মিয়ানমার নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা নিঃশব্দ মোড়বদল ঘটছে। এক মাসের মধ্যে দুবার যুক্তরাষ্ট্র বসেছে মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত সরকারের সঙ্গে। প্রথমবার নেপিডোতে, দ্বিতীয়বার টোকিওতে। আসিয়ান নতুন করে শান্তি উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চাইছে। জাপান চুপচাপ মধ্যস্থতার ভূমিকা নিচ্ছে। চীন বরাবরের মতো সীমান্তের দুই পাশেই প্রভাব ধরে রেখেছে। এই ব্যস্ত কূটনীতির টেবিলে একটি প্রশ্ন ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। সেটি রোহিঙ্গা প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় ভার বইছে বাংলাদেশ।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সেনা অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে। আগের ঢেউ মিলিয়ে কক্সবাজার আর ভাসানচরে এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। প্রতিবছর শিবিরে হাজার হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। আট বছরে একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায়, নিরাপদে আর মর্যাদার সঙ্গে রাখাইনে ফিরতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রতিবছর কমছে। খাদ্য রেশন কমানোর খবর এসেছে বারবার। শিবিরে মাদক, অস্ত্র আর সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধৈর্যও ফুরিয়ে আসছে। এই বাস্তবতায় মিয়ানমার নিয়ে বড় শক্তিগুলোর অগ্রাধিকার কী, তা বাংলাদেশের জন্য জীবন মরণের প্রশ্ন না হলেও খুব কাছাকাছি।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আগ্রহের কারণগুলো পরিষ্কার। প্রথমত, মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র। এগুলো মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, একজন মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি। তৃতীয়ত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মিয়ানমারের বিরল খনিজ। বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। এই খনিজের বাজারে চীনের আধিপত্য ভাঙতে চায় ওয়াশিংটন। মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চল বিরল খনিজের বড় উৎস। ফলে যে জেনারেলদের ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর একঘরে করা হয়েছিল, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা এখন মার্কিন কৌশলের অংশ। এই তিন কারণের কোনোটিতেই রোহিঙ্গা নেই।

আসিয়ানের অবস্থাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। অভ্যুত্থানের পর আসিয়ান পাঁচ দফা ঐকমত্য দিয়েছিল। সহিংসতা বন্ধ, সব পক্ষের সংলাপ, বিশেষ দূত নিয়োগ, মানবিক সহায়তা আর দূতের সফর। পাঁচ বছরে এর প্রায় কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। এখন আসিয়ান নতুন উদ্যোগ নিতে চাইছে, আর জাপানের নীরব কূটনীতির সাহায্য চাইছে। জাপান মিয়ানমারে বড় বিনিয়োগকারী। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার দীর্ঘ যোগাযোগও আছে। কিন্তু আসিয়ানের আলোচনায় রোহিঙ্গা বরাবরই পার্শ্ব বিষয়। তাদের মূল চিন্তা মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, শরণার্থীর চাপ থাইল্যান্ড সীমান্তে আর আঞ্চলিক স্থিতি। বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য নয়। ফলে সেই টেবিলে আমাদের কণ্ঠ সরাসরি পৌঁছায় না।
এর সঙ্গে আছে রাখাইনের নতুন বাস্তবতা। রাখাইনের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ রোহিঙ্গারা যে মাটিতে ফিরবে, সেখানে নেপিডোর সরকারের কর্তৃত্ব সীমিত। আরাকান আর্মি রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর সংগঠন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জটিল, অবিশ্বাসে ভরা। ফলে কেবল সেনা সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। আবার একটি অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করাও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য কঠিন। এই জটিলতা বড় শক্তিগুলো জানে। তাই তারা রোহিঙ্গা প্রশ্নকে আপাতত পাশে রেখে নিজেদের সহজ লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে।
