বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এখন আর শুধু বাজারদরের সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাবে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। যার ফলে প্রতি মুহূর্তে জীবনযাপনের বিভিন্ন ব্যয়কে কমাতে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, খাদ্য ও জ্বালানির বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি শুধু সাময়িক মূল্যস্ফীতি তৈরি করে না—এ ধরনের মূল্যস্ফীতির সংকটের প্রভাব একটি দেশ ও রাষ্ট্রে দীর্ঘ সময়ের জন্য চেপে বসে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব যে দীর্ঘ হতে যাচ্ছে, তা এখন স্পষ্ট। ইতোমধ্যে দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সংকোচন ও উৎপাদন হ্রাসের বিষয়টি বাড়ছে প্রতি মুহূর্তে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বা ইনইকুয়ালিটির গ্যাপটি অনেক বড় হতে চলেছে।
সম্প্রতি দারিদ্র্য নিয়ে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএমএফের নতুন একটি অর্থনৈতিক মডেল দরিদ্র পরিবারের ওপর মূল্যস্ফীতির তুলনামূলক বেশি প্রভাব হিসাব করেছে। এই মডেল অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আগের হিসাবের তুলনায় আরও প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিল। আইএমএফের গবেষণাটি সংস্থাটির আসন্ন বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের একটি অধ্যায় হিসেবে প্রকাশিত হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি কমার যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তার ভেতর থেকে যাচ্ছে একটি গাণিতিক ফাঁকি। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি কম দেখানো হচ্ছে ২০২৫ সালকে ভিত্তিবছর ধরে; অর্থাৎ, ওই বছরের অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় বর্তমান বছরে ১% থেকে ১.৫% কমছে। অন্যদিকে, রয়টার্সের প্রতিবেদনে আইএমএফের যে মডেলের কথা বলা হয়েছে, তা তৈরি হয়েছে সেই সব দেশকে মাথায় রেখে—যে দেশগুলো রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল। এবং ওই দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির মূল কারণ ধরা হয়েছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি।

কিন্তু বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, মিয়ানমার—এমন কতকগুলো দেশ রয়ে গেছে, যেখানে মূল্যস্ফীতির মূল কারণ শুধু জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নয়। তাছাড়া, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি প্রকট আকার ধারণ করেছিল। বাংলাদেশে ইউনূস অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার পরপরই মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার নেয়। আর ইউনূস ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বাস্তবে এ ধরনের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির মূল কারণ রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে। আফগানিস্তানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙেছে তালেবান জঙ্গিরা। মিয়ানমারের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার ফলে। বাংলাদেশেরও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে ফেলে ইউনূস নামক একজন এনজিও ব্যক্তি জঙ্গিদের নিয়ে মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নিয়ে স্থিতিশীল সরকারকে উৎখাত করার ভেতর দিয়ে। ইউনূসকে এই রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেশে অরাজকতা সৃষ্টিতে সহায়তা করে কয়েকটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভাঙার সবচেয়ে বড় উদাহরণ—পুলিশ হত্যার বিচার না করে তার বিপরীতে হত্যাকারীদের সুরক্ষার জন্য আইন তৈরি করা। এমনকি, সুপ্রিম কোর্টে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে বিচারকদের পদত্যাগে বাধ্য করা।
অন্যদিকে, মিয়ানমারের মতো বাংলাদেশেও শুধু একটি গোষ্ঠী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নামে একটি তথাকথিত নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে। যেহেতু নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি, তাই স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি।ফলে আফগানিস্তান, মিয়ানমারের মতো বাংলাদেশেরও প্রতি মুহূর্তে দারিদ্র্য বৃদ্ধির পথে ঢুকে যাওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।
