দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে একের পর এক মৃত গ্রেট হোয়াইট হাঙর ভেসে আসছিল। প্রতিটির পেটের অংশ ছেঁড়া, আর শরীর থেকে উধাও বিশাল কলিজা। সামুদ্রিক প্রাণী বিশেষজ্ঞরা প্রথমে বুঝতেই পারছিলেন না, এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে কে। পরে সামনে আসে দুই ঘাতক তিমির নাম—পোর্ট ও স্টারবোর্ড। তাদের শিকার করার কৌশল এখন বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ও শীর্ষ শিকারিদের ক্ষমতা নিয়ে।
২০১৭ সালের ৩ মে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের কাছে মাছ ধরার গ্রাম গ্যানসবাইয়ের সমুদ্রসৈকতে একটি বিশাল গ্রেট হোয়াইট হাঙরের মৃতদেহ ভেসে আসে। স্ত্রী হাঙরটির ওজন ছিল প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি। পেটের নিচের দিকে বড় ক্ষত ছিল, আর শরীর থেকে বের করে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৯০ কেজি ওজনের কলিজা।
ঘটনাটি নিয়ে ময়নাতদন্তের নেতৃত্ব দেওয়া সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অ্যালিসন টাউনার বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরবর্তী কয়েক মাসে একই ধরনের ক্ষত নিয়ে আরও পাঁচটি গ্রেট হোয়াইট হাঙরের মৃতদেহ উপকূলে ভেসে আসে। প্রতিটির শরীর ছিঁড়ে কলিজা বের করে নেওয়ার চিহ্ন ছিল।

টাউনারের সন্দেহ হয়, এর পেছনে রয়েছে পোর্ট ও স্টারবোর্ড নামে পরিচিত দুটি পুরুষ ঘাতক তিমি। ধারণা করা হয়, তারা দুই ভাই। ২০১৫ সালে কেপটাউনের আশপাশে প্রথম তাদের দেখা যায়। তাদের পৃষ্ঠপাখনা যথাক্রমে বাঁ ও ডান দিকে বাঁকানো হওয়ায় এই নাম দেওয়া হয়।
কীভাবে শিকার করে ঘাতক তিমি?
২০২২ সালের ১৬ মে কেপটাউন থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পূর্বে মোসেল বে উপকূলে ড্রোনে ধারণ করা একটি ভিডিও বিজ্ঞানীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ তুলে ধরে। সেখানে তিনটি ঘাতক তিমিকে প্রায় তিন মিটার লম্বা একটি গ্রেট হোয়াইট হাঙর শিকার করতে দেখা যায়।
একটি তিমি হাঙরটিকে ঠেলে পানির ওপরে নিয়ে আসে এবং একদিকে কাত করে দেয়। এরপর পাখনার কাছাকাছি কামড় দিলে পানিতে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিমিটি হাঙরটিকে মুখে নিয়ে পানির নিচে চলে যায়। আরেকটি তিমি হাঙরটির লেজ ধরেছিল বলে ভিডিওতে দেখা যায়।
ক্যালিফোর্নিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার উপকূলেও ঘাতক তিমির হাতে গ্রেট হোয়াইট হাঙর হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এসব ঘটনা তাদের শিকারের দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও দলগত সমন্বয়ের পরিচয় দেয়।
হাঙরের কলিজা ঘাতক তিমির কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। কারণ, এতে প্রচুর শক্তি সরবরাহকারী চর্বি থাকে। দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়া ও পানিতে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে গ্রেট হোয়াইট হাঙর নিজের কলিজায় শক্তি সঞ্চয় করে। পূর্ণবয়স্ক একটি গ্রেট হোয়াইটের শরীরের ওজনের প্রায় ২৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে কলিজা।
হাঙরকে অচল করে ফেলার কৌশল

ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে কাজ করা গবেষক এরিক ইগুয়েরাও ড্রোনের ভিডিওতে একই ধরনের শিকার দেখেছেন। তাঁর ধারণ করা ফুটেজে পাঁচটি ঘাতক তিমিকে একটি অল্পবয়সী গ্রেট হোয়াইট হাঙরকে ঘিরে শিকার করতে দেখা যায়। তিমিগুলো হাঙরটিকে উল্টে দিয়ে পানির নিচে টেনে নিয়ে যায়। পরে তাদের মুখে হাঙরের কলিজা দেখা যায়।
হাঙরকে উল্টে দিলে সেটি সাময়িকভাবে অসাড় হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘টনিক ইমোবিলিটি’। ইগুয়েরার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এক মিনিটেরও কম সময়ে হাঙরটি কার্যত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা হারাতে পারে। তখন ঘাতক তিমিরা তুলনামূলক নিরাপদে তার পেট কেটে কলিজা বের করতে পারে।
এই শিকারের কৌশল শেখার মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করেন গবেষকেরা। ঘাতক তিমি পরিবারভিত্তিক সামাজিক দলে বাস করে এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্বতন্ত্র শব্দ ব্যবহার করে। অন্যদিকে, গ্রেট হোয়াইট হাঙর সাধারণত একাকী থাকে। ফলে দলবদ্ধ আক্রমণে ঘাতক তিমিরা বাড়তি সুবিধা পায়।
জলবায়ু পরিবর্তন কি বাড়াচ্ছে সংঘাত?
ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে পানির তাপমাত্রা বাড়ার ফলে অল্পবয়সী গ্রেট হোয়াইট হাঙরের উপস্থিতি বেড়েছে বলে গবেষক ইগুয়েরার পর্যবেক্ষণ। এতে হাঙরগুলো ঘাতক তিমির বসবাসের এলাকার কাছাকাছি চলে আসছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি তাদের শিকারের কৌশল বদলে দিচ্ছে—এমন প্রমাণ নেই। বরং পরিবেশগত পরিবর্তন আগে থেকে শেখা কৌশল প্রয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

অস্ট্রেলিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিটার লম্বা একটি গ্রেট হোয়াইট হাঙরের মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার কলিজা, পরিপাকতন্ত্রের কিছু অঙ্গ এবং প্রজনন অঙ্গ অনুপস্থিত ছিল। ক্ষতস্থানে ঘাতক তিমির ডিএনএ শনাক্ত করার পর গবেষকেরা অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় এ ধরনের শিকারের প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ পান।
গ্রেট হোয়াইট হাঙর হারিয়ে যাচ্ছে উপকূল থেকে
দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম কেপ অঞ্চলে একসময় গ্রেট হোয়াইট হাঙর দেখার অন্যতম প্রধান স্থান ছিল ডায়ার দ্বীপ। শীতকালে সিল শিকারের জন্য সেখানে বহু হাঙর জড়ো হতো। কিন্তু ঘাতক তিমির উপস্থিতির পর হাঙরগুলো হঠাৎ ওই এলাকা থেকে উধাও হয়ে যায়। কিছু গভীর সমুদ্রে চলে গেছে, অন্যগুলো পূর্ব উপকূলের দিকে সরে গেছে বলে গবেষকদের ধারণা।

তবে ঘাতক তিমির আক্রমণের আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রেট হোয়াইট হাঙরের সংখ্যা উদ্বেগজনক অবস্থায় ছিল। অবৈধভাবে চোয়াল ও পাখনা সংগ্রহ, দূষণ, খাদ্যের ঘাটতি, হাঙর ঠেকানোর জাল এবং দীর্ঘ সুতোয় বড়শি ফেলে মাছ ধরার কারণে তাদের সংখ্যা কমছিল। প্রজাতিটির জিনগত বৈচিত্র্যও অত্যন্ত কম বলে আগের গবেষণায় উঠে এসেছে।
স্টেলেনবোশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী সারা আন্দ্রেওত্তির মতে, মাছ ধরার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে ধরা পড়া হাঙরের পাশাপাশি উপকূলীয় সুরক্ষা জাল ও দীর্ঘ সুতোয় মাছ ধরার পদ্ধতিও তাদের মৃত্যুর বড় কারণ।
এর প্রভাব পড়ছে অন্য সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও। গ্রেট হোয়াইট হাঙর সরে যাওয়ায় আফ্রিকান পেঙ্গুইনের মতো বিপন্ন প্রাণীর ওপর শিকারের চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কেপ ফার সিল ও সেভেনগিল হাঙরের মতো প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিছু ছোট হাঙর ও মাছের সংখ্যা আবার কমছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ঘাতক তিমির শিকার শুধু দুটি প্রজাতির সংঘাত নয়। কোনো এলাকা থেকে শীর্ষ শিকারি গ্রেট হোয়াইট হাঙর হারিয়ে গেলে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে সেই পরিবর্তন এখন বাস্তব সময়েই পর্যবেক্ষণ করছেন গবেষকেরা।












