পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় সরকার পরিবর্তনের ঘটনা দেশটির রাজনীতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। যে প্রদেশকে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে জনপ্রিয় একটি সরকারের বিদায়ের পরও কেন বড় ধরনের জনবিক্ষোভ দেখা গেল না? যে দলটির নির্বাচনী সমর্থন নিয়ে এত আলোচনা, সেই দলের সরকারকে রক্ষা করতে সাধারণ ভোটাররা কেন রাস্তায় নামলেন না?
ঘটনার আগে পিটিআইয়ের অনেক নেতা-কর্মী ও সমর্থক ধারণা করেছিলেন, প্রাদেশিক সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা হলে খাইবার পাখতুনখোয়ায় ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। কেউ রাজপথে বিক্ষোভের কথা বলেছিলেন, কেউ প্রশাসনিক অচলাবস্থার আশঙ্কা করেছিলেন। এমনকি মন্ত্রীরা দায়িত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন, প্রাদেশিক পুলিশের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংঘাত হতে পারে—এমন সম্ভাবনাও আলোচনায় ছিল।
বাস্তবে কিছু বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক উত্তেজনার খবর পাওয়া গেলেও সামগ্রিক ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত বড় ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। এই ব্যবধান শুধু পিটিআইয়ের সাংগঠনিক অবস্থাই নয়, পাকিস্তানের রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা, জনসমর্থন ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যকার সম্পর্কও বুঝতে সাহায্য করে।
জনপ্রিয়তা আর আন্দোলন এক জিনিস নয়

রাজনৈতিক অসন্তোষ থাকলেই তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণআন্দোলনে রূপ নেয় না। কোনো ব্যক্তি সরকারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হতে পারেন, কোনো এলাকার মানুষও একই কারণে অসন্তুষ্ট হতে পারেন। এমনকি কোনো গোত্র বা সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যেও একই মনোভাব তৈরি হতে পারে। কিন্তু এসব বিচ্ছিন্ন অসন্তোষকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করতে প্রয়োজন সংগঠন, নেতৃত্ব, সমন্বয় ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য।
এখানেই পিটিআইয়ের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইমরান খানকে ঘিরে দলটির বিপুল জনপ্রিয়তা থাকলেও তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই সমর্থনকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে দলটি সমস্যায় পড়েছে। পিটিআই একসময় বংশানুক্রমিক রাজনীতির বিকল্প হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দলটির রাজনীতি একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আরও বেশি আবর্তিত হয়েছে।
ইমরান খানের প্রতি সমর্থন আর দলের অন্য নেতাদের প্রতি আনুগত্য যে এক নয়, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তা বোঝা গেছে। কোনো রাজনৈতিক নেতার আহ্বানে মানুষ কতটা সাড়া দেবে, তা নির্ভর করে তাঁর নিজের গ্রহণযোগ্যতার ওপরও। ইমরান খানকে রক্ষার আহ্বান এবং কোনো প্রাদেশিক নেতার ক্ষমতা রক্ষার আহ্বান সমান প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অর্থাৎ, একজন নেতার জনপ্রিয়তাকে পুরো দলের সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল। নির্বাচনে ভোট পাওয়া এবং সরকার রক্ষার জন্য দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক সক্ষমতার বিষয়।
নেতৃত্বের বিভক্তি আন্দোলনকে দুর্বল করে
পিটিআইয়ের ভেতরের বিভক্তিও বড় ধরনের গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে। দলটির নেতৃত্ব বিভিন্ন প্রভাববলয়ে বিভক্ত। সাবেক ও সদ্য ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রীদের অনুসারী, ইমরান খানের বোন ও স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয়, জাতীয় ও প্রাদেশিক নেতৃত্বের বিভিন্ন অংশ—সব মিলিয়ে দলটির মধ্যে একাধিক কেন্দ্র তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া দলীয় পদধারীদের মধ্যেও মতবিরোধ ও টানাপোড়েনের খবর রয়েছে। পাঞ্জাবে পিটিআইয়ের নেতাদের তুলনামূলক নীরবতাও প্রশ্ন তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দলের এই সাংগঠনিক দুর্বলতার দায় ইমরান খানের নেতৃত্বের ওপরও বর্তাতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে বিভক্তি বজায় থাকলে দলের কেন্দ্রে তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। তবে এটি তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা মাত্র, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। কারণ যা-ই হোক, ফলাফল হলো—বিপুল জনসমর্থনের দাবি থাকা সত্ত্বেও পিটিআই একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি।
নির্বাচনী জয় মানেই পুরো জনগণের সমর্থন নয়
