হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে চায় নেপাল। এ লক্ষ্যে একটি আঞ্চলিক জলবায়ু সহযোগিতা কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি নেবে, বৈজ্ঞানিক তথ্য বিনিময় করবে এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করবে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘হিমালয় জলবায়ু সহনশীলতা কাঠামো’ গঠনের প্রস্তাব দেন শাহ। এর উদ্দেশ্য সীমান্ত অতিক্রমকারী দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং পরিবেশগত পরিবর্তন সম্পর্কে গবেষণা ও তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হিমালয়কে বিচ্ছিন্ন তথ্যের সীমান্ত না বানিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গবেষণাগারে পরিণত করা হোক।’ গত আগস্টে নেপালে ভয়াবহ ধস ও পলি-প্রবাহজনিত বন্যার ঘটনা স্মরণ করে তিনি এ আহ্বান জানান।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় বাধা ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ। হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্যের কারণে অতীতে যৌথ গবেষণা এবং নদীর পানিপ্রবাহ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে তাপমাত্রা
হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি। এর ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা মাটি ও শিলাস্তরের বরফ গলছে এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস, পাথরধস ও তুষারধসের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে হিমবাহের পানি জমে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ হারানোর গতি বেড়েছে। ২০০০ সালের পর বরফ হারানোর হার ১৯৭৪ থেকে ১৯৯৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।
চীনের একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের পরিচালক কাং শিচাংয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় দশকে ছিংহাই-তিব্বত মালভূমিতে হিমবাহের আয়তন ২৪ শতাংশ কমেছে। চীনের পিপলস ডেইলি অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই মালভূমিতে বর্তমানে ১৪ হাজারের বেশি হিমবাহজাত হ্রদ রয়েছে, যেগুলোর মোট আয়তন ১ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। হিমবাহের পানি থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর প্রবাহে পরিবর্তন হলে কৃষি, পানীয় জলের সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নদী অববাহিকায় বসবাসকারী কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অতীতের যৌথ উদ্যোগ থেমে গেছে
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ভারত ও চীন ২০০৯ সালে হিমালয় ও তিব্বতের হিমবাহ বিষয়ে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে ভারতের ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজি এবং চীনের কোল্ড অ্যান্ড অ্যারিড রিজিয়নস এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু উদ্যোগটি আর এগোয়নি। সংশ্লিষ্ট এক বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনা পক্ষের সঙ্গে একটি বৈঠক হলেও পরে আর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এর আগে ২০০০-এর দশকের শুরুতে হওয়া চুক্তির আওতায় চীন ব্রহ্মপুত্র ও শতদ্রু নদীর বর্ষাকালীন পানিপ্রবাহের তথ্য ভারতকে সরবরাহ করত। তিব্বত থেকে উৎপন্ন এই দুই নদীর পানি বন্যার পূর্বাভাস এবং নদী অববাহিকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং ২০২৫ সালের আগস্টে দেশটির সংসদে জানান, এ-সংক্রান্ত দুটি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের জুন থেকে ব্রহ্মপুত্রের তথ্য দেওয়া বন্ধ করে চীন। অন্যদিকে, ভারত ২০২২ সালের পর থেকে শতদ্রু নদীর কোনো তথ্য পায়নি বলে জানানো হয়।
তথ্য বিনিময় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সীমান্তের দুই পাশের নদী অববাহিকায় বন্যার ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্পর্কের উন্নতি কি নতুন সুযোগ তৈরি করবে?
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। হিমালয় অঞ্চলের কয়েকটি পথ দিয়ে সীমান্তবাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের এই পরিবর্তন জলবায়ু সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াংয়ের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভারত, চীন ও নেপালের মধ্যে জলবায়ু-সংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার পরিসর বাড়াতে পারে।
তবে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলেই তথ্য বিনিময়ের জটিলতা দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে নদীর পানিপ্রবাহ, সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করার পরামর্শ
কাঠমান্ডুভিত্তিক আইসিআইএমওডি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করছে। বন্যার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নেও সংস্থাটির ভূমিকা রয়েছে। তবে সংবেদনশীল তথ্য বিনিময় নিয়ে মতপার্থক্য আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর অগ্রগতিকে সীমিত করেছে।
সংস্থাটির সাবেক জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ অরুণ ভক্ত শ্রেষ্ঠের পরামর্শ, শুরুতেই নদীর পানিপ্রবাহের বিস্তারিত তথ্য বিনিময়ের মতো জটিল বিষয়ে না গিয়ে দেশগুলো দুর্যোগের ঝুঁকি-সংক্রান্ত তুলনামূলক কম সংবেদনশীল তথ্য ভাগাভাগি করতে পারে।
ভারতের আইআইটি মান্ডির জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের প্রধান উদয় কালা কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহজাত হ্রদগুলো যৌথভাবে চিহ্নিত করা, তথ্য বিনিময়ের ন্যূনতম নিয়ম ও পর্যবেক্ষণের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং জরুরি সতর্কবার্তা দ্রুত আদান-প্রদান নিশ্চিত করা।
নেপালের প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সীমান্তহীন সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে রাজি করানো। কারণ হিমালয়ের বরফ গলা, আকস্মিক বন্যা কিংবা ভূমিধস কোনো দেশের সীমান্ত মেনে চলে না। এসব দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলায় তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরে গিয়ে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা, নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।












