এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। নরওয়ের নোবেল কমিটি তাঁকে সম্মান দিয়েছে শান্তি আর আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য। পুরস্কারটি এমন এক সময়ে এল, যখন বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের মুখে। বড় শক্তিগুলো নিয়ম ভাঙছে প্রকাশ্যে। শুল্ক দিয়ে মিত্রকে শাসন করা হচ্ছে। যুদ্ধ চলছে ইউরোপে, মধ্যপ্রাচ্যে, আফ্রিকায়। এই পরিস্থিতিতে একজন বিচারককে শান্তি পুরস্কার দেওয়া নিছক সম্মাননা নয়। এটি একটি অবস্থান। জোর যার মুলুক তার, এই নীতির বিরুদ্ধে নোবেল কমিটির স্পষ্ট বার্তা।
নাভি পিল্লাইয়ের জীবনটাই সেই বার্তার প্রতিচ্ছবি। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন বাসচালক। বর্ণবাদের সময় একজন অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে আইনজীবী হওয়াই ছিল লড়াই। তিনি নাটালে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজের আইন প্রতিষ্ঠান খোলেন। রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে মামলা লড়েন। রোবেন আইল্যান্ডের বন্দিদের আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার অধিকার আদায়ে তাঁর ভূমিকা ছিল। বর্ণবাদের অবসানের পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হন।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান আসে রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে। জাতিসংঘের রুয়ান্ডা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক আর পরে প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। সেখানে আকায়েসু মামলার রায় আন্তর্জাতিক আইনে ইতিহাস গড়ে। প্রথমবারের মতো ধর্ষণকে গণহত্যার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর অর্থ, যুদ্ধে নারীর ওপর যৌন সহিংসতা আর শুধু যুদ্ধের পার্শ্বফল নয়, এটি একটি জাতিকে ধ্বংসের অস্ত্র। পরে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার। এরপর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। প্রতিটি দায়িত্বে তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অসন্তোষের মুখে পড়েছেন। মানবাধিকার হাইকমিশনার থাকার সময় শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। এ কারণে কলম্বোর সরকার তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছিল। তবু তিনি অবস্থান বদলাননি।

বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এই গল্পের তাৎপর্য অনেক গভীর। প্রথম কারণ আমাদের নিজেদের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে যে গণহত্যা আর নারীর ওপর যে ব্যাপক যৌন সহিংসতা হয়েছিল, তা দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। শীতল যুদ্ধের হিসাবে বড় শক্তিগুলো তখন চোখ বুজে ছিল। রুয়ান্ডায় নাভি পিল্লাইরা যে আইনি কাঠামো গড়ে তুলেছেন, সেটি থাকলে একাত্তরের অপরাধের বিচারের পথ হয়তো ভিন্ন হতো। বীরাঙ্গনাদের অভিজ্ঞতা যে যুদ্ধাপরাধ, এমনকি গণহত্যার অংশ, সেই স্বীকৃতি আজকের আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিষ্ঠিত। এর পেছনে আকায়েসু রায়ের অবদান অনেক।
দ্বিতীয় কারণ রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে যে নির্যাতন হয়েছে, তার বিচার চলছে দুই জায়গায়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার করা গণহত্যা মামলায়, আর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তে। মিয়ানমার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়। কিন্তু বাংলাদেশ সদস্য। রোহিঙ্গাদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অপরাধের একটি অংশ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সম্পন্ন হয়েছে। সেই যুক্তিতেই আদালত তদন্তের এখতিয়ার পেয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো একটি ছোট দেশ আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সদস্য হওয়ায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার ন্যায়বিচারের দরজা খোলা আছে। আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হলে সেই দরজাও বন্ধ হয়ে যাবে। আর তখন রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে, তা শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে, কোনো বিচার ছাড়াই।
