বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের পাতায় লেখা কোনো নীতির নাম নয়। এর প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখন, যখন আদালতের সামনে ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো মামলা আসে, কিংবা বিচারকদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ কৌলের আসন্ন আত্মজীবনী ‘উইদাউট ফিয়ার অর ফেভার’ (Without Fear or Favour) দেশটির বিচারব্যবস্থা নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সাবেক বিচারপতিদের কাছ থেকে সাধারণত নিজেদের সহকর্মী কিংবা বিচারক নিয়োগের কলেজিয়াম পদ্ধতি নিয়ে এতটা সরাসরি সমালোচনা শোনা যায় না। কিন্তু কৌল তাঁর বইয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন, তা ভারতের বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।
বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের ভূমিকা। কৌল দীর্ঘ চার দশক ধরে তাঁকে চিনতেন এবং চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁর অভিযোগগুলো নিছক বাইরের পর্যবেক্ষণ নয়; বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই এগুলো এসেছে।
বিচারিক সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ
২০২৩ সালে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের (পিএমএলএ) একটি মামলা চন্দ্রচূড়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে বলে জানিয়েছেন কৌল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এবং সেই ক্ষমতার ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকাই সমস্যার অন্যতম কারণ। কখনো কখনো মামলার আইনি যুক্তি কিংবা সংশ্লিষ্ট বিচারকের যোগ্যতার বাইরের চাপও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

কৌলের বর্ণনায়, একদিন তাঁকে প্রধান বিচারপতির কক্ষে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে বিচারপতি সঞ্জীব খান্নাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে জানতে চাওয়া হয়, তিনি ওই মামলাটি চালিয়ে যেতে চান কি না। তাঁকে সতর্ক অবস্থান নেওয়া এবং একটি মধ্যপন্থা অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
কৌল অবশ্য চন্দ্রচূড় ঠিক কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট করেননি। কিন্তু ঘটনাটির তাৎপর্য অন্য জায়গায়। কোনো মামলার বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হলে বিচারকের স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ন থাকে, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
অবসরের ঠিক আগে গুজরাট হাইকোর্টের চার বিচারপতির বদলি-সংক্রান্ত একটি মামলাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা লিখেছেন কৌল। মামলাটি হঠাৎ করেই রাতারাতি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ধারণা, প্রধান বিচারপতি কোনো চাপের মধ্যে ছিলেন। সেই চাপের উৎস তিনি সরাসরি উল্লেখ না করলেও সরকারের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
বিচারক নিয়োগে সরকারের সম্মতির প্রয়োজন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি এসেছে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের কলেজিয়াম প্রক্রিয়া নিয়ে। কৌলের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বৈঠক চলাকালে চন্দ্রচূড় তাঁকে আলাদা কক্ষে নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, নিয়োগের বিষয়ে সরকারের মনোভাব জানতে ফোন করা উচিত কি না।
কৌল তাঁকে এমন উদ্যোগ থেকে বিরত থাকতে বলেন। কারণ, কলেজিয়ামের আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলার মধ্যেই সরকারের মতামত চাওয়ার অর্থ দাঁড়ায়, বিচারক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই নির্বাহী বিভাগের সম্মতি নেওয়া।

