একসময় সামুদ্রিক খাবার রান্নায় বেশ বৈচিত্র্য ছিল ব্রিটিশদের। ঝিনুকের ককটেল, গলদা চিংড়ির ছোট পদ থেকে শুরু করে তিমির মাংসের তরকারি পর্যন্ত নানা মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর পদ জায়গা পেত তাঁদের খাবারের তালিকায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সামুদ্রিক খাবারের বৈচিত্র্য কমেছে। এখন যুক্তরাজ্যের রেসিপিতে কয়েকটি পরিচিত মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের আধিপত্য স্পষ্ট।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘গুড হাউসকিপিং’-এর ব্রিটিশ সংস্করণে ১৯২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এক হাজারের বেশি মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের রেসিপি বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের গবেষক রুথ থার্সটান।
গবেষণায় মোট ৬৭ প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া গেছে। তবে ১৯৭০-এর দশক থেকে পাঁচ ধরনের খাবার রেসিপিতে প্রাধান্য পেতে শুরু করে: কড, হ্যাডক, টুনা, স্যামন ও চিংড়ি। এখন মোট রেসিপির ৬০ শতাংশের বেশিতে এগুলোর উল্লেখ থাকে। অন্যদিকে ঝিনুক, নানা ধরনের চ্যাপ্টা মাছ ও হেরিংয়ের রেসিপি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে রান্নার অভ্যাস
রুথ থার্সটানের গবেষণায় ব্রিটিশদের সামুদ্রিক খাবার রান্নার ইতিহাসকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের আগে রেসিপিতে নানা প্রজাতির মাছের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো একটি প্রজাতি একা আধিপত্য করেনি। তবে চ্যাপ্টা মাছ, হেরিং ও ঝিনুকের ব্যবহার ছিল বেশি।
সে সময়ের রেসিপিতে গুরুত্ব পেত ঘরোয়া দক্ষতা, খরচ বাঁচানো এবং পুরো মাছ কাজে লাগানো। অর্থাৎ রান্নার অভ্যাস কয়েকটি পরিচিত মাছে আটকে ছিল না। বরং নানা ধরনের মাছ কীভাবে রান্না ও পরিবেশন করা যায়, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ছিল।
১৯৭০-এর দশকে এই চিত্র বদলাতে থাকে। মাছের প্রজাতির বৈচিত্র্য কমে, বাড়তে থাকে কড, হ্যাডক, টুনা, স্যামন ও চিংড়ির ব্যবহার। ১৯৮০-এর দশক থেকে এই পাঁচ ধরনের খাবারই বেশির ভাগ রেসিপিতে প্রাধান্য পায়। অন্য মাছ ধীরে ধীরে কমে গেলেও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
থার্সটানের মতে, ব্রিটিশরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিনের খাবারের পরিকল্পনায় প্রকাশিত রেসিপির ওপর নির্ভর করেছেন। তাই এসব রেসিপি বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে মাছ নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও খাদ্যাভ্যাস কীভাবে বদলেছে।
যুদ্ধের সময়েও ছিল খাবারে বৈচিত্র্য
১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকের রেসিপিতে ঝিনুকের ককটেল, গলদা চিংড়ির ছোট পদ এবং দুধে রান্না করা হ্যালিবাট মাছের মতো খাবারের উল্লেখ ছিল। এসব পদ সে সময়ের রান্নার বৈচিত্র্যের পরিচয় দেয়।
১৯৪০-এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে খাদ্য রেশনিং চালু ছিল। তখন দেশটির খাদ্য মন্ত্রণালয় মানুষকে মাছ ও অন্যান্য বিকল্প প্রোটিন খেতে উৎসাহ দিতে নানা রেসিপি প্রকাশ করত। এর মধ্যে তিমির মাংসের তরকারিও ছিল।
১৯৬০-এর দশকে প্লেইস মাছের ভেরোনিক পদ এবং ঠান্ডা চিংড়ির স্যুপের মতো খাবার রেসিপিতে জায়গা পায়। পরের দশকে দেখা যায় টোস্টের সঙ্গে কড মাছের ডিম আর টক ক্রিম দিয়ে টুনার কিশ। একই সময়ে টিনজাত মাছের রেসিপিও দ্রুত বাড়তে থাকে।
১৯৯০-এর দশকে ভেষজের আবরণে রান্না করা স্যামন এবং চিংড়ি ও চিনাবাদামের নুডলস জনপ্রিয় হয়। আর ২০২০-এর দশকে তালিকায় যোগ হয়েছে বিশেষ কায়দায় কেটে সোনালি করে ভাজা স্যামন, কোরীয় গোচুজাং সসে আঠালো কড এবং মিসো দিয়ে চিংড়ির শিক। অর্থাৎ রান্নার ধরন ও উপকরণ বদলেছে, কিন্তু মাছের প্রজাতিতে বৈচিত্র্য বাড়ার বদলে কয়েকটি পরিচিত খাবারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
মাছের অভাব নয়, পছন্দের পরিধিই ছোট হয়েছে
থার্সটানের মতে, রেসিপিতে বৈচিত্র্য কমার কারণ শুধু বাজারে মাছ কম পাওয়া নয়। হেরিং, ঝিনুক ও গলদা চিংড়ি এখনো কেনা যায়। তবু রেসিপিতে এগুলো কমে যাওয়া ইঙ্গিত দেয়, মানুষকে কী রান্না করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, সেই পরিধিই সংকুচিত হয়েছে।
এই পরিবর্তন যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক খাবারের বাজারেও দেখা যায়। মেরিন স্টুয়ার্ডশিপ কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে খাওয়া মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে ওই পাঁচটি জনপ্রিয় প্রজাতি বা খাবারের শ্রেণি থেকে।
এই নির্ভরতা পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন থার্সটান। তাঁর মতে, কড ও হ্যাডক ধরা এবং চিংড়ি আহরণের কিছু পদ্ধতি মূল্যবান সামুদ্রিক আবাসস্থলের ক্ষতি করতে পারে। স্যামন চাষের পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিনের উদ্বেগ আছে। ফলে কয়েকটি পরিচিত খাবারের ওপর বেশি নির্ভরতা শুধু রান্নার বৈচিত্র্য কমার বিষয় নয়, এর সঙ্গে মৎস্যসম্পদের ব্যবহার আর সমুদ্রের পরিবেশের ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত।
গবেষণাটি দেখায়, খাদ্যাভ্যাস শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ বা বাজারে পণ্য পাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। রান্নার বই, সাময়িকী আর প্রকাশিত রেসিপিও মানুষের খাবার বাছাইয়ে বড় ভূমিকা রাখে। যে রেসিপি একসময় নতুন মাছ চেখে দেখতে উৎসাহ দিত, সময়ের সঙ্গে সেখানেই কয়েকটি পরিচিত খাবারের দাপট বেড়েছে। ব্রিটিশদের সামুদ্রিক খাবারের বৈচিত্র্য হারানোর এই গল্প তাই শুধু রান্না বদলের গল্প নয়, খাদ্যসংস্কৃতি কীভাবে ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসতে পারে, তারও একটি উদাহরণ।












