আকিব রহমান
চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। আয় বাড়ার তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে অনেক বেশি। বাজারে স্বস্তি ফেরেনি। এর মধ্যেই গত কয়েক মাসে তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে সরকার।
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর এক লাফে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০, অকটেন ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা। চলতি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বর—তিন দফায় মূল্য সমন্বয়ের নামে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে জ্বালানি ভেদে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা।
সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দেশের বাজারে দাম কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সরকারের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির ঘাটতি হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা।
এসব যুক্তির অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে। কিন্তু প্রশ্নটি সেখানেই শেষ নয়। বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো— এই চাপ মোকাবিলায় ভোক্তার ওপর একসঙ্গে এতটা বোঝা চাপানো ছাড়া আর কী কী পথ ছিল?
এই প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ির ট্যাংক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না। ডিজেলভিত্তিক পরিবহন, কৃষির সেচ, শিল্পের উৎপাদন, নির্মাণ, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন— সবখানেই এর প্রভাব পড়ছে। আর উৎপাদন খরচ বাড়লে সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেই যুক্ত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ানোর একটি সিদ্ধান্ত পুরো অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধির নতুন ঢেউ তৈরি করতে পারে।

তিন দফায় বড় ধাক্কা
চলতি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বড় মূল্য সমন্বয় হয় এপ্রিলে। তখন ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়ানো হয়। জুনে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে চার ধরনের জ্বালানির দাম একসঙ্গে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
ফলে এপ্রিলের আগের দামের তুলনায় ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা, পেট্রোলের ৪৪ টাকা, অকটেনের ৪৫ টাকা এবং কেরোসিনের ৪৩ টাকা।
এটি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়। ডিজেল বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিগুলোর একটি। দেশের জ্বালানি তেলের বড় অংশই ডিজেল। পরিবহন, কৃষি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এর ব্যবহার বেশি। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে তার অভিঘাত অন্য জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হয়।
অর্থাৎ ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়ার অর্থ হলো অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে একই সঙ্গে ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
একটি পণ্য কৃষকের জমি থেকে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত কতগুলো ধাপ অতিক্রম করে, তা বিবেচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়।
কৃষকের জমি প্রস্তুত করা, সেচ দেওয়া, ফসল কাটা, স্থানীয় বাজারে নেওয়া, আড়তে পাঠানো, সেখান থেকে পাইকারের মাধ্যমে শহরে আনা এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পৌঁছানো—প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি ও পরিবহনের ভূমিকা রয়েছে।
তাই ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু পাম্পে দাঁড়ানো গাড়ির চালকের খরচ নয়; এটি ধীরে ধীরে পণ্যের দামের মধ্যেও ঢুকে পড়ে।
উল্লেখ্য, দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৫৮ শতাংশ পরিবহন খাতে, ১৮ শতাংশ বিদ্যুতে, ১৫ শতাংশ কৃষিতে এবং ৬ শতাংশ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের ব্যয় সরাসরি যুক্ত।
এক দফা নয়, ‘চেইন রিঅ্যাকশন’
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর বহুমুখী প্রভাব। একটি পণ্য উৎপাদনের জন্য কৃষকের ডিজেল লাগে সেচে। সেই কৃষিপণ্য বাজারে আনতে লাগে ট্রাক। ট্রাক চালাতে ডিজেল লাগে। বাজার থেকে পণ্যটি দোকানে নিতে পরিবহন লাগে। শিল্পে কাঁচামাল আনা, উৎপাদিত পণ্য বন্দরে নেওয়া— সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি ব্যয় যুক্ত।
ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে একটি পণ্যের শুধু পরিবহন খরচ বাড়ে না; উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বেড়ে যায়।
সিপিডির সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে কৃষি, শিল্প ও পরিবহনসহ সব খাতেই ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি হয়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্য ও সেবার দামও বাড়ে।
এর বাস্তব উদাহরণও ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির পরদিনই এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে পরিবহন খাতে। ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনালে বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পরিবহনের খরচ একদিনের ব্যবধানে ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী।