তাছাড়া, আইএমএফের মডেলের বাইরে বেশি দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও বেশি মূল্যস্ফীতির দেশ হিসেবে বাস্তবে আফগানিস্তান ও মিয়ানমার ছাড়া এশিয়াতে বাংলাদেশ। এখানে দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতি কমার গতি শুধু ধীর হবে না, বরং বিষয়টি আরও গভীর খাদে পড়ে যেতে পারে। কারণ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানিসহ বিশ্ববাণিজ্যের যখন নতুন গতিপথ তৈরি হয়, সে সময়ে যেকোনো দেশকে খুবই সতর্কতা ও যোগ্যতার সঙ্গে নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। দেশ পরিচালনায় অধিক বেশি যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ে। সর্বোপরি, এর জন্য প্রয়োজন হয় জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীল দেশ ও আস্থাভাজন নেতৃত্ব। এ মুহূর্তে মিয়ানমারের মতো বাংলাদেশেও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের প্রধান দল আওয়ামী লীগের নেতা এ মুহূর্তে ভারতে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় আছেন। তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন, জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে। এ নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে সকলেই বুঝতে পারছেন, দেশটি একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। তাই দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই এ সময়টা ঝুঁকি ছাড়া পার করতে চাইছেন। ব্যবসায়ীদের এই নিশ্চুপতা বাংলাদেশকে আরও অর্থনৈতিক মন্থরতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
অন্যদিকে, ক্ষমতা দখলকারী এনজিও নেতা ইউনূস দেশের সামরিক ও বেসামরিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক খাতে যে আঘাত করেন, তার ফলে যেভাবে এই খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—তা এই সরকারের পক্ষে কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় বাধা। এই সরকার ইউনূসের নীতির ওপর ভর করেই চলছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। যার ফলে এ সরকার মূলত ইউনূস-২ হিসেবেই নিজেদেরকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করে ফেলেছে। তারা যেহেতু সঠিকভাবে নির্বাচিত নয়, নির্বাচনে প্রকৃত হিসাবে যেখানে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ অংশগ্রহণ করেনি। তাই জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের চরিত্র ও পথ ধরতে না পেরে তারা ইউনূসের মতোই একটি লক্ষ্যহীন পথে হাঁটছে।
এ কারণে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বাড়ার কারণ শুধুমাত্র জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং তার থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সরকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীলতার অভাব, দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালকের দক্ষতা ও দেশ পরিচালনার স্পষ্ট লক্ষ্য না থাকার ওপর নির্ভরশীল।
ইউনূস থেকে বর্তমান সরকার: মূল্যস্ফীতি মূলত একই অবস্থানে

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদেও একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় ধরনের পণ্যের দামই উঁচু ছিল। নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি জিনিসপত্রের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ২০২৬ সালের জুলাইয়ের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের ২০২৬ সালের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ ধরে নিয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় ২০২৭ সালের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে বলে বলা হয়েছে।
