ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনে যেমন কার গুলিতে রাস্তায় লোক মারা গিয়েছিল, কীভাবে পুলিশ হত্যার অস্ত্র পেলো হত্যাকারীরা—তা জানা যায় না। তবে এটা বোঝা যায়, ইউনূস যে রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে গেছে, তাতে পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও অবৈধ অস্ত্র, অস্বাভাবিক মৃত্যু আর জঙ্গিদের অবাধ চলাচল স্বাভাবিক ঘটনা।
ইউনূস তার রিসেট বাটনে চাপ দেওয়ার পরে একের পর এক রাজবন্দী জেলখানায় অস্বাভাবিকভাবে মারা যাচ্ছে। সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন মারা যাওয়ার পরে জেলখানায় পড়ে থাকেন, তারপরে তার মৃতদেহ একটি হাসপাতালে এনে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এগুলো সবই চমৎকার মেটিকুলাস ডিজাইন। যা ইউনূস ও তার উত্তরসূরিদের আদর্শের দেশ পাকিস্তানকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে।
ব্রিটিশরা ঔপনিবেশিক শাসন চালালেও জেলখানার ক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলত। জেলখানা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন প্রথম ভাঙা হয় পাকিস্তান আমলে। রাজশাহীর জেলে খাপরা ওয়ার্ডে কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বন্দীদের সেদিন হত্যা করা হয়।
এরপর মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম জেল হত্যা শুধু বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যেই নয়—মূলত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে যে প্রতিবিপ্লবের ধারা শুরু হয়—৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ ছিল তারই একটি বড় ধারাবাহিকতা।
৩ নভেম্বরের জেলহত্যাকারী প্রকৃত কে? কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছিল—বলা হয়, তা এখনো রহস্যাবৃত। বাস্তবে এখানে রহস্যাবৃত ভাবার কোনো কারণ নেই। এটা যে ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটেছিল, তারই একটি ধারাবাহিকতা। এবং সেটা বাংলাদেশে চলমান। ইউনূস যে জেলখানায় এক ধরনের মৃত্যুর নামে হত্যা শুরু করে দিয়ে গেছে—তাও এই ধারাবাহিকতার বাইরে কিছু নয়। এবং যারা ইউনূসের সুহৃদ, তারাও এই প্রতিবিপ্লবের অংশ।
তাই বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল ষড়যন্ত্রকারী যেমন আজও অদৃশ্য, কে হত্যার নির্দেশদাতা, তা এখনো জানা যায় না। তেমনি ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতাকেও এখনো জানা সম্ভব হয়নি।
জেলখানায় যখন জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, সে সময়টা ছিল প্রতিবিপ্লবীদের ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ির একটা সময়। অনেকে খালেদ মোশাররফকে প্রতিবিপ্লবের বাইরে মনে করেন। তাঁদের শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে খালেদ মোশাররফ শুধু জানতে চেয়েছিলেন, এটা টোটাল সামরিক অভ্যুত্থান কিনা? অর্থাৎ টোটাল সামরিক অভ্যুত্থান হলে তার কোনো আপত্তি নেই।
তা ছাড়া খুনি ফারুক, রশীদ, ডালিমদের ক্যান্টনমেন্টে তিনিই আশ্রয় দিয়েছিলেন। শাফায়াত জামিল আপত্তি করলে তিনি বলেছিলেন, তিনি তো তাদেরকে নেকড়ের মুখে ঠেলে দিতে পারেন না। কারণ, সাধারণ সেপাইরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফুঁসে উঠেছিল। ওই সাধারণ সৈনিকদের হাত থেকে সেদিন খুনিদের রক্ষা করেন খালেদ মোশাররফ।

তা ছাড়া আরও একটা বিষয় খেয়াল করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ যখন ক্ষমতা নেন, সে সময়ে তার পাশে ছিলেন চীনা কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক শাহাদাত চৌধুরী ও এনায়তুল্লাহ খান। আবার খালেদ মোশাররফের পরাজয়ের পরে ৭ নভেম্বর যে বিজয় আসে, তার পাশেও এই দুজন ছিলেন।
যাহোক, খোন্দকার মোশতাকের কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তেই জেলখানায় চার নেতাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। জেলার তার নিয়মমাফিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হত্যাকারীদের ওই রাতে জেলে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না। তখন বঙ্গভবন থেকে মোশতাকই জেলারের কাছে ফোন করেন তাদেরকে জেলে ঢুকতে দেওয়ার জন্য এবং তারা যা করতে চায়, তা করার জন্য।
অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা নেওয়ার পরে প্রথম যে বাধা আসে, সেটা ছিল জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানের নামাজে জানাজার আয়োজনরে ক্ষেত্রে। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে জানাজা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রান্তে জাতীয় নেতাদের পাশে চার নেতাকে সমাহিত করার জন্য ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কয়েক নেতার নেতৃত্বে যে কবর খোঁড়া হচ্ছিল, তা খালেদ মোশাররফের নির্দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, খালেদ মোশাররফের নির্দেশে তৎকালীন পুলিশের ডিআইজি জাতীয় এই চার নেতার মৃতদেহ ছিনিয়ে নিয়ে যান। এবং পরিবারের কাউকে সঙ্গে না নিয়ে তিনজনের মৃতদেহ বনানীতে এবং একজনের, অর্থাৎ কামারুজ্জামানের মৃতদেহ তাঁর বাড়ি রাজশাহীতে সমাহিত করা হয়।
