নাইজেরিয়ায় ১৬৭টি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। বিদ্যুৎ বা জ্বালানির অভাবে তার প্রায় সবগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশটি পোশাক রফতানির মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত, তা হারিয়েছে। পাশাপাশি ওই কারখানাগুলোতে যে ৫ লাখ লোক কাজ করত, তারা বেকার হয়েছে।
বাংলাদেশে বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২২১টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র মিলিয়ে পোশাক কারখানা বন্ধের কারণে বেকারের সংখ্যা ২ লাখের কাছাকাছি।
নাইজেরিয়ার এই পোশাকশিল্প বন্ধের কারণ বিদ্যুৎ-ঘাটতি। নাইজেরিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১৪ হাজার মেগাওয়াট, কিন্তু সেখানে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে মাত্র ৪ হাজার মেগাওয়াট। তাই কারখানাগুলো জেনারেটর দিয়ে চালিয়ে লাভের মুখ দেখতে পারছে না।

শুধু পোশাক কারখানার ক্ষেত্রেই নয়, নাইজেরিয়ার কৃষি থেকে আবাসনের ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ডিজেল ব্যবহার করে জেনারেটর দিয়ে সবকিছু সচল রাখতে হচ্ছে। যা প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশেও কৃষি ও বসবাসের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে ডিজেলের ব্যবহার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিজেলের উচ্চ দাম এবং ডিজেল কেনার জন্য দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ব্যয় করা—সব মিলিয়ে কৃষি উৎপাদনে যেমন খরচ বাড়ছে, তেমনি বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় জেনারেটর চালানোর ক্ষেত্রেও খরচ বাড়ছে। যার ফলে আবাসন এলাকায় দুই বছর আগের তুলনায় এখন অধিক সময় জেনারেটর চালানোর ফলে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাসা ভাড়া না বাড়লেও ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় সার্ভিস চার্জ বেড়ে গেছে। একদিকে বিদ্যুতের বিল সম্প্রতি দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়েছে, তার সঙ্গে সার্ভিস চার্জও বেড়েছে। ঠিক একই অবস্থা শপিংমলগুলোতে। তাদেরও জেনারেটরের ডিজেল খরচ বেড়েছে। আর এই খরচ তাদের যোগ করতে হচ্ছে পণ্যমূল্যের সঙ্গে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নাইজেরিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা পঁচিশ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সরকার এখন লোডশেডিংয়ের হিসাব দিচ্ছে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
কিন্তু গ্রাম, জেলা ও উপজেলা শহরগুলোর লোডশেডিংয়ের যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে সরকারের এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতা মেলে না। এমনকি ডিজেলের অভাবে জেনারেটর চালাতে না পেরে উপজেলা শহরের চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা বন্ধ থাকছে নয় থেকে দশ ঘণ্টা—এমন সংবাদও মিডিয়ায় আসছে।

আর এই বিদ্যুৎ ও ডিজেল খরচের কারণে অন্যান্য শিল্পে খরচ বাড়ার ফলে দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। যেমন, এখান থেকে দুই মাস আগে দেশি মধ্যমানের ফার্নিচার শিল্পে যে ডাবল সোফাটির দাম ছিল ৭৬ হাজার টাকা, সেটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার টাকা।
ঠিক তেমনি বাংলাদেশি ফেব্রিকসের মান ভালো ও দাম কম হওয়ার কারণে মধ্যবিত্তের সালোয়ার-কামিজের কাপড়, তাছাড়া পপলিন, ভোয়েল প্রভৃতি কাপড়গুলো বাজারের বড় অংশ দখল করে ছিল। সেখানে পাকিস্তান ও ভারত থেকে আমদানি করা কাপড়গুলো পরিবহন খরচ ও ট্যাক্স মিলিয়ে টিকতে পারছিল না। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারে দেশীয় কাপড়ে গড়ে উঠেছিল বিশাল পোশাক মার্কেট। এমনকি ওই মার্কেটে বাংলাদেশে তৈরি মেয়েদের ড্রেসে পাকিস্তানি বা ভারতীয় ট্যাগ লাগিয়ে বিক্রি করা হতো ভারত ও পাকিস্তানি কাপড়ের প্রতি আগ্রহী এক ধরনের ক্রেতার জন্য।
এক্ষেত্রেও এখন বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, নাইজেরিয়ার মতো দেশীয় পণ্য বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না আমদানি করা সস্তা চীনা ও ভারতীয় পণ্যের কারণে। বাংলাদেশেও পোশাক খাতে এই বিদ্যুৎ খরচ ও জেনারেটরের ডিজেল খরচসহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে আবার এখান থেকে দশ-পনেরো বছর আগে যেমন ভারতীয় পণ্যের আধিপত্য ছিল, অতটা না হলেও বেশ ভালোই জায়গা করে নিচ্ছে। দেশি ব্র্যান্ডগুলো আগের মতো সব ধরনের কাপড়ের জোগান দিতে পারছে না।
তাছাড়া নাইজেরিয়ায় জাহাজে চোরাই মাল হিসেবে চীনা পণ্য কতটা যায়, তার কোনো চিত্র ওইভাবে পাওয়া যায় না। তবে বাংলাদেশের পোশাক থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজারে যে ভারতীয় পণ্যের আধিপত্য ঘটছে, তা যেকোনো গ্রোসারি শপে গেলেই বোঝা যায়। সেই সাইফুর রহমানের আমলে বাংলাদেশের একটি গলির দোকান দেখলেও যেমন মনে হতো, এটা ভারতের কোনো গলির দোকান—অতটা না হলেও কাছাকাছি হতে চলেছে। যেমন টুথপেস্ট, এয়ার ফ্রেশনার, মশা তাড়ানোর নানান উপাদান থেকে শুরু করে চকলেট ইত্যাদির স্থানগুলো আবার ভারতীয় পণ্য দখল করছে। দীর্ঘ সীমান্ত এখানে কতটা রাত-বিরাতে কাজ করছে, তা-ই বা কে জানে?
পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস ও ক্রোকারিজ মার্কেটও দখল করছে চীনা ও ভারতীয় পণ্য। এমনকি চীনা ও ভারতীয় ইলেকট্রনিক পণ্যগুলোর খুচরা যন্ত্রাংশ এনে দুই বছর আগে এখানে যে পরিমাণ বৈধ ও অবৈধভাবে সংযোজন হতো, বিদ্যুতের অভাবে সেটাও কমে গেছে। যার ফলে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে এখন একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে নাইজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজার নষ্ট হয়ে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের দেশি ও কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ সেখানে এ মুহূর্তে ৮ কোটি মানুষ বিদ্যুতের বাইরে। বাংলাদেশে দুই বছর আগে ৯০ ভাগের বেশি মানুষ বিদ্যুতের আওতায় ছিল। এখন যেভাবে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না। জেলা শহরগুলোতে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে, ওইভাবে বিদ্যুৎ থাকে না। শপিং মল থেকে কারখানার মূল ভরসা জেনারেটর—সেখানে দেশের মোট ১৮ কোটির কত কোটি মানুষ বিদ্যুতের বাইরে, তার সঠিক হিসাব করা কষ্টকর।