আইএমএফের অক্টোবরে সংশোধিত পূর্বাভাসে আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে এবং মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে থাকবে বলে জানিয়েছে। ফলে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা এখন দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কায় রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, জুলাইয়ের পর থেকে পৃথিবীর রাজনীতি ও জ্বালানি তেলের মূল্য ও গতিপথ বেশি জটিলতায় প্রবেশ করেছে। সেপ্টেম্বর থেকে আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধের আরেকটি অধ্যায় শুরু হয়েছে। এই অধ্যায়ে হুতিরা যেমন জ্বালানি তেলের অপর আরেকটি পথ রেড সি কে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে-অক্টোবরে সৌদি বিমানবন্দরে আক্রমণ করে, সৌদির আকাশপথকেও একই অবস্থায় নিয়ে গেছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শুধু নয়, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিও ইতোমধ্যে একটি জটিলতায় পড়েছে। পাকিস্তান যদি মক্কা চুক্তির পথে বেশি এগোতে যায়, তাহলে আরও জটিলতায় পড়বে। সৌদি আরব হুতিদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরে এখন পাকিস্তানের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও জ্বালানি—তিন সংকটই বাড়বে বলে সে দেশের বিশ্লেষকেরা বলছেন। এর জন্য বেশি দায়ী মক্কা চুক্তির মতো একটি ফ্রেমে যাওয়া। আর বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও বেশি জড়িয়ে ফেলেছে। মক্কা প্যাক্টে যেতে চায় বলে জানিয়েছে। তাই পাকিস্তানের ওপর যে প্রভাব পড়বে, তার কিছুটা বাংলাদেশকেও বহন করতে হতে পারে। কারণ, পাকিস্তান সৌদিতে যত নিজেকে অ্যাকটিভ করবে, ততই সে হুতি ও ইরানের টার্গেট পজিশনে পড়ে যাবে। এ সময়ে বাংলাদেশ যদি প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে এভাবে সমর্থন দিতে থাকে, তাহলে তার জ্বালানি আমদানির পথে সংকট দেখা দিতে পারে। হরমুজ ও রেড সি—দুই জায়গাতেই মক্কা প্যাক্টের দেশগুলো ও তাদের সমর্থকেরা বাধার মুখে পড়বে; ইরান ও হুতিদের যুদ্ধের অংশ হিসেবে। এ ধরনের পরিস্থিতির চাপ সহ্য করা বর্তমানের অস্থিতিশীল বাংলাদেশ ও দুর্বল অর্থনীতির জন্য খুবই কঠিন হবে। বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও জটিলতার দিকে চলে যাবে।
সর্বোপরি, যুদ্ধের এই নতুন অধ্যায়ে এসে পৃথিবীতে তেলের দাম কমার নিশ্চয়তা অনেকটা অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কারণ, তেল পরিবহনের যে ব্যয় ছিল ৩০ হাজার মার্কিন ডলার, তা এখন ১২ লাখ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যয় বাড়া ছাড়া কমার কোনো সুযোগ এ মুহূর্তের পৃথিবী দেখতে পাচ্ছে না।
তাই শুধু তেলের দামকে নিয়ন্ত্রণ করে বা তেলকেন্দ্রিক চিন্তা করে মূল্যস্ফীতি কমানো বা দেশের দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সবার আগে দরকার বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় গুড রাজনৈতিক ম্যানেজার। গ্রেট ডিল থেকে শুরু করে ওবামার আমলের রিসেশন কাটিয়ে ওঠা হয়েছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অর্থনীতিকে পরিচালিত করে। অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে নেওয়া সিদ্ধান্ত সেখানে মূল বিষয় ছিল না। আবার ইতিহাসে অনেকের কাছে নিন্দিত হলেও অ্যাডলফ হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ও জাপানের নেতৃত্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নিজ নিজ দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
এমনকি, বাংলাদেশে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট যখন সরকার গঠন করে, তখন বাংলাদেশে ভয়াবহ জ্বালানি ক্রাইসিস ছিল। পৃথিবীতে রিসেশন চলছিল। বাংলাদেশের ওই সময়ের সরকার সেটা ওভারকাম করেছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অর্থনীতি ও অর্থনীতির অংশ জ্বালানি নীতিকে পরিচালিত করে। আর নিবিড়ভাবে মনোযোগ দিয়েছিল দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর কাজে। একইভাবে ওই সরকার প্রতিবেশী সকল দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি চালু করেছিল। দেশকে কোনো গণ্ডির ভেতর রেখে শিল্প-বাণিজ্যের হাত-পা বেঁধে দেয়নি।

দারিদ্র্য ইতোমধ্যে বাড়ছে
