২০২৬ সালের জুনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি নতুন কর ব্যবস্থার অনুমোদন দেন। নাম নতুন কর পরিচালন মডেল। এতে আলাদা আলাদা কর কর্মকর্তার জায়গায় আসছে কেন্দ্রীয়, ডিজিটাল ও “মুখহীন” ব্যবস্থা। কোন মামলা কে দেখবেন, তা ঠিক করবে অ্যালগরিদম। শুনানি হবে অনলাইনে। করদাতা জানবেন না, তাঁর ফাইল কোন কর্মকর্তার টেবিলে গেছে। কর্মকর্তাও জানবেন না, করদাতা কে।
উদ্দেশ্য একটাই, কর্মকর্তা আর করদাতার সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করা। কারণ এই সরাসরি যোগাযোগই এত দিন হয়রানি, ঘুষ আর যোগসাজশের পথ হয়ে ছিল। নতুন মডেল সেই সংস্কৃতি ভাঙার চেষ্টা।
প্রথমে এটি ছিল শুধু একটি নীতি ঘোষণা। পরে ১ জুলাই থেকে কার্যকর ২০২৬ সালের অর্থ বিলে বিক্রয় কর আইন, আয়কর অধ্যাদেশ আর শুল্ক আইন সংশোধন করে একে আইনি রূপ দেওয়া হয়। কিন্তু লাহোরের আইনের শিক্ষার্থী ও নীতি গবেষক ইমান শাহবাজ চিমার অভিযোগ, এই মুখহীন প্রক্রিয়ার জন্য করদাতার নতুন কোনো অধিকার যোগ হয়নি। আগের আপিল ব্যবস্থাই তার সব ভালো-মন্দ নিয়ে রয়ে গেছে।
সমস্যা বাস্তব, সমাধানও যুক্তিসংগত

পাকিস্তানের রাজস্ব বোর্ড একটি বড় সমস্যার কথা বলছে। ৮ হাজার ৬৯৭ জন ব্যক্তির ব্যাংকে মোট ৭৫০ বিলিয়ন রুপি জমা আছে। অথচ তাঁরা আয় দেখিয়েছেন শূন্য। লেখক মনে করেন, অ্যালগরিদম দিয়ে নিরীক্ষার জন্য করদাতা বাছাই করা এর যুক্তিসংগত জবাব।
দেশটির নাগরিক অভিযোগ পোর্টালে জমা পড়া অভিযোগগুলোও দেখায়, পুরোনো ব্যবস্থা সাধারণ করদাতাকে কতটা ভুগিয়েছে। তাই এই সংস্কারকে লেখক সত্যিকারের অগ্রগতি বলেই মানছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। একটি ব্যবসার ওপর কর ধার্য হলো, জরিমানা হলো, কিংবা পাওনা ফেরত আটকে গেল। সিদ্ধান্তটা দিল একটি নামহীন ইউনিট আর একটি অ্যালগরিদম। তখন ব্যবসায়ী কার কাছে যাবেন? ন্যায্য প্রক্রিয়া বলতে তখন কী বোঝাবে?
মুখ নেই মানেই ন্যায্য নয়
লেখকের মূল যুক্তি হলো, কর্মকর্তার ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা উধাও হয় না। তা শুধু দৃশ্যমান জায়গা থেকে অদৃশ্য জায়গায় সরে যায়। সেটা ঢুকে পড়ে ডেটা মডেলের ভেতরে, কেন্দ্রীয় ডেটা হাব যাঁরা বানিয়েছেন তাঁদের নকশার সিদ্ধান্তে। কোন তথ্যকে সন্দেহজনক ধরা হবে, কোন খাতকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হবে, এসব সিদ্ধান্ত মানুষই নেয়। শুধু তা আর চোখে পড়ে না। সামনাসামনি দুর্নীতি চোখে দেখা যায়, সাক্ষী রাখা যায়। কিন্তু অ্যালগরিদমের ভেতরের দুর্নীতি অস্বীকার করা যায়, লুকিয়েও রাখা যায়।
এর জন্য তিনি কয়েকটি সুরক্ষার কথা বলেছেন। প্রথমত, জাতীয় নিরূপণ শাখা কোনো ব্যবসার ওপর কর ধার্য করলে তার স্পষ্ট কারণ জানাতে হবে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কোন যুক্তিতে দাবি তৈরি হলো, তা এতটা বিস্তারিত হতে হবে যেন চ্যালেঞ্জ করা যায়। দ্বিতীয়ত, দ্রুত ও কার্যকর আপিলের সুযোগ থাকতে হবে। আপিলও ধাপে ধাপে মুখহীন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু আপিল যদি ধীর আর কাগজনির্ভর থাকে, আর তাতেও যদি একই তথ্যের ঘাটতি থাকে, তবে পুরোনো ব্যবস্থাই এক ধাপ ওপরে উঠে আসবে।
তৃতীয়ত, অ্যালগরিদম নিজেই যাচাইযোগ্য হতে হবে। সংসদের অর্থ কমিটির মতো স্বাধীন তদারকি সংস্থাকে তা পরীক্ষা করার সুযোগ দিতে হবে। দেখতে হবে, এটি নির্দিষ্ট খাত, শহর বা ছোট ব্যবসাকে বারবার নিশানা করছে কি না। লেখকের ভাষায়, যে অ্যালগরিদম বাইরের কেউ যাচাই করতে পারে না, তা আসলে প্রযুক্তির ছদ্মবেশে পুরোনো স্বেচ্ছাচারই।
ছোট ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়বেন

