বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি আয়, রাজস্ব আদায় কিংবা বিনিয়োগের পরিসংখ্যান সামনে আসে। কিন্তু এসব সংখ্যার আড়ালে থেকে যায় আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। মানুষের আয় কি বাড়ছে? সেই আয়ে আগের মতো সংসার চালানো যাচ্ছে? সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের খরচ মেটানোর পর হাতে কিছু থাকছে? কাজের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, নাকি অনিশ্চয়তা বাড়ছে? বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার মধ্যে প্রকাশিত সংস্থাটির নতুন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস এসব প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আইএমএফ -এর হিসাবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রত্যাশিত গতিতে পুনরুদ্ধার হচ্ছে না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপও দ্রুত কমে আসার নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ একদিকে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ার গতি দুর্বল, অন্যদিকে সংসার চালানোর ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়া। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো কিছুটা সহজ হবে। প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে বড় ধাক্কা আইএমএফ প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। জুলাইয়ে পূর্বাভাস ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সংস্থাটির প্রত্যাশা আরও দুর্বল হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমতে পারে। অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসেও অর্থনীতির গতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। সরকারের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের তুলনায় এই পূর্বাভাসগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রবৃদ্ধির হার কমার অর্থ শুধু জাতীয় আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম বাড়া নয়। এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ানোর আগ্রহ কমতে পারে, নতুন বিনিয়োগ পিছিয়ে যেতে পারে। এসবের সঙ্গে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি দুর্বল থাকায় নতুন চাকরি সৃষ্টির সক্ষমতা কমে গেছে। শিক্ষিত তরুণরা দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকছে, কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়েছে। একইভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। বিক্রি কমে গেছে, ঋণের ব্যয় বেশি হচ্ছে এবং উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপে সংসারের হিসাব মিলছে না অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাজারে পণ্য কিনতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার সঙ্গে অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের ব্যবধান অনেক সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে সার্বিক ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তার সঙ্গে আইএমএফের নতুন পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে পূর্বাভাসে এত বড় পরিবর্তন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হওয়ার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। এর অর্থ, এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক ভোক্তামূল্যসূচক ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি ছিল। মূল্যস্ফীতির হার কমলেও দাম কমতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। দাম বাড়ার গতি কমতে পারে, অথচ বাজারে পণ্যের দাম আগের তুলনায় উঁচু অবস্থানেই থাকতে পারে। সাধারণ পরিবারের সংকটটি এখানেই। কয়েক বছর ধরে খাবার, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বাড়তে থাকলে পরিবারের মাসিক বাজেট ক্রমেই সংকুচিত হয়। আয় একই হারে না বাড়লে আগে যে অর্থে একটি পরিবার মাস চালাতে পারত, এখন সেই অর্থে আগের মতো চলা সম্ভব হয় না। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে তখন খাবারের পরিমাণ বা মান কমানো, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা সন্তানের শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। মধ্যবিত্ত পরিবারও সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে বাধ্য হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে ঋণ করে মাসের খরচ মেটানোর প্রবণতা বাড়ে। অর্থনীতির ভাষায় এটি প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। সাধারণ মানুষের ভাষায়, টাকা খরচ হচ্ছে বেশি, কিন্তু সেই টাকায় প্রয়োজন মিটছে কম। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির চাপ ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়ের খাত। শিল্পকারখানা, পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে জ্বালানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল গাড়ির ভাড়া বা ব্যক্তিগত যাতায়াতের খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় পণ্য পরিবহন, উৎপাদন, সেচ ও ব্যবসা পরিচালনার খরচও বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে যোগ করায় শেষ পর্যন্ত তা ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়েছে। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম বাড়ার পর মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অর্থনীতিবিদেরা। সেই আশংকায় এখন সত্যি হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয় বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় এবং দেশীয় উৎপাদন খরচ—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং উচ্চ ঋণব্যয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আইএমএফের অক্টোবরের বৈশ্বিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের সম্ভাব্য ধস, সংঘাতের বিস্তার, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি ঋণের চাপ বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা আরও জরুরি। শুধু দাম বাড়িয়ে সরবরাহব্যবস্থার ঘাটতি কিংবা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দূর করা যায় না। জ্বালানি আমদানির ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং ভোক্তার সক্ষমতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নীতি নির্ধারণ করতে হবে। রিজার্ভ বাড়লেও অর্থনীতির সমস্যা মেটেনি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক লক্ষণও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং প্রবাসী আয় সংকট পরিস্থিতি সামলাতে সহায়তা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রবাসীরা দেশে ৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার এই প্রবাহ আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামলাতে সহায়তা করে। কিন্তু রিজার্ভ বাড়া মানেই অর্থনীতির সব দুর্বলতা দূর হয়ে যাওয়া নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মূলত আন্তর্জাতিক লেনদেনের সক্ষমতা ও বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অন্যদিকে দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, ব্যাংকঋণের প্রাপ্যতা এবং মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর জন্য আলাদা পদক্ষেপ প্রয়োজন। রিজার্ভের স্বস্তি কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। তা না হলে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দুর্বল থেকে যেতে পারে। ব্যাংক খাতের সংকটের মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষক বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা এখন ব্যাংক খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ ছিল খেলাপি। এটি শুধু ব্যাংকের হিসাবের সমস্যা নয়। ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এবং সেই অর্থের বড় অংশ ঋণ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দেয়। ঋণ যথাসময়ে ফেরত না এলে ব্যাংকের অর্থ আটকে যায়। ফলে নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণ দেওয়া, ব্যবসার সম্প্রসারণে অর্থায়ন কিংবা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সুস্থ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন বাড়ানো কিংবা নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগও কমে যায়। এদিকে জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের গতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ, খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কার যেন কেবল হিসাবের খাতা পরিষ্কার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করাও তার লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিনিয়োগের স্থবিরতা বাড়াচ্ছে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। নতুন শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক উদ্যোগ গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান বাড়ে। উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি পেলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, বাজারে চাহিদা তৈরি হয় এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়। কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল থাকলে এই চক্র বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যাংকঋণের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে আসার পেছনে এসব বাস্তবতার গুরুত্ব রয়েছে। প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। এখানে সরকারের দায়িত্ব শুধু বিনিয়োগের লক্ষ্য ঘোষণা করা নয়; বরং উদ্যোক্তারা যাতে বাস্তবে বিনিয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ও স্বচ্ছ অনুমোদনব্যবস্থা, কার্যকর ব্যাংকঋণ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানের বাইরে কাজের মান ও আয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে। কোনো ব্যক্তি কাজ পেলেও সেই আয় দিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে না পারলে তার জীবনযাত্রার সংকট কাটে না। তাই কর্মসংস্থান নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনশীল, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা। আন্তর্জাতিক সহায়তার সম্ভাবনায় আছে শর্তও ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থায়ন ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় আগামী বছর বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশকে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটের অর্থায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহযোগিতা ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ঋণ বা সহায়তা পেলেই অর্থনীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরে দাঁড়াবে না। এ ধরনের সহায়তার সঙ্গে সাধারণত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং ঋণ ব্যবহারের দক্ষতার প্রশ্ন জড়িত থাকে। বাংলাদেশকে তাই শুধু অর্থায়ন পাওয়ার জন্য নয়, অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা কাটানোর জন্যও সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এই সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার চাহিদা পূরণ করা কঠিন। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের অপচয় ও অদক্ষতা কমিয়ে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তবে সংস্কারের নামে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দিলে সংকট আরও বাড়তে পারে। করব্যবস্থাকে ন্যায্য ও কার্যকর করতে হবে, যাতে যাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা বেশি, তারা যথাযথ অবদান রাখেন এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অযৌক্তিক চাপ না পড়ে। অর্থনৈতিক সংস্কারে মানুষের সুরক্ষা আগে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটাতে ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন। কিন্তু এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পেতে হবে। মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। খাদ্যসহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং প্রয়োজনীয় জনসেবা এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সহায়তা পান। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; তালিকা প্রণয়ন, বিতরণ ও তদারকির স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবায় সরকারি ব্যয় কার্যকরভাবে বাড়ানো দরকার। পরিবারের আয়ের বড় অংশ যদি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে তাদের খাদ্য, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা কমে যাবে। মানসম্মত সরকারি সেবা মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ কমিয়ে দেবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে। কোনো পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি, অস্বাভাবিক মজুত কিংবা বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব থাকলে তার প্রভাব খতিয়ে দেখতে হবে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে এমন ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, যাতে বৈধ সরবরাহ ও উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনৈতিক সংস্কারের সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করাও জরুরি। কোনো নীতির ফলে সরকারি ব্যয় কমলেও যদি দরিদ্র মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা বা শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। সংস্কারের লক্ষ্য হতে হবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি নিশ্চিত করা। সামনে কোন পথে বাংলাদেশ আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ সহজ নয়। তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সুযোগও রয়েছে। রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে অর্থায়নের পরিবেশ উন্নত হতে পারে। রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো গেলে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানও শক্তিশালী করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য মূল্যায়নের মানদণ্ড ঠিক করা। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ কিংবা রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান দিয়ে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না। দেখতে হবে, মানুষের আয় বাড়ছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা সহজ হচ্ছে কি না এবং পরিবারগুলো শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছে কি না। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ সামলাচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল যদি তাদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলবে না। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সভা থেকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটাই—আন্তর্জাতিক সহায়তা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে দেশের ভেতরে কার্যকর সংস্কার, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন বাজারের খরচ মেটাতে মানুষকে প্রতিদিন নতুন করে হিসাব কষতে হবে না, তরুণেরা কাজের সুযোগ পাবেন এবং একটি পরিবার তার আয় দিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
আকিব রহমানের আরও লেখা
বিনিয়োগ খরায় প্রবৃদ্ধির চাকা মন্থর: ব্যাংকে অলস টাকা, তবুও বিমুখ উদ্যোক্তারা
জ্বালানির দামের সমন্বয়ে অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধির নতুন ঢেউ
১৭ কোটির দেশে ১৫ লাখের বেতন বৃদ্ধি: অর্থনীতি কতটা প্রস্তুত?
আস্থার সংকটে বিনিয়োগ ঃঝুঁকিতে কর্মসংস্থান











