ভারতে বাঘ, হাতি, চিতাবাঘ ও গণ্ডারের মতো বন্য প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে। একসময় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এসব প্রাণী সংরক্ষণে দেশটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বন্য প্রাণীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাতও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাঘের আক্রমণে পশ্চিম ভারতে, চিতাবাঘের হামলায় উত্তর ভারতে এবং হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে পূর্ব ভারতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা সেই সমস্যারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব দুর্ঘটনা একদিকে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে, অন্যদিকে ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সাফল্যও সামনে আনছে।
ভারতের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, জনসচেতনতা, শক্তিশালী আইন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকলে দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সমস্যারও সমাধান সম্ভব। বন্য প্রাণী রক্ষায় দেশটির অর্জন এখন বায়ুদূষণ, নদী-জলাশয়ের দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো অন্যান্য পরিবেশগত সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে।
বাঘ সংরক্ষণে বড় অগ্রগতি
১৯৭০-এর দশকে ভারতের জাতীয় প্রাণী বাঘের অস্তিত্বই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছিল। শিকার, আবাসস্থল সংকোচন ও অন্যান্য কারণে বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকার শুরু করে ‘প্রজেক্ট টাইগার’। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণ, শিকার বন্ধ করা এবং বাঘের সংখ্যা পুনরুদ্ধার করা।
গত দুই দশকে ভারতে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০-তে পৌঁছেছে। এশিয়ার মালয়েশিয়ার মতো কিছু দেশে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিপরীতে ভারতের এই অগ্রগতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাঘ সংরক্ষণে অর্জিত সাফল্যের কারণে কম্বোডিয়ায় বাঘ পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও ভারতকে সহায়তার জন্য বিবেচনা করা হয়েছে। একসময় যে প্রাণীটি বিলুপ্তির পথে ছিল, সেটিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সিংহ, গণ্ডার ও চিতা রক্ষায় নতুন উদ্যোগ
বাঘের পাশাপাশি অন্যান্য বন্য প্রাণী সংরক্ষণেও ভারত বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট রাজ্যে এশীয় সিংহের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার জন্য নতুন সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, পূর্বাঞ্চলীয় আসামে গণ্ডার সংরক্ষণে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের বছরে রাজ্যটিতে গণ্ডার শিকারসংক্রান্ত কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি। তবে এ ধরনের দাবি মূল্যায়নে সরকারি তথ্যের পাশাপাশি স্বাধীন পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে চিতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও চলছে। ১৯৫২ সালে দেশটির ভূখণ্ডে চিতা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর ২০২২ সাল থেকে আফ্রিকা থেকে চিতা আনার কর্মসূচি শুরু হয়। এর লক্ষ্য ভারতে চিতার নতুন জনসংখ্যা গড়ে তোলা এবং প্রজাতিটির ঐতিহাসিক উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে প্রাণীদের টিকে থাকা, বংশবিস্তার এবং উপযুক্ত আবাসস্থল নিশ্চিত করার ওপর।
শুধু জনপ্রিয় বা দেখতে আকর্ষণীয় প্রাণী নয়, তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় প্রাণীও ভারতের সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এসেছে। এর উদাহরণ শকুন। মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই পাখির সংখ্যা বাড়ানোর জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সংরক্ষণের পরিধি এখন নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের ভূমিকা
ভারতে বন্য প্রাণী সংরক্ষণের পেছনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধেরও ভূমিকা রয়েছে। হিন্দু ধর্মে অনেক প্রাণীকে পবিত্র বা শ্রদ্ধার যোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। বৃহত্তর ভারতীয় সমাজেও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা ও তাদের ক্ষতি না করার ধারণা প্রচলিত। পাশাপাশি দেশটিতে প্রাণী সুরক্ষায় কঠোর আইন রয়েছে।
এসব কারণে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে জনসমর্থন পেয়েছে। তবে শুধু সামাজিক মূল্যবোধ বা প্রাণীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা দিয়ে সংরক্ষণের সাফল্য ব্যাখ্যা করা যায় না। আইন প্রয়োগ, আবাসস্থল রক্ষা, নিয়মিত নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অশোক থেকে ইন্দিরা গান্ধী, মোদি—দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য
ভারতে প্রাণী ও প্রকৃতি রক্ষার ধারণার ইতিহাসও দীর্ঘ। দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে সম্রাট অশোক শিকার নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন নির্দেশ জারি করেছিলেন। আধুনিক যুগেও দেশটির একাধিক নেতা বন্য প্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্ব দিয়েছেন।
১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগে ‘প্রজেক্ট টাইগার’ শুরু হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে; তিনি বন্য প্রাণীর ছবি তোলার জন্য পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থন সংরক্ষণ কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিতে সাহায্য করেছে।
তবে ভারতের এই সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু নেতাদের আগ্রহ নয়, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি পরিচালনার পদ্ধতি।
