জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ। প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। তবু বাকি কাজ আর এগোচ্ছে না। ভারতীয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বলছে, তাদের প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিল আটকে আছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে মাঠে নির্মাণকাজ কার্যত থেমে আছে। ফলে মাদারগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এখন বকেয়া বিল আর সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে ঝুলে আছে। অথচ কেন্দ্রটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার কথা পুরো ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। বাস্তবায়ন করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, সংক্ষেপে আরপিসিএল। নির্মাণের দায়িত্বে আছে ভারতের আমারা রাজা গোষ্ঠীর অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান আফরি। কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যাবে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপকেন্দ্রে। এ জন্য প্রায় ৪৭ কিলোমিটার লম্বা সঞ্চালন লাইন টানা হচ্ছে। মাদারগঞ্জের চরাঞ্চলে গড়ে ওঠা এই প্রকল্প দেশের বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর একটি।
চলতি বছরের ১৯ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। কিন্তু অনুমোদনের পরও কাজ আবার পুরোদমে শুরু হয়নি। অর্থাৎ কাগজে বাধা কাটলেও মাঠের কাজে গতি ফেরেনি। এক মাসের বেশি সময় পার হলেও পরিস্থিতি প্রায় একই রয়ে গেছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, সংশোধনের সময় কিছু জরুরি অংশ প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে স্ট্যাটিক ভার জেনারেটর নামের একটি যন্ত্র। গ্রিডে ভোল্টেজ স্থির রাখতে এ ধরনের যন্ত্র কাজে লাগে। ঠিকাদারের দাবি, এসব অংশ বাদ গেলে মাদারগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দীর্ঘ মেয়াদে কম দক্ষ হয়ে পড়তে পারে।
সময়টা দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য সহজ নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল আর গ্যাসের দাম চড়া। আমদানি করা জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও তাই বাড়ছে। দেশের কয়েকটি অঞ্চলে লোডশেডিংও বেড়েছে। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরিতে জ্বালানি আমদানির খরচ লাগে না। একবার কেন্দ্র চালু হলে বছরের পর বছর তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ মেলে। এ কারণে প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকা একটি সৌরকেন্দ্র এভাবে আটকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কাজ যত দেরিতে শেষ হবে, তত দেরিতে এই সুফল পাবে দেশ।
প্রকল্প এলাকায় আমদানি করা সরঞ্জামের একটি অংশ এখনো বসানো হয়নি। দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকলে এসবের মান নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রকল্প এলাকার ভেতরে এখনো কিছু পরিবার বসবাস করছে। তাদের পুনর্বাসনের কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। স্থানীয় মানুষের কাছে তাই এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুতের নয়, ঘরবাড়ি আর জীবিকারও প্রশ্ন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বলছে, বিল আটকে থাকায় তাদের আর্থিক চাপ বাড়ছে। লোকবল আর যন্ত্রপাতি ধরে রাখতে প্রতিদিনই খরচ হচ্ছে তাদের। এখন প্রথম কাজ বকেয়া বিলের নিষ্পত্তি। এর সঙ্গে বাদ পড়া অংশগুলো নিয়েও কারিগরি সিদ্ধান্ত দরকার। এই দুই জট না খুললে মাদারগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প আরও পিছিয়ে যেতে পারে। আর সময় যত গড়াবে, খরচ আর ঝুঁকি দুটোই তত বাড়বে।












