আফ্রিকার হর্নের সংকটকে কেবল গৃহযুদ্ধ, জাতিগত বিরোধ কিংবা সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এই অঞ্চলের অস্থিরতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, অসম ক্ষমতাবণ্টন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বব্যবস্থার ধারাবাহিক ব্যর্থতা। ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়া, নীল নদের পানি থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা—প্রতিটি প্রশ্নই এই বৃহত্তর সংকটের সঙ্গে যুক্ত।
আফ্রিকার হর্নের ভৌগোলিক অবস্থান একে বহু শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি, অটোমান সাম্রাজ্য, শীতল যুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ এবং বর্তমান সময়ের যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই অঞ্চলটি বাইরের শক্তির আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু বিদেশি শক্তির এই দীর্ঘ উপস্থিতি স্থানীয় জনগণের জন্য স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বিরোধকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইথিওপিয়ার ইতিহাস এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি শুধু আফ্রিকার প্রাচীন রাষ্ট্রগুলোর একটি নয়; আঞ্চলিক রাজনীতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসেও এর বিশেষ অবস্থান রয়েছে। ইয়েমেন ও বর্তমান ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগাযোগ এবং শেবা রানি সম্পর্কিত ঐতিহ্য ইথিওপিয়ার পরিচয়কে বৃহত্তর অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
কিন্তু ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনো রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অবিচার থেকে রক্ষা করতে পারে না। ১৯৩৫ সালে ফ্যাসিবাদী ইতালি ইথিওপিয়া আক্রমণ করলে সম্রাট হাইলে সেলাসি লিগ অব নেশনসের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর প্রতিক্রিয়ার অভাবে সেই আবেদন কার্যত উপেক্ষিত হয়। এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থাকলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না; তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার সক্ষমতা।
ইথিওপিয়া পরে জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হয়। আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হওয়া দেশটির আঞ্চলিক গুরুত্বকে আরও দৃশ্যমান করেছে। কঙ্গো, কোরিয়া, রুয়ান্ডা ও সোমালিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ইথিওপিয়ার অংশগ্রহণও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় দেশটির ভূমিকার পরিচায়ক। অথচ আন্তর্জাতিক শান্তিতে অবদান রাখা এই রাষ্ট্র নিজেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মুখোমুখি।
সম্রাটের পতনের পর ইথিওপিয়ায় ক্ষমতায় আসে সামরিক শাসকগোষ্ঠী দের্গ। মার্ক্সবাদী আদর্শে পরিচালিত এই সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জোটের হাতে দের্গ সরকারের পতন ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় ইরিত্রিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু বিচ্ছিন্নতা ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা দীর্ঘদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করতে পারেনি।
ইথিওপিয়ার পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও মানবাধিকার লঙ্ঘন, জাতিগত সহিংসতা ও জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে আমহারা জনগোষ্ঠীকে ঘিরে সহিংসতা ও বঞ্চনার অভিযোগ দেশটির রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে রাজনৈতিক সংঘাতের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হলে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের উত্থানের সময় জাতীয় ঐক্য, পুনর্মিলন ও সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণের পথে ইথিওপিয়া এখনো বড় বাধার মুখে। ক্ষমতাসীন প্রসপারিটি পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, জাতিগত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এসব বিরোধ রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই সংকটের প্রভাব ইথিওপিয়ার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। আফ্রিকার হর্নের দেশগুলো ইতিহাস, বাণিজ্য, জনসংখ্যার চলাচল এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। একটি দেশে সংঘাত বাড়লে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও শরণার্থী প্রবাহ, সীমান্ত উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে। ফলে কোনো একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাঙনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
নীল নদের পানি নিয়ে বিরোধ এই পারস্পরিক নির্ভরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইথিওপিয়ার আবায় নদী, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্লু নাইল নামে পরিচিত, নীল নদের পানিপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে মনে করে এসেছে, নদীর পানির উৎসের বড় অংশ তার ভূখণ্ডে থাকা সত্ত্বেও সেই সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার উন্নয়নগত প্রয়োজন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নীল নদের পানি ব্যবহারের অধিকার ইথিওপিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধ বা জিইআরডি নিয়ে বিরোধ আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। অন্যদিকে মিসর নীল নদের পানিকে তার খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনগণের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য মনে করে। সুদানেরও রয়েছে নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ। ফলে সমস্যাটিকে কেবল একটি দেশের অধিকার বনাম অন্য দেশের বিরোধ হিসেবে দেখলে সমাধানের পথ সংকুচিত হবে।
প্রয়োজন এমন একটি সমঝোতা, যেখানে উজানের দেশগুলোর উন্নয়নের অধিকার এবং ভাটির দেশগুলোর পানির নিরাপত্তা—দুটিই স্বীকৃতি পাবে। তথ্যের স্বচ্ছতা, নিয়মিত আলোচনা, পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সংকট মোকাবিলায় যৌথ ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করা কঠিন। নীল নদকে স্থায়ী বিরোধের উৎস না বানিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে পরিণত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর লক্ষ্য।

একইভাবে, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। আফ্রিকার হর্নে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগকে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে সংঘাতের স্থায়ী সমাধান আরও দূরে সরে যাবে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন, পরোক্ষ সংঘাত উসকে দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক বিভাজনকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে বাইরের শক্তিগুলোর উচিত শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবেশ তৈরি করা।
এই অঞ্চলের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মূল্য দিচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কোনো বিদেশি শক্তির কৌশলগত হিসাবের অধীন হতে পারে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, জনগণের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং স্থায়ী শান্তির পরিপূরক ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
আফ্রিকার হর্নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই অঞ্চলের রাষ্ট্র ও জনগণ কতটা আন্তরিকভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পথে এগোতে পারে তার ওপর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হবে সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা, নিজেদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পরিণত করা নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ঐতিহাসিক ক্ষত স্বীকার করা হবে, অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার হবে এবং জনগণের ন্যায্য আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সুযোগ থাকবে।
আফ্রিকার হর্নের মানুষ কেবল যুদ্ধের অবসান চান না; তাঁরা চান মর্যাদা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের সুযোগ। এই লক্ষ্য অর্জনের পথ বিদেশি আধিপত্য বা সামরিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং আঞ্চলিক সংলাপ, ন্যায়সংগত সম্পদ বণ্টন এবং জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই তৈরি হতে পারে।