কৌলের আপত্তির মূল জায়গা ছিল পরামর্শ গ্রহণ এবং আগাম অনুমোদন নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সরকারের পছন্দকে সিদ্ধান্তের পূর্বশর্তে পরিণত করা যায় না। তাঁর অভিযোগ, নিয়োগের প্রশ্নে চন্দ্রচূড় সরকারের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় ছিলেন।
এই অভিযোগ সত্য হলে কলেজিয়াম ব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারণ, এই ব্যবস্থার অন্যতম যুক্তি হলো বিচার বিভাগের নিয়োগপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক নির্বাহী বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা।
কলেজিয়াম ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতা
কৌলের বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারক বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় পেশাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের ঘাটতি। তাঁর দাবি, সাবেক প্রধান বিচারপতি ইউ ইউ ললিত কিছু পরিবর্তন আনার আগে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের জন্য বিবেচিত বিচারকদের রায় নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করার কোনো কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা ছিল না। অর্থাৎ, একজন বিচারকের বিচারিক দক্ষতা ও সিদ্ধান্তের মান যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রায় সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই অনুপস্থিত ছিল।
এটি বিচারক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে গুরুতর দুর্বলতা। কারণ, বিচারকের পদোন্নতি শুধু জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ার বিষয় নয়; তাঁর আইনি প্রজ্ঞা, বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাগত সততা ও কাজের মানও বিবেচনায় আসা প্রয়োজন।
বিচারপতি আকিল কুরেশির নাম সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়নি বলে কৌলের বর্ণনায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কারণ সরকার ওই সুপারিশের বিরোধিতা করতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। অর্থাৎ, সম্ভাব্য সরকারি আপত্তি বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থী নির্বাচনের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আরও কয়েকটি ঘটনা কলেজিয়াম ব্যবস্থার ওপর সরকারি প্রভাবের চিত্র তুলে ধরে। একটি বড় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে সরকারের পছন্দের একজন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার চাপ এসেছিল বলে কৌল জানিয়েছেন। কলেজিয়াম ওই ব্যক্তিকে উপযুক্ত মনে না করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে তুলনামূলক ছোট একটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি করার মাধ্যমে বিরোধ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
অন্য একটি ঘটনায়, যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন একজন জ্যেষ্ঠ বিচারককে সুপ্রিম কোর্টে উন্নীত করার প্রস্তাব নিয়ে সরকার প্রশ্ন তোলে। তাঁর ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে আরও প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন কি না, সে বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়। এমনকি ধর্মান্তরের আগে তাঁর পরিবারের জাতিগত পরিচয় কী ছিল, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে কৌল লিখেছেন।
এ ধরনের প্রশ্ন বিচারক নিয়োগে যোগ্যতা ও পেশাগত সততার পরিবর্তে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে বিবেচনায় আনার আশঙ্কা তৈরি করে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আসল পরীক্ষা

এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কৌল মনে করেন, জাতীয় বিচারক নিয়োগ কমিশন (এনজেএসি) ব্যবস্থাকে শুরুতেই বাতিল না করে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। ভারতের বিচার বিভাগ নিজেই যে ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও তাঁর প্রশ্ন রয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে আসে। কলেজিয়াম ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি হলো, বিচারক নিয়োগে সরকারের প্রভাব কমানো। কিন্তু সেই ব্যবস্থার ভেতরেই যদি সরকারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া, পছন্দ কিংবা আপত্তি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা কোথায়?
আরও বড় প্রশ্ন, প্রধান বিচারপতির মতো সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তি যদি সরকারের চাপের মুখে পড়েন, তাহলে বিচার বিভাগের অন্য সদস্যদের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত? প্রধান বিচারপতিকে অভিশংসন ছাড়া অপসারণ করা যায় না। তবু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের সম্ভাবনা তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন অভিযোগ বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
কৌলের আত্মজীবনীতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোই চূড়ান্ত সত্য, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। তবে একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ বিচারপতি যখন নিজের সহকর্মী, নিয়োগব্যবস্থা এবং সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পর্ক নিয়ে এমন প্রশ্ন তোলেন, তখন বিষয়টিকে ব্যক্তিগত মতবিরোধ বলে পাশ কাটানো যায় না।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব শুধু সংবিধান বা বিচারকদের ওপর ছেড়ে দিলেই চলে না। নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে মুক্ত রাখার কার্যকর নিশ্চয়তা থাকতে হয়। ভারতের বিচার বিভাগের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সেই নিশ্চয়তাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর।
* করন থাপার একজন লেখক ও সাংবাদিক। তাঁর ‘ডেভিলস অ্যাডভোকেট: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। লেখকের মতামত ব্যক্তিগত।












