ভারতের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের কথা যত জোরে উচ্চারিত হয়, বাস্তবে নারীর স্বাধীনতা ততটা নিশ্চিত হয় না। ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং তার আদর্শিক ভিত্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) রাজনীতিতে এই বৈপরীত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেখানে নারীকে সম্মান জানানোর ভাষা আছে, নারীকে দেবীর আসনে বসানোর প্রবণতা আছে, আছে কন্যা, বোন ও মায়ের মর্যাদা নিয়ে অসংখ্য রাজনৈতিক বক্তব্য। কিন্তু একজন স্বতন্ত্র নাগরিক হিসেবে নারীর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, নিজের পরিচয় নির্মাণের স্বাধীনতা কিংবা পুরুষের অনুমোদন ছাড়াই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ কতটা স্বীকৃত?
মূল সংকটটি এখানেই। বিজেপি-আরএসএস নারীকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে স্বচ্ছন্দ, কিন্তু স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা হিসেবে মেনে নিতে অনীহা দেখায়। নারীকে পরিবারের সম্মান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বাহক হিসেবে দেখতে চায়। অথচ নিজের পোশাক, সম্পর্ক, পেশা, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা জীবনযাপন সম্পর্কে নারী নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন—এই ধারণার সঙ্গে তাদের রক্ষণশীল রাজনৈতিক দর্শনের সংঘাত রয়েছে।
নারীর প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল কিছু নেতার ব্যক্তিগত মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতার প্রকাশ, যেখানে নারীর স্বাধীনতা স্বীকৃত হওয়ার আগে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অনুমোদন প্রয়োজন বলে ধরে নেওয়া হয়।
নারীর পরিচয় কি শুধু সম্পর্কের মধ্যে?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রচারে নারীকল্যাণ ও নারীশক্তির কথা নিয়মিত উঠে আসে। কন্যাশিশুর শিক্ষা, রান্নার গ্যাস সরবরাহ, আর্থিক সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে নারীর ক্ষমতায়নের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব উদ্যোগের বাস্তব উপযোগিতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া আর নিজের জীবনের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা কি একই বিষয়?
একজন নারী রান্নার গ্যাস পেতে পারেন, সরকারি সহায়তাও পেতে পারেন। কিন্তু তিনি কী পোশাক পরবেন, কার সঙ্গে সম্পর্ক গড়বেন, কোথায় যাবেন কিংবা প্রকাশ্যে কী বলবেন—এসব সিদ্ধান্তে যদি সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তি হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সেই ক্ষমতায়ন অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
বিজেপির রাজনৈতিক ভাষায় নারীকে প্রায়ই কন্যা, বোন কিংবা দিদি হিসেবে পরিচয় করানো হয়। এসব সম্পর্কের নিজস্ব আবেগ ও সামাজিক মূল্য রয়েছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন একজন নারীর স্বতন্ত্র পরিচয়কে আড়াল করে তার পারিবারিক সম্পর্ককেই প্রধান পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
একজন নারী লেখক বা রাজনীতিকের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তাঁর স্বামী কিংবা পরিবারের পুরুষ সদস্যকে টেনে আনার প্রবণতাও একই মানসিকতার প্রকাশ। এতে ধরে নেওয়া হয়, নারীর বক্তব্যের মূল্যায়ন তাঁর নিজের পরিচয়ে নয়, বরং কোনো পুরুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীর ব্যক্তিসত্তাকে ছোট করে। একজন নারী প্রথমত একজন স্বতন্ত্র মানুষ, নাগরিক ও চিন্তাশীল ব্যক্তি। তাঁর পরিচয় কেবল কারও মেয়ে, স্ত্রী কিংবা বোন হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
পোশাকের স্বাধীনতাও রাজনৈতিক বিতর্ক
ভারতে নারীর পোশাক নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক নতুন নয়। কখনো পশ্চিমা পোশাককে ভারতীয় সংস্কৃতির জন্য হুমকি বলা হয়, কখনো ছেঁড়া জিনস পরাকে শালীনতার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার কোনো বিজ্ঞাপনে একজন অভিনেত্রীকে প্রচলিত পোশাকের বাইরে দেখা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নৈতিকতার অভিযান।
অভিনেত্রী কৃতি সাননের একটি রাখিবন্ধনবিষয়ক বিজ্ঞাপনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক তার উদাহরণ। বিজ্ঞাপনে তাঁর ইন্দো-ওয়েস্টার্ন পোশাক নিয়ে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো আপত্তি তোলে। বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাওয়াতও পোশাকটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এখানে বিতর্কের বিষয় শুধু একটি পোশাক নয়। আসল প্রশ্ন, একজন নারী কী পরবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? নিজের পোশাক নির্বাচনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বাধীনতা কি রাজনৈতিক নেতাদের রুচি ও সংস্কৃতিবোধের ওপর নির্ভর করবে?
পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো স্বাধীনতাকে শর্তযুক্ত করে দেওয়া। নারী স্বাধীন হবেন, তবে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে। নিজের মত প্রকাশ করবেন, তবে তা যেন প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধের বিরোধী না হয়। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হবেন, তবে পুরুষ নেতৃত্বের নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে যাবেন না।
এই সীমারেখা অতিক্রম করলেই শুরু হয় চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন, সামাজিক অপমান কিংবা অনলাইন হয়রানি। এমনকি কখনো নারীর পরিবারকেও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
রাজনীতিতে নারীর জন্য দ্বৈত মানদণ্ড
ভারতের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এখনো শক্তিশালী। একজন পুরুষ রাজনীতিকের কঠোর বক্তব্যকে রাজনৈতিক দৃঢ়তা হিসেবে দেখা হতে পারে। কিন্তু একজন নারী একই ভাষায় কথা বললে তাঁকে প্রায়ই উদ্ধত, অসংযত কিংবা শালীনতাবিবর্জিত বলা হয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ঘিরে এই বৈপরীত্য সামনে আসে। প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রতিবাদকারীদের ব্যবহৃত কিছু অশালীন শব্দের প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রশ্ন তোলেন, দেশের মেয়েরা এমন ভাষা ব্যবহার করছে কীভাবে। এখানে প্রশ্ন ওঠে, তরুণ প্রতিবাদকারীদের নাগরিক পরিচয়ের বদলে তাঁদের নারী পরিচয়কে সামনে আনার প্রয়োজন কেন হলো?
একজন পুরুষ প্রতিবাদকারী কঠোর ভাষা ব্যবহার করলে সেটি রাজনৈতিক অসংযম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু একজন নারী একই কাজ করলে তাঁর আচরণকে নারীসুলভ শালীনতার মানদণ্ডে বিচার করা হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতাও যেন লিঙ্গের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রতিবাদে অংশ নেওয়া এক কিশোরী ও তাঁর বিধবা মাকে অনলাইনে ভয়াবহ হয়রানির শিকার হতে হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তাঁদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। এটি দেখায়, রাজনৈতিক বিরোধিতার জবাব দিতে গিয়ে কীভাবে একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও নিরাপত্তাকে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো সম্ভব।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরেও একই ধরনের পুরুষতান্ত্রিক ভাষা দেখা গেছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে ঘরে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পরামর্শ দেন এবং তাঁকে রাজপথে বের হতে না দেওয়ার ব্যবস্থা করার হুমকি দেন।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কঠোর বক্তব্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একজন নারী নেত্রীকে ঘরে আটকে রাখার হুমকি দেওয়া রাজনৈতিক সমালোচনা নয়; এটি নারীর স্বাধীন চলাচল ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকারকে অস্বীকার করার প্রকাশ।
একই কথা কোনো প্রভাবশালী পুরুষ সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রে বলা হতো কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। নারীর রাজনৈতিক অবস্থান যত শক্তিশালী হয়, তাঁকে ঘরে ফেরানোর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপও যেন তত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
স্বাধীন নারী নেতৃত্বের প্রতি অস্বস্তি
ভারতের ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থান দেখিয়েছে, নারী শুধু পুরুষনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়েই নেতৃত্ব দিতে বাধ্য নন। তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে পারেন, নিজস্ব ক্ষমতার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।
ইন্দিরা গান্ধীকে একসময় তাচ্ছিল্য করে ‘বোবা পুতুল’ বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিজের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি তিনি একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁদের রাজনৈতিক পথ এক নয়। কিন্তু একটি জায়গায় মিল রয়েছে—দুজনই পুরুষ নেতৃত্বের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকেননি। নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিজেরাই তৈরি করেছেন।