অর্থাৎ জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব বাজারে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
শুধু সড়ক পরিবহন নয়, দেশের বন্দর ও অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি ব্যয় সমন্বয় করতে দেশের বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো ছয় ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় ন্যাশনাল পলিমার তাদের কিছু পণ্যের দাম ৪ থেকে ৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে, রড উৎপাদনের ব্যয় টনপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে তৈরি পোশাক পরিবহনে একটি কাভার্ড ভ্যানের খরচ ১৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৮-২০ হাজার টাকায় উঠে গেছে।
এ ধরনের ব্যয় শেষ পর্যন্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খরচের হিসাবেই যুক্ত হয়। আর ব্যবসায়ীরা সাধারণত দীর্ঘ সময় বাড়তি ব্যয় নিজের মুনাফা থেকে বহন করতে পারেন না। কোনো পর্যায়ে সেই ব্যয় পণ্যের দাম বা সেবার মূল্য বাড়ানোর মাধ্যমে ভোক্তার ওপর স্থানান্তরিত হয়।
অর্থাৎ সরকারের সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাব শুধু জ্বালানি কিনতে গিয়ে ভোক্তার বাড়তি খরচে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর দ্বিতীয় দফার প্রভাব পড়ছে খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী, পরিবহনসহ প্রায় সব পণ্যে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও দাম তো কমেনি
এখানে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে— কিন্তু মানুষের বাজার খরচ কমেনি।
এ দুটির পার্থক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ হলো পণ্যের দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে; এর অর্থ পণ্যের দাম কমে গেছে নয়।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম আবার বড় মাত্রায় বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কমানোর যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে। বরং
সরকারের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ—একদিকে বিপিসির আর্থিক চাপ সামলানো, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ ঠেকানো।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদও বলেছেন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কৃষি, পরিবহন, শিল্প ও কারখানায় পড়বে। তার মতে, মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির হার সাম্প্রতিক সময়ে কমলেও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের এই আশঙ্কার কারণ হলো কষ্ট-পুশ ইনফ্ল্যাশন বা ব্যয়-চালিত মূল্যস্ফীতি। যখন কোনো পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ে, তখন উৎপাদক বা ব্যবসায়ী সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। এই প্রক্রিয়ায় জ্বালানি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একসঙ্গে অনেক খাতের ইনপুট।
কমবে ক্রয়ক্ষমতা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পড়বে। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারগুলোর সঞ্চয় ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমতে পারে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষকে বাড়তি ব্যয় সামলাতে বেশি চাপের মুখে পড়তে হবে।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহম্মদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারও একটি শ্রেণিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়াতো। এখন সরকারও একই কাজ করছে। যখন সারা বিশ্বের সংকটের কথা বলা হচ্ছে, তখন এই সময়ে পে-স্কেল দেওয়া বা মেগা প্রকল্প কি জরুরি ছিল?
তিনি বলেন, লোকসানের নানা কথা বলা হলেও আগে যখন তেলের দাম কম ছিল, তখন বিপিসি লাভ করেছে। তাহলে এখন লোকসান হলেও সেটি দাম না বাড়িয়েও পোষানো যেতো। সব কিছু জনগণের ঘাড়ে চাপানোটা সরকারগুলোর একটি নিয়মে পরিণত হচ্ছে।
আনু মুহম্মদ বলেন, এখনই এসব করা সমুচিত হয়নি। মনে হচ্ছে, সরকার নিজেই নিজের জনপ্রিয়তা কত দ্রুত কমানো যায়, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ইমপ্যাক্ট বিবেচনা করা হচ্ছে না একেবারেই। অন্য দেশের সঙ্গে যে তুলনা করা হয়, সেটিও ঠিক নয়। কারণ অন্য দেশের তুলনায় আমাদের আয় অনেক কম।

বিপিসির লোকসান নিয়েও প্রশ্ন আছে
সরকারের সবচেয়ে বড় যুক্তি বিপিসির লোকসান। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের আগে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম অনুযায়ী দেশে ডিজেল বিক্রি করা হলে প্রতি লিটারে বিপিসির ঘাটতি প্রায় ৯০ টাকা হতো। নতুন দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণের পরও সরকারের হিসাবে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা ঘাটতি রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মূল্য অনুসরণ করলে ডিজেলের দাম প্রায় ২০৫ টাকা হতে পারত। অর্থাৎ সরকার বলছে, পুরো আন্তর্জাতিক মূল্য ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়নি। কিন্তু যে আন্তর্জাতিক বাজার মুল্যের ওপর ভিত্তি করে সরকার এই হিসাব দেয়া হচ্ছে, সেই দামে তো সরকার তেল আমদানি করেনি। তাহলে এই হিসাবের কি যৌক্তিকতা আছে? আর দাম বাড়ানোর সময় ব্যারেলপ্রতি ১৮০ থেকে ১৮২ ডলারের হিসাব সামনে আনা হচ্ছে। সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের হামলার পর দাম ওই পর্যায়ে উঠেছিল। অথচ এর আগে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম ছিল প্রায় ১৫০ ডলার। সেটি বিবেচনা করা হলো না কেন?