অথচ নাইজেরিয়া যেমন তার বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানোর কোনো সঠিক পথ নিতে পারছে না, বাংলাদেশের অবস্থাও তেমনি। বরং অনেক জায়গায় বালখিল্যতা দেখা যাচ্ছে। অটোরিকশা গ্যারেজের বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিয়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা হচ্ছে।
আর বিদ্যুৎ বা জ্বালানির এই অভাবের কথা বলতেই দেখানো হচ্ছে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধকে কারণ হিসেবে। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ জ্বালানির বাজারের চিত্র বদলে দিয়েছে। সরবরাহের গতিপথ বদলে দিয়েছে। এটাই স্বাভাবিক ছিল। ভবিষ্যতে এই জ্বালানির চিত্র আরও বদলে যাবে। আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হবে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ও রাজনৈতিক চরিত্রও বদলে যাবে অনেক বেশি।
কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে গেলে তো এমন সমস্যার মুখোমুখি হতেই হবে। রাষ্ট্র চালানোর অর্থ এ নয় যে—মা দুধ মেখে ভাত গালে তুলে দেবে!
নাইজেরিয়া হয়তো বিদেশি একটি বড় শক্তির সে দেশে ব্যবসার কারণে নিজস্ব অর্থনীতি ধ্বংস ঠেকাতে পারছে না।
কিন্তু বাংলাদেশ কেন শেখ হাসিনার সরকার ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে উৎখাতের পরে ক্রমেই নাইজেরিয়ার পথে হাঁটছে?
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ না হলেও বাংলাদেশকে জ্বালানি নিয়ে অন্যভাবে সমস্যায় পড়তে হতো। যে কারণে প্রস্তুতি হিসেবে অনেকগুলো সৌরচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল—কাদের স্বার্থে ইউনূস সেগুলো বাতিল করে? সেগুলো বাতিল না হলে তার অনেকগুলো তো এতদিনে উৎপাদনে যেত।

তাছাড়া একজোট দুই ভাগ হয়ে প্রায় ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বর্তমান সরকার ৮ মাস ক্ষমতায় এসেছে। অথচ আট মাসে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা চিন্তা করে কেন তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকট মেটানোর চেষ্টা নেই? তার বদলে নাইজেরিয়ার তেল-গ্যাস ফিল্ডে যেমন বিদেশি কোম্পানির প্রতিনিধি ও কোম্পানির উপস্থিতি, তার একটা ছোট সংস্করণ কি কিছু কোম্পানির এজেন্ট ঘিরে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে না?
শুরুতে সরকারের বিকল্প উৎস ও রুটে জ্বালানি খোঁজা উচিত ছিল। আর রক্ষা করা উচিত ছিল দেশের রফতানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার।
তার বদলে একদিকে যেমন ফ্যাক্টরি বন্ধ করে অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্রেতা নষ্ট করা হচ্ছে। এমনকি অটোরিকশা থেকে ফুটপাতের বিক্রেতাদের ওপর এই অসময়ে আঘাত হেনে অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্রয়ক্ষমতা ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
অন্যদিকে শুধু তো বিদেশে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি কমছে না, ভারত পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে প্লাস্টিক পাইপের ওপর এন্টি-ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করেছে। একদিকে বর্ডারে ভারতীয় কাপড়ের বড় বড় চোরাচালান ধরা পড়ছে—অন্যদিকে বাংলাদেশের বৈধ রফতানির ওপর এন্টি-ডাম্পিং ট্যাক্স। অথচ কারও কোনো হেলদোল নেই। দেশ তো আর নিজের শক্তিতে চলতে পারে না। তাকে তো কাউকে না কাউকে চালাতে হয়। যেমন ছাত্রকে বইটি নিজে পড়তে হয়, অন্য কেউ পড়ে দিতে পারে না।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রি বন্ধে হামলার উপকারিতা
নারীমুক্তির রামমোহন, পূর্ববাংলার ব্রাহ্ম সমাজ ও রাহুল গান্ধী
ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ায় লাভবান তারেক রহমান, ক্ষতি বাংলাদেশের
কিশোর গ্যাং, অপ্রতীমের মৃত্যু এবং “মবস্টার ইউনূস”