বিজেপির নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এমন স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্রের অভাব লক্ষণীয়। সুষমা স্বরাজ ছিলেন ভারতের অন্যতম শক্তিশালী ও সাবলীল সংসদীয় বক্তা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভূমিকা ক্রমেই প্রাধান্য পেয়েছে। রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও দলীয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্বের মধ্যে পড়েছেন। উমা ভারতীও একসময় জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও পরে দলের মূল ক্ষমতাকাঠামো থেকে সরে যান।
বর্তমান নারী নেতাদের অবস্থানও এই প্রশ্ন উত্থাপন করে। স্মৃতি ইরানি প্রধানত গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের নিজস্ব অর্থনৈতিক দর্শন বা নীতিগত অবস্থান কতটা স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ রয়েছে, সেটিও আলোচনার বিষয়। দলীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিগত মতাদর্শ ও নেতৃত্বের স্বাতন্ত্র্য কতটা জায়গা পাচ্ছে?
কোনো দলের নারী নেত্রী মন্ত্রী বা সাংসদ হলেই তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতাবান বলা যায় না। প্রকৃত নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি এবং দলের ভেতরে প্রশ্ন তোলার সক্ষমতা।
আরএসএসের সাংগঠনিক কাঠামোতেও এই বৈষম্যের প্রতিফলন রয়েছে। সংগঠনটির মূল সদস্যপদ পুরুষদের জন্য সীমাবদ্ধ। নারীদের জন্য রয়েছে পৃথক সংগঠন রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি। অর্থাৎ একই আদর্শিক প্রকল্পে কাজ করলেও নারীরা মূল সংগঠনে পুরুষদের সমান সাংগঠনিক অবস্থান পান না।
এটি শুধু সাংগঠনিক বিন্যাসের প্রশ্ন নয়। যে প্রতিষ্ঠান সমাজ পরিচালনার আদর্শ নিয়ে কাজ করে, তার নিজের কাঠামোতেই নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সেই আদর্শের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নারী সংরক্ষণ: আসন বাড়লেই কি ক্ষমতা বাড়বে?
ভারতের নারী সংরক্ষণ আইনও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৩ সালে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইনটি কার্যকর করার সঙ্গে আসন পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া যুক্ত হওয়ায় এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বর্তমান ৫৪৩ সদস্যের লোকসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত হলে প্রায় ১৮১ জন নারী সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ পেতেন। এতে বিদ্যমান রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় সরাসরি পরিবর্তন আনতে হতো। বহু পুরুষ সংসদ সদস্যকে নিজেদের আসন ছাড়তে হতো এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে নেতৃত্বের জায়গায় নারীদের জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হতো।
কিন্তু লোকসভার মোট আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে প্রায় ৮১৬ করা হলে এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণের ফলে নারীদের জন্য আসন হতো ২৭৩টি। একই সঙ্গে পুরুষদের আসন থাকত ৫৪৩টি। অর্থাৎ নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও পুরুষদের বিদ্যমান আসনসংখ্যা কমত না; বরং আগের তুলনায় বাড়ত।
এই ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলেও ক্ষমতার পুরোনো কাঠামো কতটা বদলাবে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। প্রকৃত ক্ষমতা ভাগাভাগি মানে শুধু নতুন আসন তৈরি নয়; বিদ্যমান ক্ষমতাকেন্দ্রের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া সংসদের সদস্যসংখ্যা ৮০০-এর বেশি করার ফলে প্রশাসনিক ও সংসদীয় ব্যয়ও বাড়বে। সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে করদাতাদের।
নারী সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কেবল সংখ্যাগত উপস্থিতি বাড়িয়ে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো অক্ষুণ্ন রাখলে আইনটির মূল উদ্দেশ্য পুরোপুরি অর্জিত হবে না।
