আঞ্চলিক রাজনীতির টানাপোড়েন সামলাতে গিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান তার অর্থনৈতিক সংহতির সম্ভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারছে না। অথচ এই অঞ্চলের দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড—একটি আন্তদেশীয় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিনিময় করতে পারবে।
আসিয়ান প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র এক বছর বাকি। প্রতিবছরের মতো এবারও নভেম্বরে ফিলিপাইনে জোটের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আঞ্চলিক নেতাদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রতিযোগিতার প্রভাব সামলানো আসিয়ানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্য ক্ষেত্রগুলোকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংহতির প্রশ্নে জোটটির সামনে এখনো অনেক কাজ বাকি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি সমন্বিত বাজার গড়ে তোলার সম্ভাবনা আসিয়ানের রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা ও বাজারের আকার এ অঞ্চলে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি করে। আসিয়ান মুক্ত বাণিজ্য এলাকা প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও, একটি কার্যকর ও গভীর অর্থনৈতিক জোট গড়ার পথে অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।
এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ খাতে আন্তদেশীয় সহযোগিতা কেবল জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রকল্প নয়; এটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

আলোচনা থেকে বাস্তবায়নে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ
আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নীতিগত সমর্থন থাকলেও উদ্যোগটি এখনো প্রত্যাশিত গতি পায়নি। গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে এক বক্তব্যে মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী এবং জ্বালানি রূপান্তর ও পানি রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রী ফাদিল্লাহ ইউসুফ বলেন, এখন উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।
এর আগে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান জ্বালানিমন্ত্রীদের ৪৪তম বৈঠকেও আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। মালয়েশিয়ার দৃষ্টিতে এই বিদ্যুৎ গ্রিড শুধু অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; বরং এটি পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।
সমস্যা হলো, নীতিগত সম্মতির পর যে কঠিন কাজগুলো করতে হয়, সেগুলোতেই অগ্রগতি ধীর। বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন, নীতিমালা ও কারিগরি মান নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সমন্বয় এবং সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়গুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সিঙ্গাপুর এনার্জি ইন্টারকানেকশনের প্রধান নির্বাহী ওং তেং কুন চলতি বছরের শুরুতে কুয়ালালামপুরের এক সম্মেলনে এই বাস্তবতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য শুধু সমঝোতা ও কর্মপরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। এমন প্রকল্প চিহ্নিত করতে হবে, যেগুলো অর্থায়ন পাবে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন অর্জন করবে এবং বাস্তবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে।
অর্থাৎ, আসিয়ানের সামনে এখন প্রধান কাজ নতুন ঘোষণা দেওয়া নয়; বরং বিদ্যমান অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা।
বোর্নিও হতে পারে আঞ্চলিক গ্রিডের ভিত্তি
এই ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। সারাওয়াক ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম কালিমান্তানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করেছে। ব্রুনেইয়ের সঙ্গে একই ধরনের সংযোগ গড়ে তোলার কাজও চলছে।

এই উদ্যোগগুলো সফলভাবে সম্প্রসারিত হলে বোর্নিও দ্বীপের বিভিন্ন অংশের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ককে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এই সংযোগ বৃহত্তর আসিয়ান পাওয়ার গ্রিডের একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সারাওয়াকের নিজস্ব স্বার্থও এখানে স্পষ্ট। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকায় রাজ্যটি প্রতিবেশী বাজারে বিদ্যুৎ রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে চায়। সিঙ্গাপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ বিলম্বিত হলে উৎপাদনক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য বাজারের মধ্যে সংযোগ প্রতিষ্ঠার সুযোগও পিছিয়ে যায়।
এখানে সমস্যা শুধু কোনো একটি দেশের অনুমোদন বা একটি প্রকল্পের অগ্রগতির নয়। আন্তদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, নির্ভরযোগ্য সঞ্চালনব্যবস্থা, অভিন্ন কারিগরি মান এবং বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় দরকার। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল্য নির্ধারণ, ঝুঁকি বণ্টন এবং বিনিয়োগের নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশের বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকলেই অন্য দেশে তা সহজে সরবরাহ করা যায় না। দুই দেশের অবকাঠামো, নীতিমালা ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সামঞ্জস্য থাকতে হয়। আসিয়ান পাওয়ার গ্রিডের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই জটিল বিষয়গুলো কত দ্রুত সমাধান করা যায় তার ওপর।
বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, বাড়ছে সহযোগিতার গুরুত্ব
আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো, বিশেষ করে বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ, জ্বালানির চাহিদা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকে শুধু জাতীয় সীমানার মধ্যে উৎপাদন ও ব্যবহারের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। কোনো দেশে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত থাকতে পারে, অন্য দেশে তখন চাহিদা বেশি থাকতে পারে। কার্যকর আন্তদেশীয় গ্রিড থাকলে এই পার্থক্য কাজে লাগানো সম্ভব। এতে উৎপাদনক্ষমতার ব্যবহার বাড়তে পারে এবং এককভাবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক সংযোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সৌর ও জলবিদ্যুতের মতো উৎস থেকে উৎপাদন ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। বিভিন্ন দেশের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকলে সরবরাহের ওঠানামা সামলানো এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বৃহত্তর ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না; সঠিক পরিকল্পনা, সঞ্চালন অবকাঠামো এবং সমন্বিত পরিচালনব্যবস্থা প্রয়োজন।

আসিয়ানের জন্য মূল প্রশ্ন হলো, এই অর্থনৈতিক সুযোগগুলোকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা জোটটির রয়েছে কি না।
রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সরকারি নিশ্চয়তা দরকার
আন্তদেশীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে প্রাথমিক বিনিয়োগ বড়, প্রকল্পের মেয়াদ দীর্ঘ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তাও তুলনামূলক বেশি। একটি দেশের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, অনুমোদনে বিলম্ব কিংবা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য পুরো প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা শুধু ভবিষ্যতের চাহিদা দেখেই অর্থ বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
এখানেই আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর সরকারের ভূমিকা অপরিহার্য। আন্তদেশীয় প্রকল্পের ঝুঁকি কমাতে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য নির্ভরযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে সরকারগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি সহায়তা মানেই সব প্রকল্পের অর্থায়ন রাষ্ট্রের হাতে নেওয়া নয়। বরং নীতিগত নিশ্চয়তা, সমন্বিত নিয়মকানুন এবং বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও বাস্তববাদী হতে হবে। কোথায় বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত রয়েছে, কোন বাজারে চাহিদা বাড়ছে, কোন সংযোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং কোথায় বিনিয়োগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম—এসব বিবেচনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা দরকার। ছোট পরিসরে সফল আন্তদেশীয় সংযোগ গড়ে উঠলে সেগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক তৈরির ভিত্তি হতে পারে।
আসিয়ান পাওয়ার গ্রিডকে তাই জোটটির অর্থনৈতিক সংহতির অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এতে জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজারের মধ্যে বাস্তব নির্ভরশীলতা তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
আসিয়ানের প্রতিষ্ঠার ছয় দশক পূর্তির প্রাক্কালে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করার ক্ষমতা জোটটির সীমিত হতে পারে, কিন্তু নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে তাদের হাতে অনেক বেশি সুযোগ রয়েছে।
সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণা, মন্ত্রিসভার অঙ্গীকার এবং সহযোগিতার সমঝোতাকে বাস্তব প্রকল্পে পরিণত করতে হবে। আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড সেই সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর সাফল্য শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের নতুন পথ খুলবে না; বরং প্রমাণ করবে, আঞ্চলিক সহযোগিতা কূটনৈতিক বক্তব্যের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক জীবনেও বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।












