ইতিহাস বিকৃত করার প্রচেষ্টা নতুন নয়। রাজনৈতিক স্বার্থে অতীতের ঘটনাকে অস্বীকার করা, অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়া কিংবা জাতীয়তাবাদী বয়ানের আড়ালে সত্যকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করার নজির বহু দেশের ইতিহাসেই রয়েছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারের সঙ্গে এই পুরোনো প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন ইতিহাসের সত্য বদলানোর চেষ্টা শুধু পাঠ্যবই, সংবাদমাধ্যম কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর লক্ষ্য হয়ে উঠেছে এআইয়ের তথ্যভান্ডার ও প্রশিক্ষণপ্রক্রিয়া।
সাম্প্রতিক কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, জাপানের ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কয়েকটি বৃহৎ ভাষাভিত্তিক এআই মডেলে বিকৃত ও মিথ্যা তথ্য প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে কোনো কোনো মডেলের উত্তরে ইতিহাসের বিকৃত ব্যাখ্যা উঠে আসছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এআই এখন মানুষের জ্ঞান অর্জন, তথ্য যাচাই এবং ইতিহাস বোঝার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠছে। সেখানে পরিকল্পিতভাবে ভুল তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া গেলে তার প্রভাব প্রচলিত প্রচারণার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত হতে পারে।
ইতিহাস বিকৃতির প্রচারণা যখন সংগঠিত শিল্প
জাপানের ডানপন্থী মহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দায় ও যুদ্ধকালীন অপরাধের ইতিহাস পুনর্ব্যাখ্যার চেষ্টা দীর্ঘদিনের। পাঠ্যবইয়ে যুদ্ধের ভূমিকা খাটো করে দেখানো, ইয়াসুকুনি মন্দিরে বিতর্কিত শ্রদ্ধা নিবেদন এবং জাপানের সামরিক অতীত নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো ইঙ্গিত করছে, প্রচারণাটি এখন আরও সংগঠিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, জাপানের কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী চীনবিরোধী ভিডিও তৈরির জন্য অনলাইন নির্মাতাদের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ করছে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে ভিডিও তৈরির জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
২০১৫ সাল থেকে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কৌশলগত আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নামে এ ধরনের প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছে বলে নিবন্ধটিতে দাবি করা হয়েছে। ফলে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড না থেকে পরিকল্পিত প্রচারণার রূপ নিয়েছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারি এআই ব্যবস্থায় ইতিহাসের নির্বাচিত পাঠ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি জাপানের সরকারি এআই ব্যবস্থা ‘জেন্নাই’কে ঘিরে। জাপানের ডিজিটাল এজেন্সির নেতৃত্বে তৈরি এই ব্যবস্থা ২০২৬ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, জেন্নাইয়ের তথ্য সংগ্রহের সূচনা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৪৭ সালের মে মাস থেকে, যখন জাপানের যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী সংবিধান কার্যকর হয়। এর ফলে ১৮৯৪-৯৫ সালের চীন-জাপান যুদ্ধ, চীনে জাপানের আগ্রাসন, ঔপনিবেশিক শাসন এবং টোকিও ট্রাইব্যুনালের রায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয় এর মূল তথ্যভান্ডারের বাইরে থেকে গেছে।
এই বাছাইয়ের তাৎপর্য গভীর। কোনো এআই ব্যবস্থার তথ্যভান্ডারে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা অনুপস্থিত থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর দিতে পারে না। সরকারি কর্মকর্তারা সেই ব্যবস্থা ব্যবহার করে নথি বা নীতিগত প্রতিবেদন তৈরি করলে নির্বাচিত ঐতিহাসিক বয়ান সরকারি ব্যবহারের মাধ্যমে আরও গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।
পরবর্তী সময়ে এসব নথি ও তথ্য অন্য তথ্যভান্ডারে যুক্ত হলে বিকৃত বয়ান আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থাৎ, সরকারি ব্যবহারের কারণে কোনো অসম্পূর্ণ তথ্যকে নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এআইয়ের অদৃশ্য পক্ষপাত, দৃশ্যমান প্রভাব
এআইয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো, এটি যে তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর তৈরি করে, ব্যবহারকারীরা সব সময় সেই তথ্যের উৎস বা নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে পারেন না। ভাষাভিত্তিক মডেল বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করে। ফলে প্রশিক্ষণ উপাত্তে ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য ঢুকে পড়লে সেটি উত্তরের মধ্যেও প্রতিফলিত হতে পারে।
এখানেই তথ্য বিকৃতির নতুন কৌশলটি বিপজ্জনক। একটি মিথ্যা বক্তব্য রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহৃত হলে তার উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্ভব। কিন্তু একই বক্তব্য যখন এআইয়ের তৈরি উত্তর হিসেবে সামনে আসে, তখন অনেক ব্যবহারকারী সেটিকে প্রযুক্তিনির্ভর নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত বলে মনে করতে পারেন।
এভাবে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা ধীরে ধীরে সাধারণ জ্ঞানের অংশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যখন ইতিহাস জানার জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভর করছে, তখন এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতি ও সামরিকীকরণের প্রশ্ন
এই প্রচারণার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও নিবন্ধটিতে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। লেখকের মতে, জাপানের ডানপন্থী শক্তিগুলোর লক্ষ্য শুধু অতীতের অপরাধ আড়াল করা নয়; যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশটির সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণের পথও সহজ করা।
জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধন, আত্মরক্ষাকেন্দ্রিক সামরিক নীতির পরিধি বাড়ানো এবং সামরিক বাহিনী ও অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়ে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এসব উদ্যোগের পক্ষে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আগ্রাসী ভূমিকার দায় কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কারণ, অতীতের যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী অবস্থান বজায় রাখার প্রশ্নটি জাপানের সামরিক নীতির বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ইতিহাসের দায়বদ্ধতা দুর্বল হলে সামরিক শক্তি সম্প্রসারণের রাজনৈতিক যুক্তি প্রতিষ্ঠা করাও তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
প্রযুক্তির স্বাধীনতা, ইতিহাসের দায়
এআইয়ের তথ্যভান্ডারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত করার অভিযোগ শুধু জাপান বা চীনের মধ্যকার বিরোধের বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক তথ্যব্যবস্থা ও ইতিহাসের নির্ভরযোগ্যতা রক্ষার প্রশ্ন। কোনো দেশের রাজনৈতিক গোষ্ঠী যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের পছন্দমতো অতীত নির্মাণ করতে পারে, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই কৌশল অনুসরণের সুযোগ পাবে।
এ কারণে এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব কেবল প্রযুক্তির দক্ষতা বাড়ানো নয়; তথ্যের উৎস, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং প্রশিক্ষণ উপাত্তের ভারসাম্য নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার ক্ষেত্রে স্বীকৃত নথি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের ভিত্তিতে এআইয়ের উত্তর যাচাই করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ইতিহাসের সত্য কোনো রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজনের অধীন হতে পারে না। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার কথা, অতীতের অপরাধ আড়াল করার হাতিয়ার হওয়ার কথা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে তথ্যযুদ্ধ শুরু হয়ে থাকলে তার মোকাবিলা করতে হবে তথ্যের স্বচ্ছতা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের বিকৃত সংস্করণই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
লেখক: লু হাও, চাইনিজ একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব জাপানিজ স্টাডিজের সমন্বিত কৌশল গবেষণা দপ্তরের পরিচালক।












