অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন বড় চাপে। বেকার তরুণ আর শিক্ষার্থীরা আগেই শিক্ষামন্ত্রীকে সরে যেতে বাধ্য করেছেন। এবার তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চাইছেন। তাঁকে তাঁরা ডাকছেন “ভোট চোর” বলে। দিল্লিতে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করা জাভেদ নকভির মতে, এটা ভারতের রাজনীতির একটা সন্ধিক্ষণ।
যেভাবে শুরু
সূত্রপাত মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল আর তাতে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়ায়, হতাশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবরও আসে। এরপর ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের “তেলাপোকা” বলে মন্তব্য করেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। সেই মন্তব্যই উল্টো আন্দোলনের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। অপমানের শব্দটাকেই তরুণেরা নিজেদের নাম বানিয়ে নেন। তৈরি হয় নতুন দল, ককরোচ জনতা পার্টি।
আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয় ২৩ সেপ্টেম্বরের এক সংবাদ প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়, দুজন নির্বাচন কমিশনার তাঁদের প্রধানের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। লেখকের দাবি, এই নাম বাদ দেওয়ায় বিহার আর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল বিজেপির পক্ষে গেছে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অবশ্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

শক্তি প্রয়োগ কেন কঠিন
লেখকের বর্ণনায়, বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে নয়াদিল্লিতে আধাসামরিক বাহিনী, জম্মু-কাশ্মীর থেকে আনা বাহিনী, সীমান্তরক্ষী আর দিল্লি পুলিশ নামানো হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী কিছু গোষ্ঠীও রাস্তায় তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। কিন্তু লেখক মনে করেন, এবার কঠোর শক্তি প্রয়োগ সরকারের জন্য কঠিন। কারণ আন্দোলনকারীদের বড় অংশ হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ। তাঁদের ওপর গুলি চালানোর রাজনৈতিক দাম অনেক।
এখানে তিনি ২০২০ সালের সঙ্গে তুলনা টেনেছেন। নাগরিকত্ব আইনবিরোধী শাহিনবাগ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত মুসলিম নারীরা। সেটি কোভিড মহামারি আর কঠোর দমনে থেমে যায়। ছাত্রনেতা উমর খালিদ আর শারজিল ইমাম প্রায় ছয় বছর ধরে কারাগারে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিনা বিচারে আটক উমর খালিদ এ বছর আয়ারল্যান্ডভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের পুরস্কার পেয়েছেন। লেখকের মতে, নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা সত্ত্বেও এবারের তরুণদের দমন করার যুক্তি দাঁড় করানো সরকারের জন্য কঠিন হবে।
আন্দোলনের দাবি
“ভোট চুরি”র অভিযোগের শিকড় লেখক খুঁজেছেন রাহুল গান্ধীর দীর্ঘ প্রচারে। ২০২৩ সালে দুটি আইন হয়। একটিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে একজন মন্ত্রীকে রাখা হয়। আরেকটিতে নির্বাচনী দায়িত্বের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আজীবন আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয়। লেখকের মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে কমিশন সাম্প্রদায়িক প্রচার আর টাকার খেলা উপেক্ষা করেছে। তাতেও বিজেপি পায় ২৪০ আসন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ৩২টি কম।
ককরোচ জনতা পার্টির দাবিগুলোও নজর কাড়ছে। অবসরের পর কোনো প্রধান বিচারপতি রাজ্যসভার আসন নিতে পারবেন না। অযোধ্যা রায়ের লেখক বিচারপতিকে যে পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, এটা তারই ইঙ্গিত। বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করতে হবে। দলটির ভাষায়, এটা সন্ত্রাসের চেয়ে কম নয়। আইনসভায় নারীদের জন্য সংরক্ষণ ৩৩ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করতে হবে, মন্ত্রিসভাতেও অর্ধেক পদ নারীদের।

তারা সরকারঘনিষ্ঠ টিভি চ্যানেল বন্ধ, আদানি ও আম্বানি গোষ্ঠীর গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল আর সরকারপন্থী উপস্থাপকদের ব্যাংক হিসাব তদন্তও চায়। দল বদলানো সাংসদ বা বিধায়ক ২০ বছর নির্বাচন করতে বা পদে থাকতে পারবেন না, এমন প্রস্তাবও আছে। এতে কংগ্রেস কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে, কারণ দলটির অনেকে বিজেপিতে চলে গেছেন। নিজেদের তথ্য অধিকার আইনের আওতায় রাখা আর বেনামি চাঁদা না নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছে দলটি।
