সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করতে হয়েছে কয়েকটি গোষ্ঠীর চাপ আর হুমকির মুখে। দুই মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল স্বপ্নচূড়া ক্লাবের মেয়েরা। খেলার জার্সি পরে মাঠে নামার প্রস্তুতি চলছিল, তখনই খবর আসে ম্যাচ হবে না। অনেক খেলোয়াড় কান্নায় ভেঙে পড়ে। একজন অজ্ঞান হয়ে যায়। দেশের নারী ফুটবল যখন আন্তর্জাতিক সাফল্য আনছে, তখন মেয়েদের ফুটবলে বাধা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ক্লাবের অধিনায়ক দশম শ্রেণির এক ছাত্রী। সে জানিয়েছে, তাদের দলে ৪০ থেকে ৫০ জন খেলোয়াড় আছে। ম্যাচ বাতিলের পর সে সতীর্থদের সাহস দিতে চেষ্টা করেছে। তার ভাষায়, তারা হাল ছাড়বে না, পিছিয়ে আসার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ভয়ও কম নয়। কয়েকজন ধর্মীয় শিক্ষক মেয়েদের ফুটবলের বিরুদ্ধে কথা বলার পর কিছু মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। অনেক পরিবার আগে থেকেই খেলাধুলার জন্য মেয়েদের বকাঝকা করে। এর মধ্যে প্রকাশ্য হুমকি এলে অভিভাবকেরা আরও ভয় পেয়ে যান। ফলে অনেক মেয়ের খেলাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্কুল আর কলেজ পর্যায়ে মেয়েদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়া বাড়ছে। কিন্তু মফস্বলে মাঠ, পোশাক বদলানোর জায়গা আর নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধা এখনো খুব কম। এসব বাধাও অনেক মেয়েকে খেলা ছাড়তে বাধ্য করে।
অধিনায়কের প্রশ্ন সোজা। সরকার যখন নারী খেলোয়াড়দের স্বীকৃতি আর সুযোগ দিচ্ছে, তখন কেন কেউ তাদের খেলা বন্ধ করবে? এমন বাধা থাকলে মেয়েরা খেলাধুলায় এগোবে কীভাবে? খেলোয়াড়েরা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা আর সহায়তা চেয়েছে। তারা চায়, বাতিল হওয়া ম্যাচটি প্রশাসনের উপস্থিতিতে আবার আয়োজন করা হোক।
মেয়েদের ফুটবলে বাধা এই প্রথম নয়। আগেও দেশের কয়েকটি জেলায় মেয়েদের ম্যাচ ঘিরে মাঠ দখল, ভাঙচুর আর হুমকির ঘটনা ঘটেছে। অথচ বাংলাদেশের নারী দল দক্ষিণ এশিয়ার শিরোপা জিতেছে। সাবিনা খাতুন, ঋতুপর্ণা চাকমা আর মারিয়া মান্দাদের বেশির ভাগই উঠে এসেছেন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। ময়মনসিংহের কলসিন্দুর বা রাঙামাটির মাঠই ছিল তাঁদের শুরু। দিরাইয়ের মতো জায়গার মেয়েরা খেলতে না পারলে ভবিষ্যতের ঋতুপর্ণারা হারিয়ে যাবে। নারী ফুটবলারদের নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশজুড়ে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। সাফ জয়ের পর খেলোয়াড়দের ছাদখোলা বাসে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। অথচ সেই সাফল্যের পরও গ্রামের মাঠে মেয়েদের খেলা নিয়ে বাধা থামেনি। মেয়েদের ফুটবলে বাধা দেওয়া গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই ধর্মের দোহাই দেয়। কিন্তু অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেই মেয়েদের পেশাদার ফুটবল লিগ চলছে। স্থানীয় অভিভাবক আর জনপ্রতিনিধিদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসা দরকার। দিরাইয়ের মেয়েরা যে সাহস দেখিয়েছে, তাকে সম্মান জানাতে প্রশাসনের উপস্থিতিতে ম্যাচটি আবার আয়োজন করা যায়।
এখানে স্থানীয় প্রশাসন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা আর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সরাসরি ভূমিকা দরকার। হুমকিদাতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে অন্য জায়গাতেও একই ঘটনা ঘটবে। মেয়েদের ফুটবলে বাধা দূর করতে স্কুল পর্যায়ের টুর্নামেন্ট আর অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনাও জরুরি। একটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল ছোট ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু এর বার্তা অনেক বড়, আর সেই বার্তা থামানো রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।












