কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার শুধু বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান কিংবা উন্নত দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াতে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় ‘স্মল এআই: আরও ও উন্নত কর্মসংস্থান’ শীর্ষক আলোচনায় উঠে এসেছে, স্বল্প ব্যয়ের এবং নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এমন এআই ব্যবস্থার ওপর, যা সাধারণ প্রযুক্তিসম্পন্ন যন্ত্রে ব্যবহার করা যায়, সীমিত ইন্টারনেট সংযোগেও কাজ করতে পারে এবং স্থানীয় ভাষায় সেবা দিতে সক্ষম। এর মাধ্যমে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় প্রয়োজনেই ছোট এআইয়ের গুরুত্ব
বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় ‘স্মল এআই’ বলতে এমন ব্যবহারিক ও সাশ্রয়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বোঝানো হয়েছে, যা নির্দিষ্ট কাজ এবং স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হয়। ব্যয়বহুল অবকাঠামো কিংবা উচ্চগতির ইন্টারনেটের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হওয়ায় এ ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কার্যকর হতে পারে।
কৃষিতে এআইয়ের ব্যবহার উৎপাদনসংক্রান্ত কাজকে সহায়তা করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় প্রযুক্তিটি সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একইভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণেও এর ভূমিকা থাকতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে প্রযুক্তিকে স্থানীয় বাস্তবতা ও ব্যবহারকারীদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
কর্মবাজারের পরিবর্তনে তরুণদের প্রস্তুতি
আলোচনায় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে শ্রমবাজারের চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আলোচনায় অংশ নেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা, সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নমসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের আলোচনায় এআইকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং আরও ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রয়োজনীয় ভিত্তি
সাশ্রয়ী এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু প্রযুক্তি উদ্ভাবন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, স্থানীয় উপাত্ত, দায়িত্বশীল পরিচালনব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব।
বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সীমা ছাড়িয়ে স্থানীয়ভাবে কার্যকর সমাধান ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে সফল হলেই তার সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত অবকাঠামো, ব্যবহারকারীদের সক্ষমতা এবং বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তির প্রয়োগ।
উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগানোর প্রশ্ন
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ছোট পরিসরের এআই এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেও বিভিন্ন খাতে সেবার মান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যেতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে কীভাবে কর্মসংস্থান, উন্নত সেবা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো যায়, তার ব্যবহারিক পথ চিহ্নিত করা।












