সুদ বেশি হওয়ায় বাজেট ঘাটতি কমানো কঠিন হয়, আর ঘাটতি বেশি থাকলে নতুন ঋণের প্রয়োজনও বাড়ে। এভাবে সমস্যা এক পর্যায়ে নিজেকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক সময় সরকারি বন্ড থেকে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপকভাবে সরে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। ফ্রান্সের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটবে—এটি নিশ্চিত নয়। তবে বর্তমান ঋণের পরিমাণ, বাজেট ঘাটতি এবং বন্ডের সুদের ব্যবধানের কারণে ঝুঁকিটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংকট দেখা দিলে ফ্রান্স সরকার ব্যয় কমানো ও বাজেট সমন্বয়ের পরিবর্তে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আর্থিক সহায়তা চাইতে পারে। তখন ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কী শর্তে এবং কতটা সহায়তা দেওয়া সম্ভব।
নীতিগতভাবে কোনো দেশের সরকারি ঋণ কেনার আগে দেশটির বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই শর্ত কতটা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত এক দশকের তুলনায় আর্থিক সহায়তার ওপর বিধিনিষেধ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের মতো বড় অর্থনীতিকে সহায়তা করা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত হতে পারে। কারণ, ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দেশটির আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিলে তা পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতার কারণে ফ্রান্সের কোনো জনতুষ্টিবাদী সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দর-কষাকষিতে সুবিধা পেতে পারে বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ফ্রান্সের ঋণসংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হবে।
তবে এ ধরনের সহায়তা দেওয়া হলে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়—যেসব সরকার দীর্ঘদিন ধরে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে, তারা কি ভবিষ্যতেও একইভাবে ঋণ নিতে উৎসাহিত হবে? আর্থিক সহায়তার শর্ত দুর্বল হলে সরকারের মধ্যে ঋণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সরকারকে উদ্ধার করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই ঝুঁকিতে পড়বে কি
সরকারি ঋণসংকটের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা জরুরি। কোনো সংকট যাতে পুরো অর্থব্যবস্থাকে অচল করে না দেয়, তা নিশ্চিত করাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজের অংশ।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সরকারের সব ধরনের ঋণের দায় নিতে হবে। বিশেষ করে কোনো সরকার যদি দীর্ঘদিন ধরে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না চায়, তাহলে তার ঋণের বোঝা নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সামলানো দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য সহজে অর্থ পাওয়ার উৎসে পরিণত হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তার স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা তখন মনে করতে পারেন, সরকার নিজের ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে এবং প্রয়োজনে মূল্যস্ফীতি বাড়তে দেওয়া হবে।
এমন আশঙ্কা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড কেনার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন। তাঁরা ভবিষ্যতে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি সামলাতে বেশি সুদ দাবি করতে পারেন। ফলে বন্ডের দাম কমে এবং সুদের হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ হওয়া উচিত আর্থিক বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। দীর্ঘদিনের লাগামহীন সরকারি ঋণকে কোনো শর্ত ছাড়া বহন করা নয়।
ঋণসংকটের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে
সরকারি ঋণ ও বন্ডবাজারের সমস্যা কেবল ব্যাংক, বিনিয়োগকারী বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে।
সরকারকে যদি ঋণের সুদ দিতে ক্রমাগত বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমে যেতে পারে। আবার বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকার কর বাড়াতে বা বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের ওপর।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বাড়ে। খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। সরকার ঋণের বোঝা কমাতে মূল্যস্ফীতির ওপর নির্ভর করলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও আয়ের প্রকৃত মূল্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আর্থিক বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে। ঋণের খরচ বেশি হলে নতুন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি কেনা বা কর্মী নিয়োগ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়তে পারে।
তাই সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণ শুধু হিসাবের খাতায় ঘাটতি কমানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান, সরকারি সেবার মান এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সরাসরি জড়িত।
ঋণসংকট এড়াতে কী করা দরকার
ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সরকারি ঋণ ও ব্যয়ের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি করা। রাজনীতিকদের জনগণকে বোঝাতে হবে, সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা কেন জরুরি এবং এর জন্য কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কোথায় ব্যয় কমানো সম্ভব, কোন খাতে অর্থ বরাদ্দ বেশি প্রয়োজন এবং কোন ব্যয় ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে কর রাজস্বের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অপচয় কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু ব্যয় কমিয়ে ঋণসংকট সমাধান করা যাবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা উন্নত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী করাও প্রয়োজন। অর্থনীতি বড় হলে এবং সরকারের আয় বাড়লে ঋণের বোঝা সামলানোর সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা জরুরি। বিনিয়োগকারীরা যদি নিশ্চিত হন যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখবে, তাহলে ঋণবাজারে আস্থা ধরে রাখা সহজ হতে পারে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যা তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয় নাও হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয়। পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং অন্যান্য সরকারি খাতের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাস্তবসম্মত হিসাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—দুটিই দরকার।
ধনী দেশগুলোর জন্য এখনই সতর্ক হওয়ার সময়
বিশ্বের বড় উন্নত অর্থনীতিগুলোর সামনে এখন একাধিক বাস্তবতা একসঙ্গে উপস্থিত। সরকারি ঋণ বেড়েছে, সুদের হার বাড়ছে, জ্বালানির দাম অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে এবং অনেক দেশে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে এআই খাতে বিনিয়োগের কারণে পুঁজির চাহিদা বাড়ছে, যা ঋণের সুদের হারকে আরও প্রভাবিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো তার রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা ও শক্তিশালী অর্থনীতির সুবিধা পাচ্ছে। জাপানের মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতির পরিস্থিতিও আপাতত ঋণের চাপ সামলাতে সহায়তা করছে। কিন্তু এসব সুবিধা ভবিষ্যতেও একইভাবে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইউরোপের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যকে আগের বন্ডবাজারের অস্থিরতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হচ্ছে। ইতালির ঋণ-জিডিপি অনুপাত অনেক বেশি। আর ফ্রান্সকে বড় বাজেট ঘাটতি, উচ্চ ঋণব্যয় এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
ফ্রান্সের বন্ডবাজারে বড় সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সরকারকে সহায়তা করতে বাধ্য হয়, তাহলে আর্থিক শৃঙ্খলা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে এসব দেশের ঋণসংকটে পড়া অবধারিত নয়। সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত বাজেট, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে পারলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কিন্তু তার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সমস্যার বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে সরকারকে নিজেদের ঋণ ও ব্যয়ের হিসাব ঠিক করতে হবে। কারণ, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ঋণ কোনো সহজ উপায়ে মুছে ফেলা যায় না। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, আগামী দিনে সরকারি ঋণ অর্থনীতির স্বাভাবিক অংশ হয়ে থাকবে, নাকি তা বড় আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে উঠবে।












