বয়স বাড়াকে অনেকেই দুর্বলতা, অসুস্থতা ও কর্মক্ষমতা হারানোর সঙ্গে যুক্ত করেন। কিন্তু বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণকারীরা নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীদের তুলনায় গড়ে সাড়ে সাত বছর বেশি বাঁচতে পারেন। তবে এই ফলাফলকে সরাসরি কারণ-প্রমাণ হিসেবে না দেখে গবেষণায় পাওয়া একটি সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা কীভাবে প্রভাব ফেলে
বয়সের ভিত্তিতে কাউকে দুর্বল, অযোগ্য কিংবা নতুন কিছু শেখার অনুপযুক্ত মনে করাকে বয়সবাদ বলা হয়। এই বৈষম্য শুধু অন্যের আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষ নিজের বয়স সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বয়সবাদ মানুষের নিজের সম্পর্কে চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিবার, গণমাধ্যম ও সামাজিক পরিবেশ থেকে ছোটবেলা থেকেই বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। এমনকি শিশুরাও খুব অল্প বয়সে এসব ধারণা আত্মস্থ করতে পারে।
কানাডার ম্যাকমাস্টার ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন এজিংয়ের বৈজ্ঞানিক পরিচালক পারমিন্দর রায়না মনে করেন, বয়স বাড়াকে ধ্বংসাত্মক কিছু হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং মানুষের দীর্ঘায়ু আধুনিক জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় অর্জন।
নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার প্রভাব
বয়স নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা অনেক বয়স্ক মানুষকে নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান করে তুলতে পারে। এর ফলে তাঁরা নতুন কিছু শেখার সুযোগ গ্রহণে অনীহা দেখাতে পারেন, যদিও তাঁদের সেই সক্ষমতা রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে প্রচলিত ধারণার অভ্যন্তরীণ প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ, সমাজের নেতিবাচক ধারণা মানুষ নিজের সম্পর্কে বিশ্বাস করতে শুরু করলে তা তাঁর আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।
বয়সের কারণে কোনো কাজ ভালোভাবে করতে পারবেন না—এমন ধারণা থেকেও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কাউকে কোনো কাজের আগে তাঁর বয়স সম্পর্কে মনে করিয়ে দেওয়া হলে, বয়সভিত্তিক প্রচলিত ধারণার কারণে তাঁর কর্মদক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বয়স্ক মানুষদের সবাই দুর্বল বা নির্ভরশীল—এমন ধারণারও বাস্তব ভিত্তি নেই। অনেকেই দীর্ঘদিন স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করেন, কাজ করেন এবং পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। যদিও কারও কারও জটিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হতে পারে।
ইতিবাচক মনোভাব ও দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক বেকা লেভির গবেষণায় বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণার সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক বিশ্বাস পোষণকারীরা নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীদের তুলনায় গড়ে সাড়ে সাত বছর বেশি বেঁচেছেন।
বিভিন্ন দেশের গবেষণাতেও একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে বলে লেভি জানিয়েছেন।
তাঁর গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণকারীদের স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায় তুলনামূলক ভালো ফল করার প্রবণতা রয়েছে। তাঁদের মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জৈবিক সূচকের মাত্রাও কম দেখা গেছে। এ ছাড়া স্মৃতিশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ হিপোক্যাম্পাসের সংকোচনও তুলনামূলক কম হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে এসব ফলাফল থেকে শুধু ইতিবাচক চিন্তাই আয়ু বাড়ায় বা স্মৃতিশক্তি ভালো রাখে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বয়স সম্পর্কে মনোভাবের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক ও অন্যান্য বিষয়ও মানুষের সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ুকে প্রভাবিত করতে পারে।
বয়স বাড়লেও শেখার সুযোগ শেষ হয় না
বয়সের কারণে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ও চিন্তাশক্তি কমতেই থাকবে—এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন দক্ষতা শেখার সঙ্গে যুক্ত থাকা বয়স্ক মানুষের স্মৃতিশক্তির জন্য উপকারী হতে পারে।
নতুন ভাষা শেখা, ডিজিটাল আলোকচিত্র চর্চা কিংবা অন্য কোনো নতুন দক্ষতা অর্জনের মতো কার্যক্রম মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেখার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
অন্যদিকে, বয়সবাদ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং একাকিত্বের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে বয়স্ক মানুষের সুস্থতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বয়সবাদ কমাতে কী করা যেতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা বদলাতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক—দুই পর্যায়েই উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবারে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, বয়স্কদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাঁদের নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি করা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। একসঙ্গে বসবাস, পারিবারিক বন্ধন এবং শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্কও একাকিত্ব কমাতে সহায়তা করে।
বয়স নিয়ে নিজের ধারণা যাচাই করার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, বয়স সম্পর্কে নিজের বিশ্বাস ও পূর্বধারণাগুলো শনাক্ত করা; দ্বিতীয়ত, কোনো সমস্যার জন্য বয়সকে দায়ী করার আগে বৈষম্যের ভূমিকা আছে কি না, তা বিবেচনা করা; তৃতীয়ত, প্রচলিত ধারণাগুলোর সত্যতা যাচাই করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়া জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটিকে অক্ষমতার সমার্থক হিসেবে না দেখে মানুষের অভিজ্ঞতা, সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিগত সুস্থতা এবং সব বয়সের মানুষের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।












