দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব সোমবার আরও স্পষ্ট হয়েছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের মধ্যে মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তে ৬৭০টি কারখানা বন্ধ রাখা হয়। কাজে যোগ দেননি প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক। এতে এক দিনের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। তবে এটি চূড়ান্ত লোকসানের হিসাব নয়; উৎপাদন ও রপ্তানির গড় মূল্য ধরে করা একটি আনুমানিক হিসাব।
শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব পড়েছে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার, আশুলিয়া ও ঢাকার মিরপুরের শিল্পাঞ্চলে। কোথাও শ্রমিকেরা কারখানায় কাজে যোগ না দিয়ে সড়কে অবস্থান নিয়েছেন, কোথাও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, যানবাহন ও কারখানায় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
৬৭০ কারখানা বন্ধ, কাজে অনুপস্থিত প্রায় ১৭ লাখ
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) হিসাব অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ২ হাজার ১৩৪টি পোশাক কারখানা রয়েছে। ২ নভেম্বরের পরিস্থিতিতে এসব কারখানার মধ্যে ৬৭০টি বন্ধ ছিল। চালু ছিল ১ হাজার ৪৬৪টি।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে গাজীপুর ও ময়মনসিংহে ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টির উৎপাদন বন্ধ হয়। এ দুই এলাকায় কাজে অনুপস্থিত ছিলেন ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭২ জন শ্রমিক।
সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টি বন্ধ ছিল। এসব এলাকায় কাজে যোগ দেননি ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ জন। ঢাকার মিরপুরে ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৬৫টি বন্ধ থাকায় কাজে অনুপস্থিত ছিলেন ৫৩ হাজার ৪৫০ জন শ্রমিক।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের কারখানাগুলোতে এ ধরনের উৎপাদন বিঘ্নের খবর পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে শ্রমিকের অনুপস্থিতি ও কারখানা বন্ধের ঘটনা দেশের প্রধান পোশাকশিল্প এলাকাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রমকে বড় চাপে ফেলেছে।
এক দিনের উৎপাদনমূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা
এই অচলাবস্থার আর্থিক প্রভাব বোঝার জন্য পোশাক খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয়কে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এই আয়কে ৩৬৫ দিনে ভাগ করলে দৈনিক গড় রপ্তানি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
বন্ধ কারখানার অনুপাত মোট কারখানার প্রায় ৩১ শতাংশ। সব কারখানার উৎপাদনক্ষমতা সমান ধরে এই অনুপাত প্রয়োগ করলে এক দিনের উৎপাদনমূল্য প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার হয়।
আবার পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ২ নভেম্বর কাজে অনুপস্থিত ছিলেন প্রায় ১৬ লাখ ৮১ হাজার। অর্থাৎ মোট শ্রমিকের প্রায় ৪২ শতাংশ কাজে যোগ দেননি। শ্রমিকের অনুপাত ধরে হিসাব করলে এক দিনের উৎপাদনমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
এই দুই পদ্ধতির হিসাব মিলিয়ে বলা যায়, ২ নভেম্বরের অচলাবস্থায় প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের উৎপাদনমূল্য ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতি ডলারের দাম আনুমানিক ১২২ টাকা ধরে এর পরিমাণ প্রায় ৪০০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ হিসাব ধরে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা।
তবে এই অঙ্ককে সরাসরি চূড়ান্ত আর্থিক লোকসান বলা যাবে না। কারণ বন্ধ কারখানাগুলোর কিছু উৎপাদন পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত কাজের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। আবার উৎপাদন ঘাটতির কারণে নির্ধারিত চালান পিছিয়ে গেলে বা ক্রেতার অর্ডার বাতিল হলে প্রকৃত ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। কারখানাভিত্তিক উৎপাদন, অর্ডারের মূল্য ও চালানের তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত লোকসান নির্ধারণ সম্ভব নয়।
উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি রপ্তানি সূচিতেও চাপ
পোশাক খাতের ক্ষতি শুধু এক দিনের উৎপাদনমূল্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে পণ্য তৈরি, মান যাচাই, প্যাকেজিং এবং বন্দরে পাঠানোর সময়সূচি পিছিয়ে যায়। একাধিক দিন উৎপাদন ব্যাহত হলে আগের অর্ডারের সঙ্গে নতুন অর্ডারের সময়সূচিও এলোমেলো হতে পারে।
এ সময়টি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নতুন অর্ডার দেওয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত সময়কে পরবর্তী মৌসুমের অর্ডার সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় বার্ষিক রপ্তানি অর্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে। ফলে কারখানার অস্থিরতা দীর্ঘ হলে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক হতে পারেন।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; শ্রমিকদের আয়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও বন্দরসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও পড়তে পারে।
মজুরি দাবি ও মালিকদের উদ্বেগ
শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া, খাবার ও যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে সংসার চালানো কঠিন বলে শ্রমিকদের বক্তব্য।
সরকার ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডের কাজ হবে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেওয়া। তবে বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে কারখানার মালিকেরা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপের কথা বলছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা কঠিন হবে। এতে নতুন অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ক্ষতি কমাতে দ্রুত সমঝোতা জরুরি
২ নভেম্বরের ঘটনায় সম্ভাব্য প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার উৎপাদনমূল্য ব্যাহত হওয়ার হিসাব পোশাক খাতের ওপর চাপের মাত্রা বোঝায়। তবে এই হিসাব এক দিনের গড় উৎপাদন ও রপ্তানি মূল্যনির্ভর। প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি নির্ভর করবে কত কারখানা কতক্ষণ বন্ধ ছিল, উৎপাদন কতটা পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে কি না—তার ওপর।
শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশসংক্রান্ত দাবি এবং শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা—দুই বিষয়ই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। শ্রমিকদের অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে; আবার শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নিশ্চিত না হলে শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
২ নভেম্বরের অচলাবস্থা তাই শুধু এক দিনের উৎপাদন বন্ধের ঘটনা নয়। এটি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, উৎপাদন ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২ নভেম্বরের শ্রমিক অসন্তোষে ৬৭০টি পোশাক কারখানা বন্ধ এবং প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজে অনুপস্থিত থাকায় এক দিনে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার উৎপাদনমূল্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।












