রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে একটি নাটক চলছে, তা বোঝার মতো বুদ্ধি ও বয়স এ দেশের অনেকেরই হয়েছে। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না বা বলার দরকারও নেই। কেন দরকার নেই, তার উত্তর পাওয়া যায় তৃপ্তি মিত্র অভিনীত একটি নাটকে। ‘অটল’ ম্যানেজার হয়েছে—এই খবর পাওয়ার পরে তৃপ্তি মিত্র যখন তাঁর সহ-অভিনেতাকে জিজ্ঞেস করছেন, অটলের কথার উত্তরে তুমি কী বললে? তিনি উত্তর দেন, ‘এখন তো শোনার সময়।’
আসলে পৃথিবীতে কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন শুধু শোনার সময়, দেখার সময়। আবার এর পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে, অনেক কিছু দেখতে নেই, শুনতে নেই। উত্তর দিতেও নেই।
যেমন সেদিন বাংলাদেশের মৌলবাদ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত কলকাতার এক ভদ্রলোক আমাকে ফোন করে বললেন, ‘দাদা, আপনাদের ওখানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এসব কী ঘটছে? সরকার তো ভালোই প্রোটেকশন দিচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে।’ আমি তাঁকে বলি, ‘দেখুন, ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে আমার ভয়েস এখন ব্রোকেন। আমি কথা বলতে পারছি না।’ ফোন ছেড়ে দেওয়ার পরে মাথার ভেতর অনেকক্ষণ শব্দ কটি ঘুরল—‘রবীন্দ্রনাথকে প্রোটেকশন দিচ্ছে’—হায় রবীন্দ্রনাথ!
এই ভদ্রলোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরে আমাকে উত্তেজিত হয়ে ফোন করেছিলেন, ‘দাদা, আপনাদের ওখানে এবার নাকি হিন্দুরা বিএনপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছে।’ সেদিনও সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিলাম—‘আমার কোনো ধারণা নেই।’
এসব ক্ষেত্রে আমি যে তৃপ্তি মিত্রের ওই সহ-অভিনেতার সংলাপ মেনে চলি, ‘এখন আমাদের শোনার সময়’, তা নয়। বরং আমি আমার চিকিৎসক প্রয়াত বদরুদ্দোজা চৌধুরীর উপদেশ মেনে চলি। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো, সুস্থ জীবনযাপন করতে হলে কারও কথা বা সঙ্গ যদি তোমাকে বিরক্ত করে, তাহলে সেটা এড়িয়ে চলবে। তাদের কথার উত্তর দেবে না। তাদের ফোন ধরবে না।’
তাছাড়া পাগলেও তো বোঝে, যে দেশে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নামে ১৯৭২ সাল থেকে যেসব স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছিল, সেগুলো পরিবর্তন করা জায়েজ—সেখানে রবীন্দ্রনাথের ছবি দেয়ালে আঁকা, আবার তাতে কালি লাগানো, আর তা নিয়ে কিছুটা মাতামাতি—এগুলো কি খুব ছোট মাপের সার্কাস নয়! এই সার্কাস দিয়ে খুব বেশি মানুষকে ভোলানো যায় না। তাছাড়া আমরা তো জেমিনি সার্কাস থেকে আসলাম বেগের সার্কাস—সবই দেখে এসেছি। তাই এই সার্কাস আমাদের নাড়া দেয় না।
যেমন, এর কয়েক বছর আগে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমাকে একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়ে নিজে লিখলেন, ‘এটা না শুনলেও চলবে। কারণ, বক্তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি কখনো রবীন্দ্রনাথ পড়েননি।’ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ওই রাস্তার মূর্খদের মতোই—রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন। আমার ওই বন্ধু ভদ্রলোকের জীবনে লাখ লাখ বইয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। তাই তিনি নিচে আরও লিখেছিলেন, বাস্তবে বই পড়া খুব সহজ কাজ নয়। আর রবীন্দ্রনাথকে পড়া তো মোটেই সহজ নয়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকারে আছে, রবীন্দ্রনাথ নাকি এখন কেউ পড়ে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই সাক্ষাৎকারের বেশ আগে সন্ধানী পত্রিকার সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের বাসায় এক আড্ডায় সুনীলদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দাদা, আপনি যে আপনার “পূর্ব-পশ্চিম” উপন্যাসে এক জায়গায় লিখেছেন, শেখ মুজিব ছাত্রদের চাপে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, এটা কি আপনি ইতিহাসের সত্য হিসেবে লিখেছেন, না আপনার উপন্যাসের ওই চরিত্রটির চিন্তা?’ সুনীলদার মতো ভদ্রলোক খুব কমই দেখেছি। তিনি শান্ত মাথায় বললেন, ‘বিষয়টা তো তেমনই ছিল।’