তৃতীয় কারণ আমাদের অর্থনীতি আর নিরাপত্তা। বাংলাদেশ সামরিক বা অর্থনৈতিক পরাশক্তি নয়। আমাদের রপ্তানি টিকে আছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের ওপর। সমুদ্রসীমা বিরোধ মিটেছে আন্তর্জাতিক আদালতে। ২০১২ সালে মিয়ানমার আর ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলার রায় বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরে বিশাল এলাকার অধিকার দিয়েছে। কোনো যুদ্ধ ছাড়া, শুধু আইনের জোরে। নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা দুর্বল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ছোট আর মাঝারি দেশের। কারণ নিয়ম না থাকলে যে জয়ী হয়, সে হলো যার হাতে বেশি শক্তি।
আজকের বাস্তবতায় এই আশঙ্কা কল্পনা নয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আপিল সংস্থা বছরের পর বছর অচল। বড় অর্থনীতিগুলো শুল্ক দিয়ে বাণিজ্য চুক্তি ভাঙছে, আবার আদালতে হেরে সেই শুল্ক ফেরত দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক আর কৌঁসুলিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলো তহবিল সংকটে। গাজায় মানবিক সহায়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশ মানা হয়নি। ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে চার বছরের বেশি। এই সব কিছুর সামনে নোবেল কমিটি এমন একজনকে বেছে নিয়েছে, যিনি সারা জীবন বলেছেন, আইন সবার জন্য সমান হতে হবে।
সমালোচকেরা বলতে পারেন, একটি পুরস্কার দিয়ে বিশ্বব্যবস্থা বদলায় না। কথাটা সত্য। নোবেল শান্তি পুরস্কারের অনেক প্রাপক পরে বিতর্কিতও হয়েছেন। মিয়ানমারের অং সান সু চির উদাহরণ আমাদের খুব কাছের। ২০১৯ সালে তিনি নিজে হেগে গিয়ে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু নাভি পিল্লাইয়ের ক্ষেত্রে পুরস্কারটি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির জন্য নয়। এটি এসেছে কয়েক দশকের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে। তাঁর রায়গুলো লেখা আছে, তাঁর প্রতিবেদনগুলো নথিভুক্ত আছে। এগুলো বদলানো যায় না।
বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে শিক্ষা কী? প্রথমত, আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে আমাদের সরব থাকা দরকার। শুধু নিজেদের মামলার সময় নয়, সব সময়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর চাপ এলে, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল দুর্বল করার চেষ্টা হলে বাংলাদেশের কণ্ঠ শোনা উচিত। দ্বিতীয়ত, নিজেদের ঘরেও আইনের শাসন শক্ত করা। দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি না থাকলে বিদেশে আইনের শাসনের কথা বললে তা দুর্বল শোনায়। তৃতীয়ত, তরুণ আইনজ্ঞ তৈরি করা। আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের মামলা লড়তে আমাদের এখনো অনেকটাই বিদেশি আইনজীবীর ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক আইনের চর্চা বাড়ানো দরকার।

এই পুরস্কারের আরেকটি দিকও আছে। নাভি পিল্লাই বৈশ্বিক দক্ষিণের মানুষ, একজন নারী, আর বর্ণবাদের শিকার একটি সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা আইনজ্ঞ। আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে একটি পুরোনো অভিযোগ হলো, এটি পশ্চিমের তৈরি, পশ্চিমের স্বার্থে ব্যবহৃত। পিল্লাইয়ের জীবন দেখায়, দক্ষিণের মানুষও এই আইনের নির্মাতা হতে পারেন, আর সেই আইন দিয়ে শক্তিশালীদের প্রশ্ন করা যায়। বাংলাদেশ ২০১০ সালে রোম সংবিধি অনুসমর্থন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় খুব কম দেশ এই পথে হেঁটেছে। সেই সিদ্ধান্তের সুফল আজ রোহিঙ্গা মামলায় দেখা যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয় যুক্ত থাকা ছোট দেশের জন্য দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি। নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল সেই শক্তিকেই স্বীকৃতি দিল।
নাভি পিল্লাইয়ের সারা জীবনের কাজের মূল কথা একটাই, মানবাধিকার কারও দান নয়, এটি জন্মগত অধিকার। ডারবানের একজন বাসচালকের মেয়ে থেকে বিশ্বের শীর্ষ মানবাধিকার কর্মকর্তা হওয়ার পথে তিনি সেটাই প্রমাণ করেছেন। আইন দুর্বলের হাতিয়ার হতে পারে, যদি আইনকে রক্ষা করার মানুষ থাকে। বাংলাদেশ, যার জন্মই হয়েছে গণহত্যার মধ্য দিয়ে আর যার আজও বড় ভরসা আন্তর্জাতিক নিয়ম, এই বার্তাটি সবচেয়ে ভালো বোঝার কথা।
মতামতের আরও লেখা
তেলের দাম ১১০ ডলার: উপসাগরের আগুন কীভাবে পৌঁছায় বাংলাদেশের রান্নাঘরে
মিয়ানমারে বড় শক্তির নতুন হিসাব, রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশ 