সংস্কৃতির নামে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি
নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে বিজেপি-আরএসএসের অবস্থানের আরেকটি বৈপরীত্য দেখা যায় ধর্মীয় পোশাক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিতর্কে। একদিকে হিন্দু নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য ও শালীনতার বিধিনিষেধ আরোপের প্রবণতা রয়েছে, অন্যদিকে মুসলিম নারীদের হিজাব পরিত্যাগের আহ্বান জানানো হয়।
দুটি অবস্থানের মধ্যে আপাত পার্থক্য থাকলেও মূল মানসিকতা একই। নারী নিজে কী চান, সেটি মুখ্য নয়; তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অন্য কেউ নিজের হাতে রাখতে চায়।
একজন নারী শাড়ি পরবেন, জিনস পরবেন, হিজাব পরবেন কিংবা কোনো ধর্মীয় পোশাক পরবেন না—এসব সিদ্ধান্ত তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হওয়া উচিত। স্বাধীনতার অর্থ কোনো একটি নির্দিষ্ট পোশাককে আদর্শ ঘোষণা করা নয়। বরং নারীকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়া।
একইভাবে তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’ বিতর্কেও নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নটি উপেক্ষিত হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কাকে ভালোবাসবেন কিংবা কাকে বিয়ে করবেন, সেটি তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই বিতর্কে নারীকে প্রায়ই এমন একজন অসহায় ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যাঁকে নিজের পছন্দ থেকে রক্ষা করতে হবে।
এতে নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক সংস্কৃতির নামে একজন নারীর সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাঁর নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করে।
নারীর ক্ষমতায়ন কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়। এটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক শর্ত। একজন নারীকে নিজের জীবন পরিচালনার অধিকার দিতে হলে প্রথমেই তাঁকে স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকার করতে হবে।
নারীকে দেবী হিসেবে পূজা করা আর মানুষ হিসেবে সমান অধিকার দেওয়া এক বিষয় নয়। দেবীর আসনে বসিয়ে তাঁকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখাও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ। কারণ দেবীর কাছে সমাজ প্রত্যাশা করে নির্দিষ্ট আচরণ, কিন্তু একজন স্বাধীন মানুষের থাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রে নারীর অংশগ্রহণ শুধু ভোটের সংখ্যা কিংবা সরকারি প্রকল্পের সাফল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হবে তাঁরা কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবন গড়তে পারছেন এবং পুরুষের সমান মর্যাদায় রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় অংশ নিতে পারছেন কি না।
নারীর পোশাক, বক্তব্য, সম্পর্ক ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর অন্যের নিয়ন্ত্রণ যত দিন থাকবে, তত দিন নারীশক্তির স্লোগান বাস্তব ক্ষমতায়নের বিকল্প হতে পারবে না।
একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্রে নারীকে সুরক্ষার নামে বন্দি করে রাখা যায় না। তাঁকে সম্মান জানানোর অর্থ তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা।
নারীর শরীর কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, তাঁর স্বাধীনতা কোনো সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদননির্ভর নয়। একজন নারী কী পরবেন, কী বলবেন, কাকে ভালোবাসবেন কিংবা কীভাবে নেতৃত্ব দেবেন—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নিজের।
প্রকৃত নারীশক্তি প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিনই, যেদিন নারীকে আর কারও কন্যা, বোন কিংবা স্ত্রী হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে। নারীকে ক্ষমতায়নের দাবি করতে হলে পুরুষতন্ত্রের এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ভাঙতেই হবে।