তাহলে বাংলাদেশ কী করবে? প্রথম কথা, বড় শক্তির নতুন যোগাযোগকে শুধু আশঙ্কা হিসেবে দেখার দরকার নেই। এটি সুযোগও। যুক্তরাষ্ট্র যদি সেনা সরকারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে, তাহলে সেখানে রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব, চলাফেরার স্বাধীনতা আর নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন তোলার চ্যানেলও তৈরি হলো। ঢাকার কাজ হবে ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দেওয়া, রাখাইনে স্থিতি না এলে বিরল খনিজের সরবরাহও টেকসই হবে না। রাখাইন হয়েই যায় বঙ্গোপসাগরের পথ। চীনের কিয়াউকফিউ বন্দর আর গ্যাস পাইপলাইনও সেখানে। রাখাইন অস্থির থাকলে কারও বিনিয়োগই নিরাপদ নয়। এই যুক্তিতে রোহিঙ্গা প্রশ্নকে মানবিক বিষয় থেকে কৌশলগত বিষয়ে তুলে আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, টোকিওর সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগানো। জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। মাতারবাড়ী থেকে মেট্রোরেল, জাপানি অর্থায়ন সবখানে। সেই জাপান এখন মিয়ানমার আলোচনার আয়োজক। ঢাকার উচিত টোকিওকে স্পষ্ট করে বলা, মিয়ানমার নিয়ে যেকোনো কাঠামোয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি আলাদা এজেন্ডা হিসেবে থাকতে হবে। জাপান যদি সত্যিই আসিয়ান উদ্যোগের পেছনে নীরব শক্তি হয়, তাহলে বাংলাদেশের স্বার্থও সেখানে তুলে ধরার দায় তার আছে।

তৃতীয়ত, আঞ্চলিক কাঠামো। বাংলাদেশ এখন বিমসটেকের সভাপতি। মিয়ানমার আর থাইল্যান্ড দুই দেশই বিমসটেকের সদস্য। আসিয়ানের টেবিলে বাংলাদেশ না থাকলেও বিমসটেকের টেবিলে মিয়ানমার আছে। সেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক পাচার আর মানবপাচার নিয়ে আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রশ্ন যুক্ত করা যায়। বিমসটেককে এত দিন দুর্বল সংগঠন হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সভাপতির দায়িত্ব পেলে এজেন্ডা ঠিক করার সুযোগও আসে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়া চালু রাখা। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার করা গণহত্যা মামলা চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও রোহিঙ্গা বিতাড়নের তদন্ত করছে। বড় শক্তিগুলো যখন জান্তার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে, তখন জবাবদিহির এই পথগুলো রোহিঙ্গাদের পক্ষে থাকা কয়েকটি শক্ত খুঁটির মতো। বাংলাদেশকে এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে, প্রমাণ সংরক্ষণে সহায়তা দিতে হবে। বিচার আর প্রত্যাবাসন আলাদা বিষয় মনে হলেও দুটি একে অন্যকে শক্তি দেয়।
পঞ্চমত, ধৈর্য আর ধারাবাহিকতা। রোহিঙ্গা সংকট শিগগিরই শেষ হবে, এমন ভাবার কারণ নেই। সরকার বদলায়, বড় শক্তির অগ্রাধিকার বদলায়, কিন্তু কক্সবাজারের শিবির থেকে যায়। তাই রোহিঙ্গা নীতি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা দরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি স্থায়ী রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার সেল থাকলে প্রতিটি নতুন কূটনৈতিক মোড়ে দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্র আর মিয়ানমারের টোকিও বৈঠকের খবর এসেছে অন্যদের সূত্রে। এমন খবর বাংলাদেশ আগে জানবে, আর নিজের দাবি নিয়ে প্রস্তুত থাকবে, এটাই হওয়া উচিত।
ইতিহাসও আমাদের সতর্ক করে। ২০১৮ সালের নভেম্বর আর ২০১৯ সালের আগস্টে দুবার প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক হয়েছিল। দুবারই একজন রোহিঙ্গাও ফিরতে রাজি হয়নি। কারণ তাঁরা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা আর নিজের গ্রামে ফেরার নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন, যা মিয়ানমার দিতে রাজি ছিল না। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় একটি পরীক্ষামূলক প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনাও হয়েছিল। সেটিও আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিবারই শিক্ষা একটাই। রোহিঙ্গাদের আস্থা না পেলে কাগজের চুক্তি কাজ করে না। আর সেই আস্থা আসবে তখনই, যখন রাখাইনে তাদের অধিকার নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা থাকবে। তাই বড় শক্তিগুলোর নতুন আলোচনায় শুধু প্রত্যাবাসনের সংখ্যা নয়, প্রত্যাবাসনের শর্তও তুলতে হবে। নাগরিকত্ব আইন সংশোধন, চলাফেরার স্বাধীনতা আর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো ফেরা টেকসই হবে না। একই সঙ্গে শিবিরে শিক্ষা আর দক্ষতা প্রশিক্ষণ বাড়ানো দরকার, যাতে রোহিঙ্গা তরুণেরা হতাশা থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠী বা মাদকের দিকে না যায়।
মিয়ানমার এখন বড় শক্তিগুলোর দাবার বোর্ড। চীনের জন্য এটি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশপথ। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিরল খনিজ আর চীনকে ঠেকানোর মঞ্চ। জাপানের জন্য বিনিয়োগ আর প্রভাব। আসিয়ানের জন্য আঞ্চলিক স্থিতি। এই দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ যেন শুধু দর্শক না থাকে। ১০ লাখের বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ আর আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা সেই খেলার ফলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।