নির্দিষ্ট লক্ষ্য, আলাদা কর্মসূচি
ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গঠন করা হয়। প্রশাসনিক ভাষায় এ ধরনের উদ্যোগকে বলা হয় ‘মিশন মোড’—যেখানে লক্ষ্য স্পষ্ট থাকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত দল নির্দিষ্ট থাকে এবং অগ্রগতি পরিমাপের সুযোগ থাকে।
বন্য প্রাণী সংরক্ষণে এই পদ্ধতির ব্যবহার দেখা যায়। বাঘের জন্য ‘প্রজেক্ট টাইগার’ দিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগ পরে হাতি, তুষারচিতাবাঘ, ডলফিন ও গণ্ডার সংরক্ষণেও সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব কর্মসূচির লক্ষ্য সংশ্লিষ্ট প্রজাতির সংখ্যা বাড়ানো, আবাসস্থল রক্ষা এবং অবৈধ শিকার প্রতিরোধ করা।
ভারতের জনস্বাস্থ্য খাতেও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচির ব্যবহার হয়েছে। পোলিও নির্মূলের প্রচেষ্টা এবং করোনাভাইরাস মহামারির সময় দ্রুত টিকা কর্মসূচি চালুর মতো উদ্যোগে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও সমন্বিত বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কার্যকর হয়েছে।
সরকারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজের যৌথ ভূমিকা
বন্য প্রাণী সংরক্ষণে ভারতের সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিক সমাজও ভূমিকা রাখছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে কাঠ আহরণ ও বনসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট সার্ভিস গড়ে তোলা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের প্রশাসনিক কাঠামোর দায়িত্ব ও ভূমিকা পরিবর্তিত হয়েছে।
বর্তমানে বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সংরক্ষিত এলাকা পরিচালনা, প্রাণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিকার প্রতিরোধের কাজ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, পরিবেশবাদী, বিজ্ঞানী ও গবেষক সংরক্ষণ কার্যক্রমে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও গবেষণাভিত্তিক সহায়তা দেন। তাঁরা সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজন হলে নীতিগত দুর্বলতাও তুলে ধরেন।
সরকারি সক্ষমতা ও নাগরিক সমাজের এই সমন্বয় সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করেছে।
সাফল্যের পাশাপাশি বাড়ছে মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত
ভারতের বন্য প্রাণী সংরক্ষণের অগ্রগতি সত্ত্বেও সমস্যার অভাব নেই। বাঘ, হাতি ও চিতাবাঘের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি তাদের চলাচলের এলাকা ও মানুষের বসতি, কৃষিজমি এবং অবকাঠামোর মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে। ফলে মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়ার ঘটনা, ফসলের ক্ষতি এবং প্রাণী হত্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
এই সমস্যা সমাধানে শুধু প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বন্য প্রাণীর চলাচলের পথ সংরক্ষণ, আবাসস্থল ধ্বংস বন্ধ করা, মানুষের বসতির কাছাকাছি সতর্কবার্তা ও নজরদারি বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও প্রয়োজন। সংরক্ষণের সাফল্য তখনই দীর্ঘস্থায়ী হবে, যখন মানুষ ও বন্য প্রাণী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশে, যেখানে উন্নয়ন, দারিদ্র্য মোকাবিলা ও অবকাঠামো নির্মাণের মতো বহু অগ্রাধিকার রয়েছে, সেখানে বন্য প্রাণী রক্ষায় ধারাবাহিক উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। সে কারণে এই অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মানুষ-বন্য প্রাণী সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, সংরক্ষণ নীতিকে আরও বাস্তবসম্মত ও স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
বন্য প্রাণী রক্ষার শিক্ষা কাজে লাগতে পারে দূষণ মোকাবিলায়
ভারতের বন্য প্রাণী সংরক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। দেশটি যদি একশিং গণ্ডারের মতো বিপন্ন প্রাণী রক্ষায় অর্থ, জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বায়ুদূষণ, দূষিত নদী-জলাশয় এবং বর্জ্যে ভরা কৃষিজমির মতো সমস্যার সমাধানেও একই ধরনের পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
অবশ্য বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশদূষণ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ এক নয়। দূষণ নিয়ন্ত্রণে শিল্পকারখানার নির্গমন কমানো, যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও জরুরি।
তবু লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি, দায়িত্ব নির্ধারণ, নিয়মিত অগ্রগতি যাচাই এবং জনসম্পৃক্ততার মতো নীতিগুলো দুই ক্ষেত্রেই কাজে লাগতে পারে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণে অর্জিত অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন থাকলে কঠিন সমস্যাতেও অগ্রগতি সম্ভব।
পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে বাঘ ও হাতির সুরক্ষাকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশুদ্ধ বাতাস ও পরিষ্কার পানি শুধু মানুষের জন্য নয়, বন্য প্রাণীর টিকে থাকার জন্যও অপরিহার্য। তাই প্রাণী সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণকে আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে একই পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভারতের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বন্য প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির সাফল্যকে মানুষের নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা। সেই সমন্বয় সম্ভব হলে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে অর্জিত অগ্রগতি আরও বিস্তৃত পরিবেশগত পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।