বিরোধীদের অনৈক্য
বামঘেঁষা তরুণ ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার নেতৃত্বে বিরোধী অনেকেই এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে আম আদমি পার্টি আর কংগ্রেস কে শিক্ষার্থীদের বেশি আপন, তা নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। লেখক এর পেছনে আগামী বছরের শুরুতে পাঞ্জাবের নির্বাচনের হিসাব দেখছেন। তাঁর মতে, অবিশ্বাসের কারণেই বিহার আর পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী জোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভারতের গণতন্ত্রের এই সংকটময় মুহূর্তে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি চলবে না। লেখকের পরামর্শ, রাহুল গান্ধী নিজের দলের চেয়ে বরং এই নতুন তরুণ আন্দোলনের ওপর বেশি ভরসা রাখতে পারেন। নেহরুর সময় থেকেই কংগ্রেসের পুরোনো সমস্যা এটাই বলে তাঁর মত।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
লেখাটি প্রকাশের আগের দিনগুলোতে দিল্লিতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ১০ অক্টোবর পুলিশ যন্তরমন্তর এলাকা ঘিরে ফেলে, কেন্দ্রীয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়, বহু মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ থাকে। মুম্বাই থেকে দিল্লিতে নামার পর উড়োজাহাজ থেকেই দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ তিন নেতাকে আটক করা হয়। আটক হন নেহা বোরা, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণসহ আরও অনেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ও পুলিশ সূত্রের বরাতে আটকের সংখ্যা দুই থেকে আড়াই হাজার বলে জানা যায়। পরদিন দিল্লির একটি আদালত এক বছর শান্তিভঙ্গ না করার শর্তে তিন নেতাকে মুক্তি দেয়। বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের “নৈরাজ্যবাদী” বলেছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। ভারত একে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভারতের কয়েকটি টিভি চ্যানেলের খবরে বলা হয়, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও পিনারাই বিজয়নসহ বিরোধী নেতারাও আটক হন। মুম্বাইয়ে প্রায় ৬০০ জনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই ধরপাকড়ের সমালোচনা করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আর সাংবাদিক সুরক্ষা সংগঠন সিপিজে আটক সাংবাদিকদের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। আন্দোলনের নেতারা মুক্তি পেয়ে আরও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে বিষয়টি শিগগির থামছে না বলেই মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই আন্দোলনের সবচেয়ে কাছের দিকটি পশ্চিমবঙ্গ। গত মে মাসে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পায়। শেষ হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের টানা ১৫ বছরের শাসন। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন নিয়ে বড় বিতর্ক হয়। বিরোধী দলগুলোর দাবি, রাজ্যে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ গেছে, যার বড় অংশ সংখ্যালঘু আর মতুয়া ভোটার। কমিশনের বক্তব্য, বাদ পড়া নামগুলো মূলত মৃত, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত ভোটারের। গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই সংশোধনের বৈধতা বহাল রাখে। সীমান্তের ওপারের রাজ্যে রাজনীতির পালাবদল আর দিল্লির রাস্তায় তরুণদের এই বিক্ষোভ, দুটোই প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের নজরে রাখার মতো। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, স্থলবন্দরের বাণিজ্য আর মানুষের যাতায়াতের বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গ হয়ে। তাই কলকাতা আর দিল্লির রাজনীতি কোন দিকে যায়, ঢাকার জন্যও তার গুরুত্ব কম নয়। ভারতের তরুণদের এই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা ছাপ ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে দেখার বিষয়, প্রতিবেশী দেশের এই অস্থিরতা সীমান্ত, বাণিজ্য আর দুই দেশের সম্পর্কে কোনো নতুন চাপ তৈরি করে কি না।
জাভেদ নকভি: পাকিস্তানের ডন পত্রিকার দিল্লি প্রতিনিধি। লেখাটি ডনে প্রকাশিত তাঁর কলাম অবলম্বনে। সর্বশেষ পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অংশটি সারাক্ষণের সংযোজন।