এবং বাংলাদেশের রাজনীতি ও বাঙালি জাতির সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যেমন রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো জানাজা হয়নি, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সর্বাধিনায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদসহ অপর দুই জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানের রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো জানাজা হয়নি।
এমনকি এটাও সত্য, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যার নাম যুদ্ধকালে গোটা পৃথিবী জানত, তিনি খালেদ মোশাররফ। এবং সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে দুজন সরাসরি যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন, একজন খালেদ মোশাররফ, অন্যজন কর্নেল তাহের। কর্নেল তাহেরের রাষ্ট্রীয়ভাবে জানাজা হয়নি। তাঁর হয়েছিল ফাঁসি। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফের জানাজা তো দূরের কথা, তাঁর কবরটি হয়েছিল কয়েক দিন আগে একজন মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর কবর যেভাবে হয়েছে, তার থেকেও নীরবে ও গোপনে। রাতের অন্ধকারে তাঁর মৃতদেহ নিয়ে এসে সব বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া কবরস্থানে গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে সচিত্র সন্ধানী সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন, যিনি খালেদ মোশাররফের আত্মীয় ও বন্ধু ছিলেন, তিনি, তাঁর গাড়ি চালক ও বিমানের একজন পাইলট মিলে তাঁকে সমাহিত করেন। আর ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সবচেয়ে বেশি পরিচিত এই সেক্টর কমান্ডারের জন্য রাষ্ট্র কোনো জানাজার আয়োজন করেনি।
অন্যদিকে আমাদের মুক্তিসংগ্রামে ছাত্রনেতাদের মধ্যে সারা দেশে সবচেয়ে পরিচিত নাম ছিল মতিয়া চৌধুরী ও তোফায়েল আহমেদ। ইউনূসের আমলে মতিয়া চৌধুরীর জন্য রাষ্ট্রীয় জানাজা তো দূরের কথা, তাঁকে কবর দেওয়ার জন্য তাঁদের সৃষ্ট বাংলাদেশে এক টুকরো মাটিও জোটেনি। ইউনূস-২-এর আমলে তোফায়েল আহমেদ তাঁর গ্রামের বাড়িতে কবরের মাটি পেয়েছেন, সাধারণ মানুষ তাঁর জন্য জানাজা করেছে—কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো জানাজা হয়নি।
আজ ৩ নভেম্বর, জাতীয় চার নেতার হত্যা দিবস। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিনটি আবার পালিত হওয়া নিষিদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক সংগঠন ও এই চার নেতার সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার সব অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তাই তাঁদের এই হত্যা দিবসও প্রকাশ্যে পালিত হবে না।
তাঁদের এই হত্যা দিবস প্রকাশ্যে পালিত না হওয়ার ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হয়, আসলে একটি দেশ স্বাধীন হলেও মুক্ত হতে দীর্ঘ সময় লাগে। সেখানে মাঝে মাঝে ইউনূসের মতো শকুনেরা নেমে আসে। তাদের তীব্র নখ থেকে আবার জাতির পতাকা মুক্ত করতে, জাতির নেতাদের সম্মানের আসনে বসাতে দীর্ঘ সংগ্রামে নামতে হয় নতুন প্রজন্মকে।
বাস্তবে সব দেশেরই স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন এক দীর্ঘ যাত্রা, তেমনি মুক্তিসংগ্রামও দীর্ঘ যাত্রা। আর সেখানে আলো-অন্ধকার যখন যা-ই থাকুক না কেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ভগ্ন ঢাকেও যথাসাধ্য বাজিয়ে যেতে হবে জয়বাদ্য—জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য। কারণ, শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পথ ধরে, তাদের আদর্শকে বুকে নিয়েই তো একদিন এ জাতির নতুন প্রজন্ম নিজেদেরকে বীর হিসেবে তৈরি করবে। তখন ভয়ে ও ত্রাসে ইউনূসের মতো রাতের অন্ধকারের জীবেরা পালাবে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ ও The Present World
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
উপমহাদেশ থেকে ইউরোপ: উগ্রতা মোকাবিলায় ইন্দিরা গান্ধীর পথ
বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে জন্ম নেওয়া নেতা-কর্মী ও “শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই”
সাংবাদিক শফিকুর রহমান: ধাবমান কালের গর্ভে তিনিও চলে গেলেন
বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা