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিপিসি কি সবসময় লোকসানি প্রতিষ্ঠান? ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে মাত্র এক বছর বিপিসি লোকসানে ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে লোকসান হয়েছিল ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। অন্য বছরগুলোতে মুনাফা করেছে। ওই সময়ে নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ৫৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কম থাকার সময়ে বিপিসি যে বড় অঙ্কের উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এখন প্রশ্ন হলো— সেই উদ্বৃত্ত অর্থের কতটা জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছিল?
বিপিসি জানিয়েছে, গত এক দশকে তাদের মুনাফার প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয়েও অর্থ ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে আর্থিক চাপের মধ্যে বিপিসি সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রত্যাশা করছে।
এখানেই সরকারের জ্বালানি নীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে।
যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলে বিপুল মুনাফা করে এবং সেই অর্থের একটি বড় অংশ সরকারি কোষাগারে দেয়, সেই প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময়ে কেন সম্পূর্ণভাবে আর্থিকভাবে অসহায় হয়ে পড়বে?
এর একটি কারণ অবশ্যই আছে। মুনাফার পুরো অর্থ বিপিসির হাতে জমা থাকে না। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ যায়, আমদানি ব্যয় মেটাতে হয়, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লাগে এবং পরিচালন ব্যয়ও রয়েছে। বিপিসির চেয়ারম্যানের দেওয়া হিসাবে, মার্চের শুরুতে সংস্থাটির হাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা থাকলেও বিভিন্ন দায় পরিশোধের পর আমদানিতে ব্যবহারযোগ্য অর্থ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
তবু এই পরিস্থিতি একটি শিক্ষা দেয়— জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা তহবিল বা আপৎকালীন তহবিলের প্রয়োজন ছিল কি না, সেই প্রশ্নটি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে দাম সমন্বয় হতে পারে। তবে ওই ফর্মুলার কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, ভ্যাট-ট্যাক্স ও বিপিসির লাভ ধরে মূল্য নির্ধারণ করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামই থাকুক, বিপিসির জন্য একটি মার্জিন থেকে যায়। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিপিসি বছরে গড়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার মতো মুনাফা করেছে।
এই উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল গঠন করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় সেই অর্থ থেকে ভোক্তার জন্য মূল্য সমন্বয় করা যেত বলে মনে করেন তিনি।
কর-শুল্ক কমানোরও বিকল্প ছিল
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জ্বালানি তেলের ওপর কর-শুল্ক। বর্তমানে ডিজেলের আমদানি ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর-শুল্ক যুক্ত হয়। একটি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক যুক্ত হচ্ছে, যার পরিমাণ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। সংকটের সময়ে এই করের হার সাময়িকভাবে ১০ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে ভোক্তার ওপর পুরো আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ দেওয়া লাগত না।
সরকার যদি সংকটের সময়ে এই কর-শুল্কের একটি অংশ সাময়িকভাবে কমাত, তাহলে ভোক্তার ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ না দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
এখানে রাজস্বের বিষয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। কর কমালে সরকারের আয় কমবে। কিন্তু আয় তো সাময়িক সময়ের জন্য কমছে, তেলের দামতো সব সময় আন্তজার্তিক বাজারে উচ্চ পর্যায়ে থাকে না। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির আগে আন্তর্জাতিক বাজারে যে দাম ছিল, সেই দাম তো এখনো আর নেই। দাম তো কমে গেছে। তাহলে এখন কী আবার দাম কমাবেন। আর দাম কমালে কয় টাকা কমাবেন? সেই তো জনগনকে ২ টাকা, ৫ টাকা করে ভিক্ষা দিবেন। সরকারের তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পণ্যে কর ছাড় দেয়ার অসংখ্য নজীর রয়ে গেছে। আর সরকার তো ছয় মাস ধরে টাকা ছাপিয়েই চলছে। যদি তাই হয়, তাহলে সমায়িক সময়ের জন্য জ্বালানি তেলে কর ছাড় দিলে কী মহা-ভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো?
বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক যুক্ত হচ্ছে, যার পরিমাণ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। তাদের মতে, সংকটের সময়ে এই করের হার সাময়িকভাবে ১০ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে ভোক্তার ওপর পুরো আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ দেওয়া লাগতো না।
কিন্তু এই বিকল্প পথে যাওয়ার সুবিধাও তো অনেক ছিল। জ্বালানির দাম কম রাখলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় কম থাকে, মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কিছুটা সুরক্ষিত থাকে।
এ কারণে কর-শুল্ক কমানোকে নিছক ‘রাজস্ব ছাড়’ হিসেবে না দেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি সাময়িক নীতি-উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেত কি না— এ প্রশ্নের স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে থাকা দরকার।
বিশেষ করে এপ্রিলেই সরকার জ্বালানি করের কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। সুতরাং ‘বিকল্প ছিল না’— এই বক্তব্যের বদলে কোন কোন বিকল্প বিবেচনা করা হয়েছিল এবং কেন সেগুলো গ্রহণ করা হয়নি, সেটি জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: আমদানিনির্ভরতা
জ্বালানি তেলের বর্তমান সংকট বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাকে আবার সামনে এনেছে। তা হলো পরিশোধন ও মজুদ সক্ষমতার ঘাটতি।
দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। বিপরীতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অপরিশোধন ও পরিশোধনের সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। বাস্তবে গড়ে প্রায় ১২ লাখ টন পরিশোধন করা হয়। ফলে চাহিদার বড় অংশই পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় সীমিত এবং তিন মাসের চাহিদার তেলও মজুত রাখা কঠিন। এই দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশ পুরো সুবিধা নিতে পারে না।
কারণ কম দামে অপরিশোধিত তেল কিনে বড় আকারে মজুত করার সক্ষমতা সীমিত। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট দেখা দিলে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয় বেশি দামে। এর সঙ্গে যোগ হয় জাহাজভাড়া, বীমা, ঝুঁকি প্রিমিয়ামসহ অন্যান্য ব্যয়।
অর্থাৎ বাংলাদেশ অনেকটা এমন একটি বাজারে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিশ্ববাজারের দাম বাড়লে দ্রুত আঘাত আসে, কিন্তু দাম কমলে সেই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর সক্ষমতা নেই।
এটাই আসলে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতার জায়গা, যদিও সক্ষমতা উন্নয়নের এই ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছে।
রিফাইনারি বাড়ানোই একমাত্র সমাধান
সরকারের বর্তমান বাজেট পরিকল্পনাতেও এই সমস্যার কিছুটা স্বীকৃতি আছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথিতে বছরে ৫০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার নতুন অপরিশোধিত তেল শোধনাগার এবং প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি বা ইআরএল-২ স্থাপনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতদিন কেন এই সক্ষমতা যথেষ্ট বাড়ানো গেল না?
দেশে যখন বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, তখন জ্বালানি নিরাপত্তার মতো মৌলিক অবকাঠামো তথা রিফাইনারি, স্টোরেজ, পাইপলাইন, কৌশলগত মজুদ— কেন একই মাত্রায় অগ্রাধিকার পায়নি, সেটি নীতিনির্ধারকদের ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
কারণ একটি বড় রিফাইনারি শুধু আমদানি কমায় না; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকার সময় কম দামে অপরিশোধিত তেল কিনে মজুত করার সুযোগও তৈরি করে। সংকটের সময় সেই মজুদ ব্যবহার করে বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখা যায়।
তবে শুধু রিফাইনারি বানালেই সমস্যার সমাধান হবে না। পর্যাপ্ত স্টোরেজ, পাইপলাইন, গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ক্রয়ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প কোথায়?
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আরও বড়, বাংলাদেশ কতদিন আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করবে?
সরকারের নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি-২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৮১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লক্ষ্য আছে, নীতি আছে, এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের গতি।
রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, গণপরিবহনের বিদ্যুতায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং জ্বালানি দক্ষতা— এসব ক্ষেত্রে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সরকারের জ্বালানি দক্ষতা পরিকল্পনাতেও ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির প্রতি ইউনিটে প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ শুধু নতুন জ্বালানি উৎপাদন নয়, একই পরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কম জ্বালানি ব্যবহার করাও সমাধানের অংশ।
পাঁচ বছর বড় প্রকল্প নয়
জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নটি সামনে আনা যেতে পারে। তবে আগামী পাঁচ বছর প্রকল্প বাছাইয়ের নতুন অগ্রাধিকার ঠিক করা প্রয়োজন।
যে প্রকল্প অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমায় এবং জনগণের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কমাতে সাহায্য কওে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে উচিত।
রিফাইনারি, কৌশলগত জ্বালানি মজুদ, পাইপলাইন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, গ্রিড আধুনিকায়ন, জ্বালানি দক্ষতা এবং গণপরিবহনের বিদ্যুতায়ন, এসব প্রকল্পকে সে বিবেচনায় দেখা দরকার।
বিপিসি ‘লাভের প্রতিষ্ঠান’ নাকি ‘সেবার প্রতিষ্ঠান’?
আরেকটি মৌলিক সংস্কারের প্রশ্ন হলো বিপিসির কাঠামো। একটি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য কি দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা করা, নাকি জনগণ ও অর্থনীতিকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা?
খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন, বিপিসিকে ‘না লাভ, না ক্ষতি’ কাঠামোয় পরিচালনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে এর প্রকৃত ব্যয়, মুনাফা, পরিচালন ব্যয়, আমদানি ব্যয় এবং আর্থিক দায় নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এটি হলে জ্বালানির দাম নির্ধারণ নিয়েও বিতর্ক অনেকটা কমতে পারে। আজ জনগণকে বলা হচ্ছে বিপিসি লোকসান করছে। আবার একই জনগণ জানে, বহু বছর বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এই দুই তথ্যের মধ্যে সম্পর্কটি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা না করা হলে আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বাজার তদারকি শুধু ঘোষণা নয়, ফলও চাই
জ্বালানির দাম বাড়ার পর সরকার বাজার তদারকি বাড়ানোর কথা বলেছে। উদ্দেশ্য জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যেন অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম না বাড়ান।
কিন্তু এখানেও বাস্তব সমস্যা আছে। একটি পণ্যের দাম কতটা বাড়া যৌক্তিক, তা নির্ধারণ করতে হলে তার উৎপাদন, পরিবহন, শ্রম, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও বিপণন ব্যয়ের পরিবর্তন জানতে হবে। শুধু বাজারে গিয়ে দোকানদারকে দাম কমাতে বললে সমস্যার সমাধান হবে না।
বরং সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও সেবার একটি কস্ট-পাস-থ্রু মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জ্বালানির দাম যতটা বেড়েছে, তার কারণে একটি খাতের প্রকৃত ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার হিসাব করতে হবে। এরপর অযৌক্তিক মুনাফা বা কারসাজি থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে।
আর একটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমলে দেশের বাজারেও সম পরিমানে দাম কমানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ জ্বালানি নীতি
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কখনোই জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু সরকারকে শুধু জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করলেই চলবে না; অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বিপিসির ওপর চাপ তৈরি হবে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু একই সঙ্গে ভোক্তার ওপর সেই চাপ কতটা, কীভাবে এবং কত সময়ের জন্য দেওয়া হবে, সেটিও একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। এই জায়গাতেই সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন।
সরকার যদি বলে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না, তাহলে জনগণের সামনে হিসাব দিতে হবে— আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত ক্রয়মূল্য কত?; প্রিমিয়াম, জাহাজভাড়া ও বীমার প্রকৃত ব্যয় কত?; বিপিসির হাতে কত নগদ অর্থ আছে?; আগের মুনাফার কতটা কোথায় ব্যয় হয়েছে?; সরকার কত টাকা কর-শুল্ক পাচ্ছে?; কর কমালে রাজস্ব কত কমত?; ভর্তুকি দিলে কত লাগত?; দাম বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক ব্যয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি কত? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কতদিন পর আন্তর্জাতিক দাম কমলে দেশের বাজারে দাম কমানো হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রকাশ্যে এলে জনগণও বুঝতে পারবে মূল্য সমন্বয়ের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা কতটা।
জনগণের জন্য টেকসই সমাধান কী?
বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এটি কেবল তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ সামলানোর ব্যবস্থা হতে পারে।
টেকসই সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রথমত, বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও স্বাধীন নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় ভোক্তাকে সুরক্ষা দিতে আপৎকালীন জ্বালানি মূল্য-স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, সংকটের সময়ে কর-শুল্ক সাময়িক সমন্বয়ের সুযোগ রাখা দরকার।
চতুর্থত, ইআরএল -২ ও নতুন রিফাইনারি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বড় আকারের কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারের ২০৩০ ও ২০৪০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রাকে কাগজে না রেখে বাস্তব বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
ষষ্ঠত, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে পণ্যের অযৌক্তিক দাম বাড়ানো ঠেকাতে তথ্যভিত্তিক বাজার তদারকি করতে হবে।
সপ্তমত, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য প্রয়োজন হলে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে। কারণ একই পরিমাণ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত একজন উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় একজন দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর অনেক বেশি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক শুধু ২০ টাকা বাড়ল কি না—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ রাখা হলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন বারবার একই সংকটে পড়ে?
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ে, দেশেও দাম বাড়ে। বিশ্ববাজারে দাম কমে, দেশে তার সুফল পুরোপুরি আসে না। সংকটের সময়ে বিপিসি লোকসানে পড়ে। আবার স্বাভাবিক সময়ে বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে। সেই মুনাফার বড় অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যায়। এরপর সংকট এলে আবার ভোক্তার কাছ থেকে দাম বাড়িয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়।
এই চক্র ভাঙতে না পারলে কয়েক বছর পর আবার একই প্রশ্ন সামনে আসবে। সুতরাং আজকের সবচেয়ে জরুরি কাজ শুধু জ্বালানি তেলের দাম কত হবে তা নির্ধারণ করা নয়; বরং বাংলাদেশ কীভাবে এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করবে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি ধাক্কা সরাসরি জনগণের ঘাড়ে এসে পড়বে না।
রিফাইনারি বাড়াতে হবে, কৌশলগত মজুদ বাড়াতে হবে, আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে, জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে এবং বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।
সরকারের ২০২৬-২৭ বাজেটেও ৫০ লাখ টন সক্ষমতার নতুন রিফাইনারি এবং প্রায় ৩০ লাখ টন সক্ষমতার ইআরএল-২-এর পরিকল্পনা রয়েছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা শেষ করা।
কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো বিলাসী উন্নয়ন প্রকল্প নয়। এটি খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আজ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে যে অর্থনৈতিক চাপ সামলানো হচ্ছে, আগামী দিনের সরকারগুলোর কাজ হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে পরবর্তী আন্তর্জাতিক সংকটে আবার একই প্রশ্ন না ওঠে, “বিকল্প থাকার পরও জনদুর্ভোগ বাড়ানো হলো কেন?”
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক












