দেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মত ঘোষণা হয়েছে ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি। এর আগে ষাণ্মাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হত। বাংলাদেশ অর্থনীতির এই প্রধান নীতিমালা প্রণয়েনের দ্বায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যংকের এই মুদ্রানীতিই প্রধানত একটি দেশের অর্থনীতির চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চাবিটা সঠিক ভাবে ঘোরাতে পারলে কৃষক-শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটে, না পারলে তাদের অন্ন সংস্থান কঠিন হয়ে পড়ে। পৃথিবীর তাবৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্বটি পালন করে থাকে। ষাণ্মাসিক থেকে ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি প্রণয়নের নিয়ম চালু করা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস তৈরির সক্ষমতা এবং দ্বায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা বৃদ্ধি পাবে এবং এক্ষেত্রে ভুল করার সুযোগ কমে যাবে। আগামীতে প্রতিবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের ঘোষিত মুদ্রানীতি সমূহের সাফল্য এবং ব্যর্থতার কারণসমূহ খুঁটিনাটিসহ তুলে ধরবে বলে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে। জাতীয় সংসদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কাজে মনোযোগী হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদ হার কমানো হয়নি যা দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল। সুদের হার না কমানোর কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুদ্ধগ্রস্থ পশ্চিম এশিয়া, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, উচ্চ মূল্যাস্ফীতি (৮.২৬%), সদ্য বাস্তবায়িত জাতীয় বেতন কাঠামো, বেসরকারি ঋণের নিতান্ত কম প্রবৃদ্ধি (৪.৪৭%), উচ্চ মন্দ ঋণ (৩২.৭৮%), আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ সুদ হার (~৫%), উচ্চ পর্যায়ের তারল্য প্রবৃদ্ধি (১২.৪০%), ইত্যাদিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এক কথায় বলা যায়, দেশি-বিদেশি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারণা করেছে যে সামনে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। সে বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে অধুনা ঘোষিত জাতীয় বেতন কাঠামো এবং সহসা উন্নতির প্রত্যাশা না থাকা পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি। এই দুই কারণে মূল্যস্ফীতি নিকট ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণে আসবে না বলে ধরে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দেশজুড়ে চলতে থাকা মবসন্ত্রাস, দখলবাজী, চাঁদাবাজি ও ক্রমাবনতশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে কেদ্রীয় ব্যাংক কিছুই বলেনি। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকলে কোন নীতি কাজও করে না।
সুদের হার না কমানোর কারণ হিসেবে যে সকল বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে তার কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ বছরের জুন মাসে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছালে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়ে স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে বেগবান করতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করে জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালের জন্য ঘোষিত সর্বশেষ ষাণ্মাসিক মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের সুদের হার বা নীতি সুদহার ০.৫০ শতাংশ কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করেছিল। ২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর এই প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছিল। ৩০ সেপ্টেম্বর ঘোষিত প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি সে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নীতি সুদ হার আরও কমানো হবে বলে আশা করেছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা এবং অর্থনীতি পর্যবেক্ষকেরা। জুলাই মাসে নীতি সুদহার কমানো হলেও বাড়েনি বিনিয়োগ যার সূচক বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির হার। আগস্ট মাসে সে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। ২৪ সালের জানুয়ায়ারি – জুন সময়কালে এই হারের গড় ছিল ১০.০৮ শতাংশ।

যদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্যেই সুদের হার কমানো না হয়ে থাকে তবে প্রশ্ন জাগে যে তিন মাস আগে যখন সুদের হার ০.৫০ শতাংশ কমানো হয়েছিল তখন কি মূল্যস্ফীতি কমে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল? উত্তর যে ‘না’ তা সকলের জানা। সুদের হার কমালেই কি বিনিয়োগ বাড়বে? এ প্রশ্নের উত্তরও এই সময়ের প্রেক্ষিতে নেতিবাচক। চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অরাজকতার সময়ে সুদের হার কমালেও বিনিয়োগ বেড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না। যতদিন অরাজকতা বন্ধ না হবে ততদিন অর্থনীতির চাকা আগের মত ঘুরবে না। তবুও, সুদের হার কমালে কিছুটা হলেও বিনিয়োগের পালে হাওয়া লাগত। কিছুটা হলেও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব হত। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার আলো উঁকি দিত।
গণমাধ্যমে দেখি অনেক অর্থনীতিবিদ উচ্চ মাত্রার মন্দ ঋণকে সুদের হার না কমানোর পক্ষে দাঁড় করেন। উচ্চ মন্দ ঋণ যদি তারল্য কমিয়ে ফেলে তবে বাজারে সুদের হার বেড়ে গিয়ে সেবা ও পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি ঘটাতে পারত। কিন্তু পরিস্থিতিতো তা নয়। বর্তমান উচ্চ তারল্যের সময়ে উচ্চ মন্দ ঋণকে মূল্যস্ফীতির কারণ মনে করার কোন কারণ দেখিনা। দেশে সুদের হার বেড়েছে নীতি সুদের হার বৃদ্ধির কারণে, বাজারে অর্থ প্রবাহের সংকটের কারণে নয়। এ বছর জুন মাস শেষে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৪ লক্ষ কোটি টাকার আর মন্দ ঋণ ছিল ৬ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। মানে, ব্যাংকগুলোর আরও ৪ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সক্ষমতা ছিল, বাজারে ছিল না ঋণের চাহিদা। স্থবির অর্থনীতির কারণে মানুষ বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছে বলে কমে গেছে ঋণের চাহিদা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বর্তমান সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে কম সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেও বাড়াতে পারেনি ঋণের চাহিদা। উচ্চ মন্দ ঋণের জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারেনি – এমনটা হয়নি। তাহলে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আলোচনায় মন্দ ঋণ আসে কেন? মন্দ ঋণ অন্য সমস্যা। মন্দ ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে তা ভবিষ্যতে অনেক বড় সমস্যা সৃষ্টি করবে, এমনকি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে পারে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে সে আলোচনা সুদের হারের বা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারসহ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বেড়ে গেলে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। সে সময়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যে সুদের হার বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে তথাকথিত সুশীল সমাজ যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর এবং ড. মুহম্মদ ইউনুস সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য। তখনকার সরকার প্রথম দিকে এঁদের দাবীর প্রতি কর্ণপাত না করলেও কয়েক মাসের মধ্যে ২২ সালের মে মাসে ২২ মাস পর প্রথম সুদের হার ০.২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫ শাতাংশে উন্নীত করা হয়। তারপর ধীরে ধীরে সুদের হার বাড়াতে বাড়াতে ২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তা ১০ শতাংশে ওঠানো হয়। তখন থেকে ২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১০ শতাংশে সুদের হার স্থির থাকলেও কমেনি মূল্যস্ফীতি। এখনো তা ৮ শতাংশের উপরে। অনেক বার মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়ে গেছে ১০ শতাংশের মনস্তাত্ত্বিক বাধা। অর্জন হয়নি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্ফীতিশীলতা। লাভের অংক গুনেছে শুধু ব্যাংকারগণ। কম খেয়ে কম পড়ে উচ্চ মূল্যের দাম দিয়েছে এদেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত আর গরীব মানুষ। ১২ শতাংশ থেকে দারিদ্র্য বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। চরম দারিদ্র্য ৫.৬ শতাংশ থেকে প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯.৩৫ শতাংশ।

আহসান এইচ মনসুর, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য এবং তাদের সঙ্গে সুর মেলানো আরও কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ সঠিক ছিল না। তাদের পরামর্শের বিপরীতে বর্তমান লেখক সে সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিবন্ধ লিখে টেলিভিশন টকশোতে আলোচনা করে বলেছিলেন – সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমবে না। ২৪ সালে শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনের কারণ বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ ছিল না যে তা সুদের হার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। মূল কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ দ্রব্যমূল্য, বহুকাল ধরে চাপিয়ে রাখা ডলারের দাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এসবের সুযোগ নেয়া একদল অসাধু ব্যবসায়ীর দ্রব্যমূল্য কারসাজি। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই এদেশে জমে উঠেছিল ডিপষ্টেটের সঙ্গে তখনকার বিরোধীদের অনৈতিক ও অন্যায় খেলাধুলা যা সৃষ্টি করেছিল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা যা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে চব্বিশের আগস্ট মাসে।
চার বছরের অধিক সময় ধরে চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, নিম্ন বিনিয়োগ, নিম্ন হারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। সরকারের দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিগত অর্থ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র ২.২ শতাংশ। এই চার বছরে তিন জন গভর্ণর বাংলাদেশ অর্থনীতির কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করছেন। উচ্চ সুদের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে জোরালো ওকালতি করা ড. আহসান এইচ মনসুরও এ দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। কেউই মূল্যস্ফীতিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে আসতে পারেননি। এই না পারার কারণ তাঁরা কিংবা অন্যান্য অর্থনীতিবিদগণদের কেউই জনগণকে বলেননি যে সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত অর্থনীতির চাকা আগের মত করে ঘুরবে না, ঘুরতে পারে না। তাঁরা কেউই বলেননি যে “বাংলাদেশ শ্রীলংকা” হয়ে যাবার মত পরিস্থিতি কখনো সৃষ্টি হয়নি। উল্টো তাঁরা অসৎ রাজনীতিবিদদের অর্থনীতি নিয়ে ছড়ানো অপপ্রচারের পালে হাওয়া দিয়েছেন, এমনকি নিজেরাও অপপ্রচার করেছেন। মুদ্রানীতি ষাণ্মাসিক আর ত্রৈমাসিক যে বিরতিতেই ঘোষণা করা করা হোক না কেন মববাজী, চাঁদাবাজি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন চলতে থাকবে ততদিন পর্যন্ত কোন অর্থনৈতিক বটিকা কাজ করবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে চাই রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা – সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ কথা বলেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।