২০২৪ সালের নির্বাচন পিটিআইয়ের প্রতি ভোটারদের শক্তিশালী সমর্থনের প্রমাণ দিয়েছিল। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুলসংখ্যক আসনে জয়ী হন। কিন্তু আসনসংখ্যা দিয়ে কোনো অঞ্চলের সামগ্রিক জনমত পরিমাপ করা যায় না।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীরা মোট ভোটের আনুমানিক ৪৫ শতাংশ পেয়েছিলেন বলে একটি হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। একই হিসাবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পেয়েছিল প্রায় ১৮ শতাংশ। তবে এই সংখ্যাগুলো সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ও ভোটের হিসাবের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে মূল বিষয় হলো, কোনো দল আসনের বড় অংশ জিতলেই ধরে নেওয়া যায় না যে পুরো প্রদেশ তার পক্ষে। যারা অন্য দলকে ভোট দিয়েছেন, তাঁরা সবাই পিটিআইয়ের বিরোধী নন। আবার তাঁদের ভোটকে পিটিআইয়ের প্রতি সমর্থন হিসেবেও গণ্য করা যায় না। আসনসংখ্যার আধিপত্য এবং জনমতের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব এক বিষয় নয়।
সংবিধান ও আইনি পথের প্রতি আস্থা
জনপ্রতিরোধ না হওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সংবিধান ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের মনোভাবের মধ্যে রয়েছে। পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও সাংবিধানিক পদ্ধতি ও আইনের শাসনের ধারণার প্রতি একধরনের গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে।
ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনাটি রাষ্ট্রপতির ঘোষণা ও সংসদীয় অনুমোদনের মতো আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এই আনুষ্ঠানিকতা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করে থাকতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের একাংশও রাজপথের পরিবর্তে আইনি প্রতিকারের পথকে উপযুক্ত মনে করে থাকতে পারেন।
জরুরি ঘোষণার পর গ্যালাপ পাকিস্তানের পরিচালিত একটি জরিপে জনমতের বিভক্ত চিত্র উঠে আসে। জরিপে জরুরি ব্যবস্থার পক্ষে ও বিপক্ষে উল্লেখযোগ্য সমর্থন ছিল; আবার অনেকে কোনো অবস্থান জানাননি। তবে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত—এ প্রশ্নে পাকিস্তানজুড়ে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় এবং পিটিআই-সমর্থকদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা বিক্ষোভের বদলে আইনি পথ বেছে নেওয়ার পক্ষে মত দেন। জরিপের এই ফল অন্তত এটুকু ইঙ্গিত করে যে, রাজনৈতিক অসন্তোষ থাকলেও বড় আকারের রাজপথের আন্দোলনের প্রতি আগ্রহ সীমিত ছিল।
ভয়, ঝুঁকি ও রাজনৈতিক হিসাব

রাজনৈতিক আন্দোলনের সিদ্ধান্ত শুধু আদর্শ বা আবেগের ওপর নির্ভর করে না। গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও মানুষকে রাজপথে নামার আগে ভাবতে বাধ্য করে। রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ ভোটার—দুই পক্ষের জন্যই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার একটি বাস্তব মূল্য রয়েছে।
তবে শুধু দমন-পীড়নের আশঙ্কা দিয়ে পিটিআইয়ের সমর্থকদের নীরবতা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের বিভক্তি, ইমরান খানকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং আইনি পথের প্রতি তুলনামূলক সমর্থন—সবকিছু মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়।
এ ধরনের ঘটনা পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুনও নয়। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে নওয়াজ শরিফের সরকার অপসারণের পরও নির্বাচনী সমর্থনের অনুপাতে ব্যাপক জনপ্রতিরোধ দেখা যায়নি। এর আগে বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফের নির্বাচিত সরকারগুলো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনাও জনসমর্থন ও রাজপথের প্রতিরোধের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পিটিআইয়ের জনপ্রিয়তার দাবি দলটিকে এই রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে নিয়ে যায়নি।
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে বিরোধ মেটে না
পিটিআইয়ের জন্য সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার একটি শিক্ষা হলো, সংলাপ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কৌশল রাজনৈতিকভাবে সীমিত ফল দিতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধের পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ ও সমঝোতার পথ খোলা রাখা জরুরি।
অন্যদিকে, ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়াকে প্রতিষ্ঠানের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু রাজপথে বড় বিক্ষোভ না হওয়া মানেই রাজনৈতিক বিরোধের অবসান নয়। মানুষের অসন্তোষ, প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকট প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দূর করা যায় না।
পিটিআইয়ের সমর্থকদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিযোগের সমাধান করতে হলে রাজনৈতিক আলোচনার প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও নিজেদের ভূমিকা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ধরন নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ একটি সরকারের পতনের পর রাজপথ নীরব থাকলেও রাজনীতির ভেতরের দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাস থেকে যেতে পারে। সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে সাময়িক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বলে ভুল করার ঝুঁকি থাকে।












