মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কেও নানা পরিবর্তন ঘটে। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় পরিবর্তন এবং ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এখন অনুসন্ধান করছেন, জীবনযাপনে পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের বার্ধক্যের গতি কমানো সম্ভব কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা শহর এ বিষয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দীর্ঘায়ু মানুষের বসবাসের জন্য পরিচিত বিশ্বের তথাকথিত ‘ব্লু জোন’-এর একটি এই শহরে। এখানকার সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট সম্প্রদায়ের অনেকে নিরামিষ খাবার খান, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, মানসিকভাবে সক্রিয় থাকেন এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখেন।
লোমা লিন্ডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গ্যারি ফ্রেজারের মতে, এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা শুধু দীর্ঘদিন বাঁচেন না, সুস্থ অবস্থায়ও তুলনামূলক বেশি সময় কাটান। নারীদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত সুস্থ জীবনকাল চার থেকে পাঁচ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় সাত বছর বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
মস্তিষ্কের বয়স জানাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
মস্তিষ্কের বার্ধক্য বোঝার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক আন্দ্রেই ইরিমিয়া চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্রায়ণ বা এমআরআই স্ক্যান, ১৫ হাজার মানুষের মস্তিষ্কের তথ্য এবং এআই ব্যবহার করে এমন কম্পিউটার মডেল তৈরি করেছেন, যা মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার ধরন বিশ্লেষণ করতে পারে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সুস্থভাবে বয়স বাড়ছে এমন মস্তিষ্কের সঙ্গে ডিমেনশিয়ার মতো রোগের প্রভাবে পরিবর্তিত মস্তিষ্কের পার্থক্য শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। মানুষের চোখে সহজে ধরা না পড়া কিছু ধরনও এআই বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করতে পারে।
বিবিসির সাংবাদিক লারা লিউইংটনের মস্তিষ্কের এমআরআই বিশ্লেষণ করে একটি মডেল তাঁর মস্তিষ্কের বয়স প্রকৃত বয়সের তুলনায় আট মাস বেশি বলে অনুমান করেছিল। তবে গবেষক জানান, এই ফলাফলে প্রায় দুই বছরের ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে আবার তাঁর মস্তিষ্কের জৈবিক বয়স এক বছর কম দেখানো হয়।
এ ধরনের পার্থক্য মনে করিয়ে দেয়, মস্তিষ্কের বয়স নির্ধারণের প্রযুক্তি এখনো নিখুঁত নয়। তবে ভবিষ্যতে ব্যক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগের আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা মূল্যায়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘুমের সঙ্গে মস্তিষ্কের সুস্থতার সম্পর্ক
মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির স্নায়ুবিজ্ঞানী ম্যাথিউ ওয়াকার। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্ক ও শরীরের সুস্থতা বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
ঘুমের সময় মস্তিষ্কের একটি পরিষ্কারকরণ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকে। এটি বিটা-অ্যামাইলয়েড ও টাউ নামের কিছু প্রোটিন অপসারণে ভূমিকা রাখে, যেগুলো আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘুমের ধরনে পরিবর্তনও ডিমেনশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন শনাক্ত করার মাধ্যমে মধ্যবয়স থেকেই ঝুঁকি মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রাণীর মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফনা বায়ো শীতনিদ্রায় থাকা স্থল কাঠবিড়ালির ওপর গবেষণা করছে। এ সময় প্রাণীগুলোর শরীরের তাপমাত্রা ও বিপাকীয় কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই অবস্থায় তাদের মস্তিষ্কের কিছু স্নায়ুকোষ পুনর্গঠিত হতে পারে এবং হারিয়ে যাওয়া সংযোগ ফিরে আসতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বুঝে ভবিষ্যতে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ওষুধ তৈরির পথ খুঁজে বের করা। তবে প্রাণীর ক্ষেত্রে দেখা প্রক্রিয়া মানুষের চিকিৎসায় কার্যকর হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিষণ্নতা ও সামাজিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় চিকিৎসা না করা বিষণ্নতার সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিয়ান উইলিয়ামস এমআরআইয়ের মাধ্যমে বিষণ্নতার কিছু ধরন মস্তিষ্কে কীভাবে প্রতিফলিত হয়, তা শনাক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। এতে চিকিৎসার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে সহায়তা মিলতে পারে।
অন্যদিকে, লোমা লিন্ডার প্রবীণ বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্ব। নিয়মিত কথোপকথন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সংগীতচর্চা ও ব্যায়ামের মতো কার্যক্রম মানুষকে মানসিকভাবে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
দীর্ঘায়ুর জন্য প্রযুক্তিই শেষ কথা নয়
প্রযুক্তি ও গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—মস্তিষ্কের সুস্থতা রক্ষায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প নেই। সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক উদ্দীপনা এবং সামাজিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের পরিবর্তন আগেভাগে শনাক্ত করতে এবং চিকিৎসাকে আরও ব্যক্তিনির্ভর করতে পারে। কিন্তু মস্তিষ্কের বয়স কমানোর কোনো নিশ্চিত পদ্ধতি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পাওয়ার লক্ষ্য অর্জনে আধুনিক গবেষণার পাশাপাশি দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।












