বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় নতুন করে অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ। চলতি বছরের শেষ দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী বছরজুড়েও এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের খাদ্যপণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।
আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম গড়ে ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে। এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, শস্য পরিবহনে বাধা এবং আবহাওয়াগত ঝুঁকি। এসব কারণে এ বছর খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে বাড়তে পারে আরও ৭ শতাংশ। দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ শতাংশে।
তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বা মূল্যস্ফীতি ঠিক কতটা বাড়তে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস নেই। দেশের বাজারে প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারের দর, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং বাড়তি খরচের কতটা ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে তার ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে
দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গড় ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে এ অঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গড় হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
শস্য ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় আগামী দিনে এ অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে চালের দাম এক বছর আগের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি ছিল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনো-সংশ্লিষ্ট আবহাওয়াগত ঝুঁকির কারণে চালের বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে চালের দাম ১০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। গত এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম বিশ্বে চালের উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গমের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালে গমের দাম ২৮ শতাংশ এবং পরের বছর আরও ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শস্যের দাম আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ২৫ শতাংশ। একই সময়ে গমের দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ; বার্ষিক হিসাবে বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
অক্টোবর মাসে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যসূচক গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি ছিল।
জ্বালানি ও সারের বাড়তি দামে বাড়বে উৎপাদন ব্যয়
২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে টানা তিন বছর দাম কমার প্রবণতা শেষ হতে পারে। এ বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ৯১ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৫ সালে এই দাম ছিল ৬৯ ডলার। তবে ২০২৭ সালের কোনো এক পর্যায়ে তা কমে ৭৯ ডলারে নামতে পারে।
এ বছর বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় বাদ দিলে চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি হতে পারে সরবরাহ কমার সবচেয়ে বড় ঘটনা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়ার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছিল।
সারের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ইউরিয়ার দাম বেড়েছে। বছর শেষে এই দাম আরও ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সালে ইউরিয়ার দাম ১২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস রয়েছে।
জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে। আমদানি করা জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিবর্তন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ধাতু ও মূল্যবান পণ্যের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে ধাতুর দাম সামগ্রিকভাবে ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম ইতোমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বাড়ায় এসব ধাতুর চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নও দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে ২০২৭ সালে ধাতুর দাম ৩ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
অন্যদিকে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ছে। ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৬ সালে এসব ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে। পরের বছর দাম কিছুটা কমলেও ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের গড় দামের তুলনায় তা তিন গুণের বেশি থাকতে পারে।
এল নিনোর ঝুঁকিতে বাংলাদেশের চা উৎপাদন
আবহাওয়ার পরিবর্তন বাংলাদেশের চা উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। এল নিনোর কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় চায়ের উৎপাদন ও গুণগত মান কমার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অঞ্চল এ ঝুঁকিতে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই এল নিনোর কারণে উচ্চ বা মাঝারি মাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। তবে চায়ের বৈশ্বিক বাজারে আপাতত সরবরাহের ঘাটতি নেই। উত্তর ভারত ও বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়ায় বাজারে পর্যাপ্ত চা রয়েছে।
বাংলাদেশে চা উৎপাদন কতটা কমতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কমার আশঙ্কা থাকলেও দুর্বল চাহিদার প্রভাবে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কলম্বো ও কলকাতার নিলামে চায়ের দাম ১ শতাংশ কমেছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বিশ্ববাজারে চায়ের দাম ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ সালে আরও ২ শতাংশ বাড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চায়ের চাহিদা বাড়লে দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
একাধিক সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে বাড়তে পারে ঝুঁকি
সামগ্রিকভাবে ২০২৭ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ৭ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও আবহাওয়াজনিত বিপর্যয় পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
জ্বালানির উচ্চমূল্য, কৃষ্ণসাগরে শস্যবাহী জাহাজে হামলা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো—এই তিনটি সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। শস্যের দাম বাড়তে পারে ২০ শতাংশ। এতে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়কেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর ফলে আরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে। ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষি খাতের চলতি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাটি ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রস্তুত রেখেছে। এর মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলার আগাম অর্থায়নের জন্য নির্ধারিত।
পণ্যবাজারের পরিস্থিতি সম্পর্কে সংস্থাটির উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রসপেক্টস গ্রুপের পরিচালক আয়হান কোসে বলেন, একসঙ্গে কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে বিশ্ববাজার। জ্বালানির বাড়তি খরচ ও বাণিজ্যিক বাধার কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।