এছাড়াও বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী,—দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ, অর্থাৎ ৬ কোটি ২০ লাখ—অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো আকস্মিক আঘাতে আবার দারিদ্র্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে যেকোনো মুহূর্তে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে এই সরকারের আমলে সরকারি হিসাবে হামে শিশু মারা গেছে ১১’শ এর বেশি। এখনও প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ জন শিশু মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন ডেঙ্গি রোগে সরকারি হিসাবে মারা যাচ্ছে গড়পড়তায় তিন থেকে চারজন। জেলা শহরগুলো বা প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসার সুযোগগুলো ভেঙে পড়েছে। তাই হামে ও ডেঙ্গিতে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের চিকিৎসার জন্য বেশির ভাগকে ঢাকায় নিয়ে আসতে হচ্ছে। ঢাকায় আনার ক্ষেত্রে অনেক পরিবারকে তাদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে হচ্ছে। স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করা থেকে প্রমাণিত হয়, দেশে একটি শ্রেণির পরিবার রোগীকে চিকিৎসা করানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
সাধারণ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য রক্ত বা অন্যান্য টেস্ট করানোর মূল্য গত মাস থেকে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যা মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপরও সরাসরি আঘাত। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক যে আকস্মিক আঘাতের কথা বলেছে, তা বাংলাদেশের জন্য ঘটে গেছে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট থেকে। দেশ আকস্মিকভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ঢুকে গেছে। একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা হয়েছিল, তা যে ভুল ছিল, সেটা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়ে গেছে। বরং দেশ অস্থিতিশীলতা থেকে এক বিন্দুও বের হয়ে আসতে পারেনি। তাই এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতাই দেশের জন্য বিশ্বব্যাংক চিহ্নিত “ যদি কোন আঘাত” হিসেবে ধরে নেওয়া এখন বাস্তবতা। যার ফলে ৬ কোটি মানুষ এখন দারিদ্র্যে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির খাদের কিনারে।
বিশ্বব্যাংক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তারা যেমন ঋণ দেয়, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ঋণের বিপরীতে লাভের চিন্তাও করে। তাই ওই প্রতিষ্ঠানের সকল সুপারিশ থাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির চিন্তার মধ্যে থেকে। যার পরিসর রাষ্ট্র পরিচালার দৃষ্টিকোন থেকে সীমিত।
বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতি কখনোই আর্থিক খাতের গণ্ডির চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হয় না। এটা সব সময়ই পরিচালিত হয় রাজনৈতিক চিন্তা দিয়ে।
বাংলাদেশ নিয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবি—এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সুপারিশের সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি ও আর্থিক খাতের সংস্কার। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যার শুরু শুধু নয়, সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে দেশ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে চলে যাওয়া এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ দুর্বল নেতৃত্বের হাতে পড়ার পর থেকেই।
এ কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তব অবস্থা পাওয়া যাবে ঠিকই। কিন্তু এর থেকে উত্তরণের পথটি খুঁজতে হবে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও যোগ্য নেতৃত্বের ভেতর। বিশ্বব্যাংক তাদের সুপারিশে ইনক্লুসিভ জিডিপির পথে দেশকে নেওয়ার কথা বলেছে। ইনক্লুসিভ জিডিপিতে দেশ তখনই যাবে, যখন ইনক্লুসিভ সোসাইটি ও ইনক্লুসিভ রাজনীতি দেশে চালু হবে। দেশের মানুষকে বিভক্ত রেখে, মানুষকে রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কোনো দেশই কখনো ইনক্লুসিভ জিডিপির পথে যেতে পারেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই ব্যতিক্রম কিছু আশা করা ভুল হবে।
লেখক: বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
( ২০ অক্টোবর India Today তে প্রকাশিত লেখার বাংলা রূপান্তরণ। India Toady এর link https://www.indiatoday.in/
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
একাত্তরে দুর্গা নয়, ইন্দিরা গান্ধী; কারাগারে চিম্ময় ও গাঁয়ের মেয়ে দুর্গা
জিএম কাদেরের বাসা আক্রমণ করার আগে তো আইএমএফের সদর দপ্তর আক্রমণ করতে হয়
সাংবাদিক আমীর খসরু: ভালোবাসাই প্রাপ্য, রাজনৈতিক তকমা নয়
মূল্যস্ফীতির ধাক্কা: সবজিওয়ালার পুঁজি থেকে করপোরেট অর্থনীতি