বড় কোম্পানি ডিজিটাল আর কাগজপত্রনির্ভর ব্যবস্থা সামলে নিতে পারবে। তাদের হিসাব বিভাগ আছে, আইনজীবী আছে, পরামর্শক আছে। কিন্তু যে ছোট ব্যবসায়ী ই-ফাইলিং করতেই হিমশিম খান, কিংবা যে উদ্যোক্তার হাতে টাকা কম, তাঁরা পারবেন না। নতুন কাঠামোয় মাঠপর্যায়ের শাখার কাজ করদাতাকে সহায়তা দেওয়া। সেই শাখা যদি আদায় শাখার তুলনায় কম লোকবল আর বরাদ্দ পায়, তবে সুবিধা পাবেন কেবল তাঁরাই, যাঁরা পেশাদার কর পরামর্শক রাখতে পারেন। এতে পুরোনো বৈষম্যই নতুন চেহারায় টিকে থাকবে।
লেখক কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের বিপক্ষে নন। তিনি চান স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা, এমন জবাবদিহি যা একজন মানুষ কর্মকর্তা থাকলে অন্তত চাওয়া যেত, আর আইনে নিশ্চিত করা করদাতার অধিকার। এই সুরক্ষা থাকলে সংস্কারটি সত্যিকারের আধুনিকায়ন হিসেবে মনে রাখা হবে। না থাকলে মনে রাখা হবে সেই মুহূর্ত হিসেবে, যখন স্বেচ্ছাচার আরও ভালোভাবে লুকাতে শিখেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
পাকিস্তানের এই বিতর্ক বাংলাদেশের জন্যও দূরের বিষয় নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও ধীরে ধীরে কর ব্যবস্থাকে অনলাইনে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ করবর্ষে নিয়মিত ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবাসী করদাতা ও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে কাগজে রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে, আগের করবর্ষে প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তি করদাতা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন, যা রেকর্ড। সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ, সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে।

ডিজিটাল ব্যবস্থার সুবিধাও স্পষ্ট। ই-রিটার্নে ব্যাংক হিসাব, কার্ড বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে কর পরিশোধ করা যায়। জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র আর আয়কর সনদ নামিয়ে নেওয়া যায়। কর অফিসে লাইনে দাঁড়ানো, দালালের পেছনে ঘোরা কিংবা সনদের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা, এসব কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। যাঁরা কারিগরি সমস্যায় নিবন্ধন করতে পারছেন না, তাঁরা অতিরিক্ত বা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমতি নিয়ে কাগজে রিটার্ন দিতে পারছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখনো মানুষের হাত পুরোপুরি সরিয়ে দেয়নি। কিন্তু প্রযুক্তি যত গভীরে যাবে, সিদ্ধান্তের দায় তত অস্পষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এখানেই শিক্ষণীয়। প্রযুক্তি আগে এসেছে, করদাতার অধিকার পরে আসার অপেক্ষায়।
অনলাইনে রিটার্ন নেওয়া আর অ্যালগরিদম দিয়ে কর নির্ধারণ এক জিনিস নয়। তবে পথটা একই দিকে। একদিন বাংলাদেশেও হয়তো যন্ত্রই ঠিক করবে কার রিটার্ন নিরীক্ষা হবে, কার ফেরত আটকে যাবে। তখন পাকিস্তানের এই লেখকের প্রশ্নগুলো এখানেও উঠবে। সিদ্ধান্তের কারণ জানার অধিকার থাকবে কি? আপিল দ্রুত হবে কি? যন্ত্র কাকে বারবার নিশানা করছে, তা কেউ যাচাই করতে পারবে কি? আর যে ছোট দোকানদার বা নতুন উদ্যোক্তা অনলাইনে রিটার্ন দিতেই হিমশিম খান, তাঁর পাশে কে দাঁড়াবে? সংস্কারের শুরুতেই এসব প্রশ্নের উত্তর আইনে লিখে রাখা গেলে, ডিজিটাল কর ব্যবস্থা সত্যিই হয়রানি কমাবে, নতুন হয়রানি তৈরি করবে না। রাজস্ব বাড়ানো জরুরি, কিন্তু করদাতার আস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়া যায় না। যন্ত্র যত দক্ষই হোক, মানুষ তখনই নিয়মিত কর দিতে আগ্রহী হয়, যখন সে জানে তার সঙ্গে ন্যায্য আচরণ হবে এবং ভুল হলে প্রতিকার পাওয়া যাবে। তাই অনলাইন ব্যবস্থার পাশাপাশি সংসদীয় নজরদারি আর স্বাধীন নিরীক্ষার পথও খোলা রাখা দরকার। তাহলে যন্ত্রের ভুল দ্রুত ধরা পড়বে, আর করদাতাও জানবেন, তাঁর কথা শোনার জায়গা আছে।
ইমান শাহবাজ চিমা: লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের আইনের শিক্ষার্থী। লিঙ্গ, এআই ও সরকারি নীতি নিয়ে গবেষণা করেন। লেখাটি পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কলাম অবলম্বনে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অংশটি সারাক্ষণের সংযোজন।












