নোবেলজয়ী ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন পুরস্কার পেয়েছেন। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন নিজে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ইউনূস এ বছর এই সম্মান পাওয়া চারজনের একজন। ইউনূসের হিলারি ক্লিনটন পুরস্কার তাঁর ক্ষুদ্রঋণ আর নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ বছর পুরস্কার পাওয়া অন্যরা হলেন ভারতের সেলফ এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন বা সেওয়ার পরিচালক রীমা নানাবতী, টোরি বার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ফ্যাশন ডিজাইনার টোরি বার্চ এবং জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান। মুনা সুখতিয়ান বিশেষ জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। চারজনের কাজেরই কেন্দ্রে আছে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র আর জর্ডানের প্রাপকদের সঙ্গে একই মঞ্চে বাংলাদেশের নাম উঠে আসায় দক্ষিণ এশিয়ার নারী উদ্যোক্তা আন্দোলনও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক ইনস্টিটিউট এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। ইউনূস ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডমও পেয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি মার্কিন কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল পেয়েছেন।
পুরস্কার গ্রহণের বক্তব্যে ইউনূস বলেন, এটি তাঁদের ৫০ বছরের কাজের স্বীকৃতি। তিনি বলেন, এই আয়োজন বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবে আর গ্রামীণ পরিবারগুলোকে অনুপ্রাণিত করবে। ১৯৭০-এর দশকে চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে কয়েকজন নারীকে সামান্য ঋণ দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর ক্ষুদ্রঋণের যাত্রা। ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সালে ইউনূস আর গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের বেশির ভাগই নারী।
ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে ইউনূসের সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। আরকানসাসের গভর্নর থাকার সময় বিল ক্লিনটন সেখানে ক্ষুদ্রঋণ মডেল চালুতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। হিলারি ক্লিনটন বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে ইউনূসের কাজের প্রশংসা করেছেন। তবে দেশের রাজনীতিতে এই সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। জর্জটাউনের এই সম্মাননা নারীর নেতৃত্ব আর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী অধিকারকর্মী আর উদ্যোক্তারা আগেও এই পুরস্কার পেয়েছেন। এবারের চার প্রাপকের তিনজনই নারী, যাঁরা নিজ নিজ দেশে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছেন। সেই তালিকায় ইউনূসের হিলারি ক্লিনটন পুরস্কার পাওয়া দেখায়, গ্রামীণ মডেলের নারীকেন্দ্রিক দিকটিই এখানে মূল বিবেচনা। গ্রামীণ ব্যাংক দেশের অধিকাংশ গ্রামে কাজ করে। এর ঋণগ্রহীতাদের প্রায় সবাই নারী। ইউনূস বক্তব্যে সেই নারীদের কথাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। বিদেশের মঞ্চে পাওয়া এই সম্মান তাই শেষ পর্যন্ত জোবরা থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রারই স্বীকৃতি।
ইউনূসের হিলারি ক্লিনটন পুরস্কার এমন সময়ে এল, যখন দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে আর ক্ষুদ্রঋণ খাত নিয়েও নতুন আলোচনা চলছে। ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য কমাতে কতটা কার্যকর, সুদের হার কতটা ন্যায্য, এসব বিতর্ক পুরোনো। তবু গ্রামের নারীদের হাতে প্রথমবার টাকা তুলে দেওয়ার যে ধারণা, তা বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। নতুন এই সম্মান সেই পরিচয়কেই আবার সামনে আনল।












