গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ আর ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ এই চার মূলমন্ত্র নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৪ বছর আগে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এই মূলমন্ত্রগুলোর কোনটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যে এদেশে চালু করা হয়েছে অন্যায় শাসন। দুই দফা সরাসরি সেনা শাসন, দুই দফা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বিস্তার চলেছে ৩০ লক্ষ শহীদের আর দুই লক্ষ বীরাঙ্গনার দামে কেনা বাংলার মাটিতে। কেউ কেউ এখানে জাতীয় সংগীত বদলে দিতে চায়। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দলগুলো এবং তাদের অনুসারীরা এখনো এই বাংলায় বাহাত্তরের সংবিধান কবর দিতে চায়। প্রকাশ্যে ঔদ্ধত্য দেখায় পবিত্র সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার। আবার একাত্তরের ঘাতকদের হাতে তুলে দিয়েছে ৩০ লক্ষের রক্তে ভেজা পতাকা। এই অশুভ শক্তিগুলো বারবার আঘাত করেছে বাঙালি সংস্কৃতির উপর। অপমান, অমর্যাদা করেছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, পুরোহিত, পীর, আউলিয়া, সাধকদের। এরা প্যাগোডা, চার্চ, মন্দির, মাজার, শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন ভেঙ্গেছে; বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে বাঙালির চেতনার তীর্থস্থান, ৩২ নম্বর।
এতসব রাষ্ট্র এবং সভ্যতা বিরোধী কাজ ওরা করতে পেরেছে একটি পরাশক্তির কারণে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কাজে মার্কিন ডিপস্টেটের একাত্তরে পরাজিত এবং বর্তমানে ভিখারির দেশে পরিণত হওয়া পাকিস্তান, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, আর অধুনা যুক্ত হয়েছে তুর্কী। একাত্তরে এখানে পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকাও পরাজিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের সঙ্গে আমেরিকার দহরম-মহরম সেই একাত্তর থেকেই। বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক আমেরিকার ডিপস্টেট স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে মূলত তিনটি কারণেঃ ১) জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, ২) তৈরি পোশাক রফতানির জন্য আমেরিকার বড় হাজার, এবং ৩) সুশীল সমাজ।
জাতিসংঘের শান্তি মিশনে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যদেশের অশান্ত পরিবেশ শান্ত করার কাজ নিঃসন্দেহে বিশ্বমানবতার জন্যে হিতকর। আমাদের জন্য গৌরবের, মর্যাদার। দীর্ঘ সময় ধরে এ কাজে অন্যান্য দেশের সঙ্গে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছ থেকে সুনাম কুড়িয়েছে; প্রশিক্ষিত হয়েছে; দেশের জন্যে এনেছে বৈদেশিক মুদ্রা। শান্তি মিশনে যেতে পারা এদেশের সামরিক এবং বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সদস্যদের কাছে স্বপ্নের মত। একবার একটা মিশনে যেতে পারলে ফিরে এসে একটা বাড়ি বানানো যায়। একদিকে মর্যাদার আরেকদিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় মার্কিন ডিপস্টেট।

মার্কিন কুটনীতিতে তৈরি নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতর মূলত মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন। ২৪ সালের জুলাই জঙ্গি আন্দোলনের ঠিক পরপর জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রধান ফলকার তুর্ক বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সে কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। সে সাক্ষাৎকারে তুর্ক বলেছেন, জঙ্গিদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিতে তিনি সেনাপ্রধানকে টেলিফোন করে হুমকি দিয়েছেন। জাতিসংঘ মিশনকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা এখন অস্ত্রে পরিণত করে আমাদের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। তুর্কের সে আদেশ পালন করার পরেও শান্তি মিশনে কমেছে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। ২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাতিসংঘের শান্তি মিশনে দেশের অংশগ্রহণ কমেছে ২ হাজার জনের বেশি। মিশনে অংশগ্রহণ কমা একদিকে যেমন অলাভজনক, অগৌরবের অন্যদিকে সেখানে না গেলে তা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতা সুরক্ষা করে। মিশন থেকে বছরে যে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মত আসে তা না পেলে বাংলাদেশের এমন কিছু আসবে যাবে না। বরং বাংলাদেশের সৈন্য, পুলিশ না পেলে বিশ্ব মোড়লদের মোড়লগিরি করার সুযোগ হাতছাড়া হবে। এই সত্য আমরা কবে অনুধাবন করব?
দেশের বেশিরভাগ রফতানির গন্তব্য এখন ইউরোপ আর আমেরিকা। আমেরিকায় যায় কমবেশি ১৮ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ১০-১২ শতাংশ আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যায় ৩৫ শতাংশের মত। মোট রফতানির প্রায় ৬৫ শতাংশের গন্তব্য এই দুই মহাদেশ। বাকি দুনিয়ায় যায় আমাদের মোট রফতানির ৩৫ শতাংশের মত। বিপুল পরিমাণ রফতানি গন্তব্যের কারণে বাংলাদেশের বন্ধি হয়ে পড়েছে ইউরোপ আর আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে। তারা রফতানিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আমেরিকা তার বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য চাপ দিতে বাংলাদেশের উপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েছে। রফতানির বাজার নিশ্চিত রাখতে আরও বেশি শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়ে একটা দাসত্বের চুক্তি সই করিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়ে। অনেক বেশি দামে আমদানি করতে বাধ্য করেছে জ্বালানি তেল, গ্যাস, গম এবং অন্যান্য কৃষি পণ্য যা আমাদের দরকার নেই। মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে আমেরিকা থেকে দুই দফা চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২৫টি বোয়িং কিনতে বাধ্য করেছে। ক’দিন আগে ফেঞ্চ রাষ্ট্রদূত ঢাকায় প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন ডেকে যা বলেছেন তা সিধা কথায় এরকম – ইউরোপ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য, শুধু আমেরিকা থেকে বোয়িং কিনলে হবে না, আমাদের এয়ারবাসও কিনতে হবে। সে হুমকিতে সাড়া দিয়ে ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। মাত্র ১৯টি বিমান পরিচালনা করার সক্ষমতা সম্পন্ন বাংলাদেশের আরও ৩৫টি বিমান পরিচালনা করার সক্ষমতা নেই। তবুও, রফতানি টিকিয়ে রাখতে
এত বিমান কিনতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ।
রফতানি গন্তব্য এবং পণ্য বহুমুখী করার মাধ্যমে পশ্চিমাদের উপর কমাতে হবে বাণিজ্য নির্ভরতা। বাণিজ্য নির্ভরতা কমানোর উপায় হচ্ছে চীন, জাপান, কোরিয়া, রাশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, আফ্রিকার দেশগুলো, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজার নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করে তাদের প্রয়োজন মত পণ্যের উৎপাদন এবং সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। এ কাজ ধীর গতির, সময় সাপেক্ষ এবং সম্ভব। রফতানি বহুমুখীকরণের কথা বহু বছর ধরে বলা হলেও যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে এ কাজটি করা হয়নি। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ীদের যৌথ উদ্যোগে এ কাজটি করতে হবে। ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে পশ্চিম নির্ভরতা। পশ্চিমের কিংবা অন্য কোন একটি গোষ্ঠীর উপর নির্ভর হয়ে থাকা যাবে না।

জ্বালানির জন্য বাংলাদেশ মুখাপেক্ষী হয়ে আছে পশ্চিম এশিয়ার উপর। সৌর বিদ্যুৎ প্রযুক্তি দিন দিন উন্নত হচ্ছে। কমছে খরচ। দেশে সৌরশক্তির উৎপাদন এবং ব্যবহার বাড়ানোর জন্য সোলার প্যানেল এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির উৎপাদন নিজেদের করতে হবে। নিজেরা দক্ষ হয়ে উঠলে এ প্রযুক্তি রফতানিও করা যাবে। কমে যাবে সৌদি আরবসহ জঙ্গিবাদে, মৌলবাদে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া তুর্কী, পাকিস্তানি এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব।
শুধু একাত্তরে পরাজিত জঙ্গিবাদী, মৌলবাদী শক্তিই নয় ইঙ্গ-মার্কিন চক্রের প্রত্যক্ষ সহায়ক হচ্ছে তথাকথিত সুশীল সমাজ। কয়েকটি গণমাধ্যম এবং এনজিও এখানে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়ানকের ভূমিকা পালন করে। সমাজে এঁরা নিজেরা নিজেদের জ্ঞানী-গুণী হিসেবে পরিচয় দেয়। নিজেরা নিজেদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বলে প্রচার করে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক – সকল বিষয়ে এঁরা পশ্চিমাদের পক্ষে বয়ান তৈরি করে যা আদতে ভোগবাদ আর অশুভ রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে শক্তিশালী করে। আমেরিকা যা চায় তাই তারা প্রচার করে। এঁদের তৈরি করা বয়ানের কারণেই স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা রাজনীতি করার, এবং জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ চালিয়ে যাবার সুযোগ পায়। গণতন্ত্রের নামে এঁরা এখানে স্বাধীনতা বিরোধীদের, একাত্তরের ঘাতকদের রাজনীতি করার পথ বাতলে দেয়। মার্কিন ডলারের এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রফতানি আর জাতিসংঘ মিশনের জোরে এঁরা এতটাই শক্তিশালী যে দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলো এবং এনজিওগুলো এঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন। এঁদের কথায় চলে সামান্য জনসমর্থনের পশ্চিমের দালাল দলগুলো। এঁদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে আছে এদেশের প্রকৃত দেশপ্রেমী, জ্ঞানী, গুণী ও বিচক্ষণ মানুষেরা। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সামনে এদের অতীত ও বর্তমানের সকল কার্যক্রম তুলে ধরতে হবে। এদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে জনশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। এদের বিরুদ্ধে হবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিরোধ। অশুভ রাজনৈতিক দল পরে, আগে নির্মূল করতে হবে সুশীল সমাজ। বুদ্ধিবৃত্তির জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এদেশের প্রকৃত দেশপ্রেমী, জ্ঞানী ও গুণী মানুষদের।
রফতানি গন্তব্য ও পণ্য বহুমুখীকরণ, জাতিসংঘ মিশনের সাবধানতার সঙ্গে রাশটানা, সৌর প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের উপর নির্ভরতা কমানো এবং সুশীল সমাজ নামধারী পশ্চিমা চরদের এদেশের রাজনীতিতে অপাংতেয় করে তুলতে পারলেই কেবল অর্জন হবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা – গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ আর ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ। পশ্চিমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ৫৪ বছর চলে বাংলাদেশ যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরাও তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলছে। পৃথিবী এখন আর এক মোড়লের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্ব সমাজ এখন বহুকেন্দ্রীক। চলমান ইউক্রেন, গাজা এবং ইরানযুদ্ধেও পশ্চিমারা পরাজয়ের মুখে। ওদের টাকা আর অস্ত্রের ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমাদের দুই দিকে রয়েছে দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তি। নিরাপত্তার অজুহাতে আটলান্টিকের ওপারের দিকে তাকিয়ে থাকার দিন শেষ হয়ে গেছে। এ কথা যত দ্রুততার সঙ্গে বুঝে উঠবে বাংলাদেশ তত দ্রুততার সঙ্গে কাটবে আমাদের অমানিশি।













