রাজশাহী মানেই আম আর রেশম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজশাহী সিল্ক ছিল এই শহরের পরিচয়। কিন্তু এখন রাজশাহীর রেশম শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে আছে। দেশে যে পরিমাণ রেশম সুতা দরকার, তার সামান্য অংশই এখানে তৈরি হয়। বাকিটা আমদানি হয়, যার বড় অংশ আসে চীন থেকে। আমদানি করা সুতা বোনা সহজ, প্রক্রিয়াজাত করার খরচও কম। ফলে স্থানীয় সুতার উৎপাদন কমছে, আর কৃষকেরা রেশম চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন।
রাজশাহীর উর্বর মাটি, উষ্ণ আর আর্দ্র আবহাওয়া এবং পদ্মার পানি তুঁতগাছ আর রেশমপোকা পালনের জন্য আদর্শ। ঐতিহাসিক নথি বলছে, ১৩ শতকেই এখানে রেশম তৈরি হতো। তখন একে বলা হতো বেঙ্গল সিল্ক বা গঙ্গা সিল্ক। চীন আর মধ্য এশিয়ার সঙ্গে এর বাণিজ্য হতো। ব্রিটিশ আমলেও রাজশাহী সিল্কের মান স্বীকৃতি পায় এবং রপ্তানি হয়। এভাবেই শহরটির নাম হয় সিল্ক সিটি। রাজশাহী শহরের রেশম পণ্যের দোকানগুলোতে এখনো ক্রেতার ভিড় থাকে, বিশেষ করে উৎসবের আগে। কিন্তু খাঁটি স্থানীয় সুতার শাড়ির দাম অনেক বেশি পড়ে। তাই মিশ্র বা আমদানি করা সুতার কাপড়ই বেশি বিক্রি হয়।
আধুনিক রেশম উৎপাদন শুরু হয় ১৯৫২ সালে। রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালে, উৎপাদন শুরু ১৯৬২ সালে। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। ২০২১ সালে রাজশাহী সিল্ক ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পায়। রেশম তৈরির প্রক্রিয়া দীর্ঘ। তুঁতগাছের পাতা খেয়ে স্থানীয়ভাবে পলু পোকা নামে পরিচিত রেশমপোকা ২৫ থেকে ৩০ দিন বড় হয়। তারপর গুটি বাঁধে। সেই গুটি সেদ্ধ করে সুতা ছাড়ানো হয়। এরপর রং করে তাঁতে বোনা হয়।
এই দীর্ঘ পরিশ্রমের তুলনায় কৃষক দাম পান কম। গুটির দাম ঠিকমতো না পাওয়ায় অনেকেই তুঁতের জমিতে অন্য ফসল চাষ করছেন। স্থানীয় সুতার ঘাটতি পূরণে তাঁতিরা চীনা সুতার ওপর নির্ভর করছেন। ফলে রাজশাহীর রেশম শিল্প নাম ধরে রাখলেও এর ভেতরের উপাদান ক্রমে বিদেশি হয়ে যাচ্ছে। এটি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের মর্যাদার সঙ্গেও প্রশ্ন তোলে। চীনা সুতার শাড়ি রাজশাহী সিল্ক নামে বিক্রি হলে ক্রেতা ঠকে যান। রাজশাহীর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় একসময় সারি সারি রেশম কারখানা ছিল। এখন সেগুলোর অনেকগুলো বন্ধ, কিছু চলছে সীমিত পরিসরে। রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী রেশম কারখানাও বহু বছর লোকসানে চলার পর বন্ধ ছিল, পরে সীমিতভাবে চালু হয়। রাজশাহীর রেশম শিল্প বাঁচাতে তাঁতিরা চাইছেন স্থানীয় সুতা কেনায় প্রণোদনা আর বিদ্যুৎ বিলে ছাড়। তুঁতচাষিরা চাইছেন গুটির নির্ধারিত সরকারি ক্রয়মূল্য। একজন কৃষক যদি নিশ্চিত জানেন তাঁর গুটি ন্যায্য দামে বিক্রি হবে, তবেই তিনি আবার তুঁতগাছ লাগাবেন। নইলে ঐতিহ্যের এই শিল্প কেবল নামে টিকে থাকবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকদের গুটির ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, উন্নত জাতের রেশমপোকা দেওয়া আর সুতা তৈরির আধুনিক যন্ত্র কেনায় সহায়তা দরকার। আমদানি করা সুতার ওপর শুল্ক কাঠামো নতুন করে ভাবার দাবিও আছে। ঈদ আর পূজায় রাজশাহী সিল্কের শাড়ির চাহিদা এখনো ভালো। সেই চাহিদাকে স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে জুড়তে পারলে সিল্ক সিটি তার পুরোনো গৌরব ফিরে পেতে পারে।