তখন আমার কোলে রাখা তাঁর হাতটি চেপে ধরে বলি, ‘দাদা, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতা বাইশ বছরের কিছু ছেলের চাপে কাজ করবেন?’ এ পর্যন্ত বলতেই তিনি শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘তুমি কী মনে করো?’ আমি বলি, ‘দাদা, এখানে মনে করার তো কিছু নেই। তিনি নেতা। তিনি তাঁর জনগণকে, তাঁর তরুণ ছাত্রদের, এমনকি তাঁর দলের নেতাদেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে বাংলাদেশ অর্জন পর্যন্ত সাফল্য নিয়ে- যারা তাঁর বিরূপ সমালোচনা করেন, তাঁরা জীবনের কাছে পরাজিত কিছু মানুষ। আর একটি শ্রেণি আমাদের এখানে আছে, যারা বাংলাদেশকে সরাসরি অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু তারা মনে-প্রাণে বাংলাদেশকে অস্বীকার করতে চায়। আর এই কাজের অংশ হিসেবে তারা প্রথমে শেখ মুজিবকে অস্বীকার করে। কারণ, শেখ মুজিবকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশকে অনেকখানি অস্বীকার করা হয়ে যায়। শেখ মুজিবকে অস্বীকার করার পরে যে বাংলাদেশ থাকে, সেটা বাস্তবে মিনি পাকিস্তান। এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরে এ দেশে অনেক সামরিক ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন হয়েছে। তার কোনো কোনো ঘটনায় পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগানও উঠেছে।’

সুনীলদা কী যেন ভেবে বললেন, ‘বেলাল ও গাজী তো সামনের মাসে কলকাতায় আসবে, তুমিও ওদের সঙ্গে এসো। তবে তুমি এক মাস আমার বাসায় থাকবে।’ হেসে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘দাদা, আমি তো স্কুল-বোর্ডিং, মিশনে, হোস্টেলে, হলে বড় হয়েছি। নিজের বাসাতেও বেমানান। তাই কারও বাসায় থাকতে পারি না। তবে আপনার শহরে থাকতে পারব।’
সেবার যাওয়া হয়নি। তার কয়েক মাস পরে সুনীলদা যখন এলেন, সে সময়ে গাজী ভাইয়ের বাসা বদল হয়ে গেছে। সেই বাসাতেই দুপুরের আড্ডায় সুনীলদা আমাকে আবার ডেকে বললেন, ‘আচ্ছা, অনেকের তো অনেক মতামত আছে—শেখ মুজিব সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? তিনি পড়াশোনা কেমন করতেন?’
উত্তরে বলি, ‘দাদা, এত বড় মানুষ সম্পর্কে এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না। কারণ, তাঁর একসময়ের নেতা আবুল হাশিম লিখেছেন, তিনি যখন রাতে মুজিবসহ অন্য ছাত্রনেতাদের “ইসলামিক সমাজতন্ত্র” বোঝাতেন, তখন মুজিব ঘুমিয়ে যেতেন।’ আবার সাংবাদিক হিসেবে নানা ফিচার করতে গিয়ে তাঁর পড়ার ঘরের বই নাড়াচাড়া করার যতটুকু সুযোগ পেয়েছি, তাতে মনে হয়েছে, তিনি রবীন্দ্রনাথ ও রাসেল খুব গভীরভাবে পড়তেন।
সুনীলদা বলেন, ‘ওঁর ছোট ছেলের নাম তো রাসেল ছিল, না?’
আমি মাথা নাড়তেই তিনি বললেন, ‘ছেলেটির ছবি আমি বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। বড় হলে মুজিবের চেয়েও সুন্দর দেখতে হতো।’
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আবার আমার হাতটা তাঁর মুঠোর ভেতরে নিয়ে বললেন, ‘তুমি তো ফিচার লিখতে গিয়ে তাঁর লাইব্রেরির বই নাড়াচাড়া করার সুযোগ পেয়েছ। তা দেখে কি তুমি বুঝতে পেরেছ, রবীন্দ্রনাথের কোন বইগুলো তিনি বেশি পড়েছেন?’
সেদিন সুনীলদার এ প্রশ্নের উত্তর দিইনি। এড়িয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু গাফফার চৌধুরী ভাই মারা যাওয়ার মাস দুয়েক আগে তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাস নিয়ে বারবার আলোচনা হতো। সে সময়ে একপর্যায়ে গাফফার ভাইকে বলেছিলাম, ‘ভাই, আপনারা তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অনেক বিষয় আলাপ করতেন। তবে তাঁর পড়ার ঘরের রবীন্দ্র রচনাবলি উল্টেপাল্টে আমার মনে হয়েছে, তিনি “ঘরে-বাইরে” উপন্যাসটি খুব পছন্দ করতেন।’ গাফফার ভাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কেন আমার এমনটি মনে হলো?’ আমি তাঁকে বলি, ‘দেখুন, আমি সহজ করে গদ্য লিখতে পারি না বলে বারবার বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো পড়ি। কারণ, এত সহজ বাংলায় প্রকাশ করার ক্ষমতা কোনো লেখকের লেখায় পাওয়া যায় না।’
অন্যদিকে, তাঁর প্রায় প্রতিটি ভাষণেই তিনি স্বাধিকার পাওয়া, স্বাধীনতা রক্ষা, বিপ্লব রক্ষা—সবকিছুর ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন নৈতিক চরিত্রের ওপর। আর যতক্ষণ না চরিত্র গঠন হয়, ততক্ষণ বিপ্লব বা সংগ্রামের কী অবস্থা হয়, তা তো রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের মতো অন্য কোথাও এত স্পষ্টভাবে বলা আছে বলে আমার জানা নেই। আর এর সারাংশই কিন্তু বারবার ধ্বনিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে।
বাস্তবে বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন বাইশ বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের চরিত্র গড়ে দেওয়ার সময় তাঁকে দেওয়া হয়নি।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
জেল হত্যা, পাকিস্তানি কালচার ও ৩ নভেম্বর জাতীয় নেতাদের হত্যা দিবস
উপমহাদেশ থেকে ইউরোপ: উগ্রতা মোকাবিলায় ইন্দিরা গান্ধীর পথ
বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে জন্ম নেওয়া নেতা-কর্মী ও “শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই”
সাংবাদিক শফিকুর রহমান: ধাবমান কালের গর্ভে তিনিও চলে গেলেন











